প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

উপেক্ষিত আন্তঃসংস্থার মতামত, রয়েছে সমন্বয়হীনতা

সাইফুল আলম, চট্টগ্রাম: চট্টগ্রামকে বাসযোগ্য ও আধুুনিক নগর হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে ১২ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৯৯৫ সালে মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়। আর এ মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে তখন একটি সংস্থা গঠনের সুপারিশও করা হয়েছিল। কিন্তু সেটি হয়নি। অন্যদিকে নগর সমস্যার সমাধান ও পরিকল্পিত নগরায়ণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থা যেসব সুপারিশ প্রদান করেছিল, সেগুলোও পরবর্তী সময়ে সমন্বয় করা হয়নি। ফলে নগর সমস্যার যথাযথ ও পূর্ণাঙ্গ সমাধান যেমন হয়নি, তেমনি মহাপরিকল্পনার সুফল থেকেও বঞ্চিত হয়েছেন নগরবাসী।

নগরবিদ ও বিশেষজ্ঞদের মতে, চট্টগ্রামের তিন দশকেরও বেশি চলমান জলাবদ্ধতা সমস্যা নিরসনে সিটি করপোরেশনের পাশাপাশি সিডিএ চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ, সড়ক ও জনপথ বিভাগ, ওয়াসা, পানি সম্পদ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সমান দায়িত্ব রয়েছে। এ দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে এ সংস্থাগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সমন্বিত উদ্যোগের অভাব সমস্যা দিন দিন প্রকটতর হচ্ছে। আর বাড়ছে জনভোগান্তি। এ জলাবদ্ধতা নিরসনে দীর্ঘমেয়াদি কোনো পরিকল্পনা না থাকায় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনকে এককভাবে বেকায়দায় পড়তে হচ্ছে। অথচ অন্যান্য সহযোগী সংস্থাগুলোর মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দরের দায়িত্ব হলো কর্ণফুলীর নদীর গভীরতা ও নাব্য বৃদ্ধি করা। কিন্তু গত চার বছর ধরে সংস্থাটির ড্রেজিং কার্যক্রম বন্ধ থাকায় নদীর পানি ধারণ করার ক্ষমতা কমেছে দিন দিন।

নদীটির তীরে শহর রক্ষা বাঁধও নির্মাণ করতে পারেনি পানি উন্নয়ন বোর্ড। পাশাপাশি নদী ও নগরের খালগুলো প্রতিনিয়ত দখলের শিকার হলেও এখনও পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেনি জেলা প্রশাসন। একইভাবে পরিবেশ অধিদফতর রোধ করতে পারে না নদী দূষণ। চট্টগ্রাম ওয়াসা করেনি স্যানিটেশন মহাপরিকল্পনার বাস্তবায়ন। চসিক পারেনি ড্রেনেজ মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন ও খাল-নালাকে বর্জ্য মুক্ত করতে। নগরের জলাবদ্ধতা নিরসনে চউকের অতীতে কোনো ভূমিকাই ছিল না।

সংস্থাটি খাল দখল কিংবা পুকুর ভরাট করে গড়ে ওঠা আবাসিক স্থাপনা উচ্ছেদে এখন পর্যন্ত কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি। উল্টো কোনো ক্ষেত্রে দিয়েছে ভবন নির্মাণে অনুমোদন। ফলে প্রায় ৭০ লাখ নগরবাসীর জন্য নিরাপদ, পরিচ্ছন্ন, সুন্দর, সুস্থ, আধুনিক ও সুষ্ঠু পবিবেশ নিশ্চিত করতে পারেনি চট্টগ্রামে সরকারি দায়িত্বপ্রাপ্ত ৩২টি উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা। বরং তাদের পরিকল্পনাহীন ও দূরদর্শিতাহীন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের ফলে অব্যাহত পাহাড় কাটা, নির্বিচারে বৃক্ষ নিধন, নদী-নালা-পুকুর-জলাশয় দখল ও ভরাট, অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণ, নিয়ন্ত্রণহীন যানবাহনের সংখ্যা, অপব্যবস্থাপনা, অদক্ষতা এবং সমন্বয়হীনতায় বাড়ছে প্রতিনিয়ত নাগরিক জীবনে বিড়ম্বনা, ভোগান্তি, দুর্যোগ ও দুর্ভোগ। ফলে নগর উন্নয়ন হাজার কোটি টাকার ব্যয়ে সরকারি বিভিন্ন প্রকল্পের সুফল বঞ্চিত নগরবাসী। কয়েক ঘণ্টার টানা বৃষ্টিতে তলিয়ে যায়। আর জলাবদ্ধতায় পানিবন্দি থাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা, যা এখন নিত্যদিনের ব্যাপার।

চট্টগ্রাম নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে গত ১৫ বছরে চসিক ৩০৪ কোটি টাকা ব্যয় করে। এরপরও এ সমস্যা থেকে মুক্তি পায়নি নগরবাসী। পাশাপাশি বহদ্দারহাট-সরাইপাড়া নতুন খাল খননের জন্য ৩২৭ কোটি টাকার একটি প্রকল্প একনেকে অনুমোদন দেওয়া হলেও এখন মূল কাজ শুরু হয়নি। এছাড়া নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে নদীর তীরে দেয়াল নির্মাণ, স্লুইসগেট নির্মাণ, খাল খনন ও ড্রেজিংসহ নতুন করে আড়াই হাজার কোটি টাকার একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। এখন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন তাকিয়ে আছে ওই প্রকল্পের দিকে। তবে কবে নাগাদ এ প্রকল্পের কাজ শুরু হবে, তা নিশ্চিত করে বলতে পারছেন না সংশ্লিষ্টরা।

অন্যদিকে জলাবদ্ধতা নিরসনে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষও ছয় হাজার কোটি টাকারও বেশি একটি প্রকল্প গ্রহণ করেছে। প্রকল্পটি একনেকে অনুমোদিত হয়েছে। এছাড়া চট্টগ্রাম ওয়াসাও নগরীর জলাবদ্ধতা ও পয়োনিষ্কাশনে মাস্টারপ্ল্যান গ্রহণ করেছে। অবশ্য এ মাস্টারপ্ল্যানের ‘ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যান’ অংশটি চসিক এবং ‘সুয়ারেজ’ অংশ ওয়াসা বাস্তবায়ন করবে। কিন্তু জলাবদ্ধতা নিরসনের মূল দায়িত্ব কার—এ নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে।

অন্যদিকে জনভোগান্তি রোধে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে গত বছরের ২৭ জুন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে জারিকৃত পরিপত্রে (স্মারক নং-০৩.০৮২.০৪৮.০১.০১.০১২.২০১৬ (অংশ-৪)-৩৫১) সমন্বয় বিষয়ে বলা হয়েছে, ‘সিটি করপোরেশনের অধিক্ষেত্রের অন্তর্ভুক্ত সেবা প্রদানকারী সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সরকারি দফতরের প্রধানরা সিটি করপোরেশনের আমন্ত্রণে সভায় যোগদান এবং সভায় গৃহীত সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করবেন। পাশাপাশি বাস্তবায়ন অগ্রগতি সিটি করপোরেশনকে অবহিত করবেন। কিন্তু সমন্বয় বিষয়টি উপেক্ষিত।’

ইস্ট ডেল্টা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও পরিকল্পিত চট্টগ্রাম ফোরামের সভাপতি প্রফেসর মুহাম্মদ সিকান্দার খান শেয়ার বিজকে বলেন, নগর উন্নয়নে সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে ন্যূনতম সমন্বয় নেই। ফলে নগরের প্রকৃত সমস্যা ও সমস্যার কারণ চিহ্নিতকরণে বরাবরই ব্যর্থতা ও অদক্ষতা বাড়ছে। কেননা প্রতিটি সংস্থার প্রকল্প সম্পর্কিত নিজস্ব বিশ্লেষণ ও মতামত বিবেচনায় আসে না। আর একের পর এক অপরিকল্পিত প্রকল্প বাস্তবায়নের কারণে দুর্ভোগ ও অকার্যকর শহরের পরিণত হচ্ছে চট্টগ্রাম।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান আবদুচ সালামের কার্যালয়ের সঙ্গে বেশ কয়েকবার যোগাযোগ করা হলেও, তিনি কার্যালয়ে ছিলেন না। ফলে মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

চলতি মাসের প্রথমদিকে নগর ভবনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন বলেন, ‘কার কতটুকু দায়িত্ব, তা সরকার ঠিক করে দেবে। জলাবদ্ধতা নিরসনের বিষয়টি চসিকের একার কাজ নয়। যেহেতু নগরবাসী ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, তাই উদ্যোগ নিয়েছি। সবাইকে দায়িত্ব নিতে হবে। মোট কথা সমাধান হলেই হলো।’

সাম্প্রতিক সময়ে বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতায় সড়কের অবস্থা নিয়ে চসিক মেয়র আরও বলেন, ‘জাইকার অর্থায়নে ওয়াসা পানির পাইপ বসাতে রাস্তা কাটছে। এই কার্যক্রম শেষ না হওয়ায় রাস্তা মেরামত করা সম্ভব হচ্ছে না। আর নগরবাসীর বিভিন্ন ধরনের পরিষেবা গ্রহণে কাটছে সড়ক। এছাড়া সিডিএর সড়ক উন্নয়ন, উড়াল সড়ক নির্মাণকাজ চলমান থাকায় রাস্তাগুলোর অবস্থা বেহাল রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নির্ধারিত সময়ে রাস্তা হস্তান্তর না করায় সব দায়ভার নিতে হচ্ছে সিটি করপোরেশনকে। এক্ষেত্রে সরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বয় থাকা দরকার।’

সাবেক মেয়র মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘‘সিটি করপোরেশনের প্রাথমিক দায়িত্ব নাগরিক সেবা। এ নাগরিক সেবা নিশ্চিত করতে হলে সমন্বয়ের প্রয়োজন আছে, যা ১৯৮২ সালের সিটি করপোরেশন অ্যাক্টে উল্লেখ ছিল এবং সিটি করপোরেশন, সিডিএ, ওয়াসা, বন্দরসহ সরকারের অন্য সংস্থাগুলো একসঙ্গে বসে নগর উন্নয়ন ও সেবাদানের পরিকল্পনা করত। প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে নিয়মিত সমন্বয় সভা হতো। ওখানে বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিরা আসতেন। তাদের ‘অফিসিয়াল কমিশনার’ বলা হতো। ১৯৯৩ সালে এসে বাতিল করা হয় ওই আইন।”