প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

উম্মোচন হয়নি রিজার্ভ চুরির রহস্য

শওকত আলী: ব্যাংকিং সেক্টরে বড় কিছু অঘটনের মধ্য দিয়ে শেষ হতে চললো ২০১৬ সাল। খেলাপি ঋণের লাগাম টানার লক্ষ্যে নতুন বছর শুরু হলেও দ্রুতই আলোচনা মোড় নেয় অন্যদিকে। ফেব্রুয়ারিতে বেসরকারি তিনটি ব্যাংকের কার্ডের তথ্য চুরি করে দেশি-বিদেশি একটি চক্র। এর মাধ্যমে এটিএম বুথ থেকে তুলে নেওয়া হয় গ্রাহকদের টাকা। এর রেশ কাটতে না কাটতেই অনেকটা অলক্ষ্যে ঘটে যায় সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা।

দেশে কার্যরত সব সরকারি-বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রক বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রতিষ্ঠানটির নির্দেশনা নিয়েই কার্যক্রম পরিচালনা করে ব্যাংকগুলো। তাদের নানা অনিয়ম, চুরি ঠেকাতে সবসময়ই কাজ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। কিন্তু সেই বাংলাদেশ ব্যাংকেই ঘটে নজিরবিহীন চুরির ঘটনা। নিউইয়র্ক ফেডের অ্যাকাউন্টে রক্ষিত বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে ১০১ মিলিয়ন ডলার চুরি করে সাইবার দুর্বৃত্তরা, যা সারা বিশ্বে একটি আলোচিত বিষয়। এ দুটি ঘটনায় ব্যাংক খাতের আধুনিকায়নে এখন নিরাপত্তার বিষয়টি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

জানা গেছে, আলোচিত এ সাইবার চুরির ঘটনাটি ফেব্রুয়ারিতে ঘটলেও জানাজানি হয় মার্চে। দুর্বৃত্তরা ভুয়া পেমেন্ট অর্ডারের মাধ্যমে ১০১ মিলিয়ন ডলার চুরি করে। যার মধ্যে ২০ মিলিয়ন ডলার নিয়ে যাওয়া হয় শ্রীলঙ্কায়। বাকি ৮১ মিলিয়ন ডলার নেওয়া হয় ফিলিপাইনে। ফিলিপাইনের স্থানীয় রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকের মাধ্যমে টাকাগুলো ছড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন ক্যাসিনোতে। শ্রীলঙ্কার পুরো অর্থ ফিরে পাওয়া গেলেও ফিলিপাইন থেকে এখন পর্যন্ত ১৫ দশমিক ২৫ মিলিয়ন ডলার ফেরত পেয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

এ ঘটনার জেরে ১৫ মার্চ পদত্যাগ করেন গভর্নর ড. আতিউর রহমান। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ থেকে অপসারণ করা হয় ডেপুটি গভর্নর আবুল কাশেম ও নাজনীন সুলতানাকে। আতিউর রহমানের পদত্যাগের এক ঘণ্টার মধ্যে নিয়োগ দেওয়া হয় সে সময়কার সোনালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান ফজলে কবীরকে। ঘটনাটি ফেব্রুয়ারির হলেও টাকা উদ্ধারের বিষয়টি নিয়ে জোর আলোচনা চলতে থাকে নিয়মিত। বাংলাদেশ ও ফিলিপাইনের পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের মধ্য দিয়ে শেষ হতে চলেছে বছরটি। এ চুরির সঙ্গে প্রকৃতপক্ষে কারা জড়িত, তা এখনো জানা যায়নি। যদিও কয়েকজনের দায়িত্বে অবহেলার তথ্য উঠে এসেছে তদন্ত প্রতিবেদনে।

এটিএম কার্ড জালিয়াতি ও রিজার্ভ চুরির পর ব্যাংকিং সেক্টরে সাইবার নিরাপত্তা বাড়ানো একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বেসরকারি ব্যাংকগুলো এ বিষয়ে নতুন নতুন পদক্ষেপ গ্রহণ করলেও রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো এখনও পিছিয়ে রয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে অগ্রণী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ শামস-উল ইসলাম শেয়ার বিজকে বলেন, ‘আমাদের অনেক সমস্যাই রয়েছে। সেগুলো ধারাবাহিকভাবে উন্নত করার জন্য কাজ করছি আমরা। এটা আমাদের জন্য চ্যালেঞ্জ। পাশাপাশি খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমিয়ে আনাও একটা বড় বিষয়, যেটা নিয়ে আমরা বিশেষ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছি।’

বছরের শুরুতে খেলাপি ঋণের যে আলোচনা মুখ থুবড়ে পড়েছিল, তা শেষের দিকে এসে আবারও চলতে থাকে। কারণ এ সময়টায় খেলাপি ঋণের পরিমাণ আরও বেড়ে যায়। যা কি না মোট বিতরণ করা ঋণের ১০ দশমিক ৩৪ শতাংশে পৌঁছেছে। টাকার অংকে খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ৬৬ হাজার কোটি টাকা। একই সঙ্গে বিনিয়োগে ভাটা থাকায় ব্যাংকগুলোকে সারা বছরই অলস তারল্য নিয়ে সংকট পোহাতে হয়েছে। বছরজুড়ে ব্যাংকগুলোর হাতে ১ লাখ কোটি টাকার বেশি অলস তারল্য ছিল ব্যাংকগুলোর কাছে।  রিভার্স রেপোর মাধ্যমে ব্যাংকগুলো টাকা রাখে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে। বছরের একটা সময়ে ব্যাংকগুলোর টাকা রাখার পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে বাংলাদেশ ব্যাংক টাকা নেওয়া বন্ধও করে দিয়েছিল নির্দিষ্ট সময়ের জন্য।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম শেয়ার বিজকে বলেন, ‘সন্তোষজনক নয়। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর কোনো উন্নতি নেই। খেলাপি ঋণে জর্জরিত হয়ে আছে তারা। সবচেয়ে বড় বিষয়, ব্যাংকগুলো তাদের অভ্যন্তরীণ ঝুঁকি মোকাবিলার জন্য কোনোভাবেই প্রস্তুত নয়। ফলে নতুন ঘটনা ছাড়াও পুরোনো ঘটনার রেশ অনেকদিন ভোগাবে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোকে।’

‘বিদায়ী ২০১৬ সালে ব্যাংকিং খাতের সামনে নতুন কী চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে’ জানতে চাইলে বেসরকারি খাতের দ্য সিটি ব্যাংক লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সোহাইল আর কে হোসাইন বলেন, ‘২০১৬-তে আমাদের সামনে দুটি চ্যালেঞ্জ বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। এর একটি নন-পারফর্মিং লোন (এনপিএল ) কমিয়ে আনা। এনপিএল ঠিকঠাকভাবে রিকগনাইজ করতে হবে, সে অনুযায়ী প্রয়োজনীয় প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হবে। সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হবে এটাকে কীভাবে কমিয়ে আনা যায়। দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জটি তৈরি হয়েছে ফ্রড বা সাইবার অ্যাটাকের মধ্য দিয়ে। এটা আমাদের যে কোনোভাবে ম্যানেজ করতে হবে। এর জন্য বাজেট বাড়াতে হবে। নিরাপত্তা নিশ্চিতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে; যেহেতু আমাদের সবকিছুই এখন অনলাইন ভিত্তিক হচ্ছে। এছাড়া ব্যাসেল-৩ বাস্তবায়ন আমাদের জন্য বাস্তবায়ন জরুরি।’

এ বছর একটি বড় কাজ করতে পেরেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ৭৯২ কোটি টাকা ঋণ অনিয়মের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় অপসারণ করা হয় ব্যাংকিং খাতের ক্ষমতাশীল এক ব্যবস্থাপনা পরিচালককে, যাকে বাংলাদেশ ব্যাংকের আপত্তি সত্ত্বেও অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে মেয়াদ বৃদ্ধি করা হয়েছিল। অগ্রণী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে ২০১০ সালের ১০ জুলাই যোগদান করেছিলেন তিনি। নানা অনিয়মে বারবার পার পেয়ে গেছেন এই এমডি। তার মেয়াদও বাড়ানো হয়েছে চারবার। অবশেষে তাকে মেয়াদ শেষ হওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে অপসারণ করা হয়। ২০১১ সালে তানাকা ট্রেডকম ইন্টারন্যাশনালকে ১২০ কোটি টাকার ঋণ অনুমোদন করে অগ্রণী ব্যাংকের পর্ষদ। পরে পর্ষদের অনুমোদন ছাড়াই এমডি ক্ষমতার অপব্যবহার করে ওই ঋণের জামানত পরিবর্তন করে দেন। এরপর ২০১৫ সালে প্রতিষ্ঠানটিকে ১১ কোটি টাকার ঋণ নবায়ন ও ৪৬ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ নিয়মিত করে দেন তিনি। একইভাবে চট্টগ্রামের লালদীঘি ইস্ট শাখার গ্রাহক মুহিব স্টিলের ৪২ কোটি টাকার ঋণপত্র ১০ শতাংশ মার্জিনে পর্ষদ অনুমোদন দিলেও পরে এমডি প্রতিষ্ঠানটিকে বিনা মার্জিনে ঋণপত্র খোলার সুযোগ করে দেন। মুন গ্রুপকে কোনো ধরনের বিধিবিধান না মেনেই তিনি মুন গ্রুপকে ৩০০ কোটি টাকা ঋণ দেন। ক্ষমতার অপব্যবহার ও ঋণ জালিয়াতির অভিযোগে কেন এমডিকে অপসারণ করা হবে না জানতে চেয়ে নোটিস দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। পরে শুনানিতে অংশ নিয়ে প্রশ্নগুলোর সঠিক জবাব না দিতে পারায় তাকে অপসারণ করা হয়।

২০১৬ সালের ব্যাংকিং সেক্টরের সার্বিক বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ শেয়ার বিজকে বলেন, ‘এ বছর দুর্নীতির মাত্রা বেড়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে, যার কারণে ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে খেলাপি ঋণের পরিমাণ। খেলাপি ঋণ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোকে শেষ করে দিচ্ছে। বেসরকারি ব্যাংকে তুলনামূলকভাবে এ প্রবণতা কম ছিল। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির কারণ হলো, অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ তাদের কাজগুলো ঠিকভাবে করে না, তারা তাদের মনিটর করেনি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল রূপালী ও অগ্রণী ব্যাংকের এমডির বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আপত্তি সত্ত্বেও তাদের নিয়োগ দেওয়া। পরে যারা এসেছেন, তারা আগের বৃত্ত থেকে কতটা বেরিয়ে আসতে পারবেন, সেটা একটা চ্যালেঞ্জ। এখানে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতা প্রয়োজন।’

ইব্রাহিম খালেদ আরও বলেন, ‘২০১৬ সালে সবচেয়ে বড় ঘটনা রিজার্ভ চুরি। যে টাকাটা চলে গিয়েছিল, তার কিছুটা ফিরে এসেছে। তবে আমি মনে করি, তখন তাড়াহুড়া করে যদি ঊর্ধ্বতনদের সরানো না হতো, তাহলে এই টাকাগুলোর একটা সুরাহা এতদিনে হয়ে যেত। কারণ তারা হ্যাকিংয়ের পর প্রথম এক মাস ভালো কাজ করেছিল। মামলা করলে এখন পুরো টাকা ফেরত পাওয়া যাবে।’

এছাড়া উল্লেখযোগ্য সূচকগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ এখন প্রায় ৩২ বিলিয়ন ডলার। স্থিতিশীল কলমানি মার্কেটের গড় রেট ছিল ৩ দশমিক ৬৩। কিন্তু বছরের মাঝামাঝি সময় থেকে ধারাবাহিকভাবে কমতে শুরু করেছে রেমিট্যান্স। দেশের অর্থনীতির জন্য এটি একটি বড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সর্বশেষ নভেম্বরে ৯৫ কোটি মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। তবে বিনিয়োগ স্থবিরতার মধ্যেও শিল্প খাতে ঋণের পরিমাণ কিছুটা বেড়েছে।