প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

উল্টো পথে আর নয় ভিআইপিদের গাড়ি

 

নাহিন আমিন: রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর প্রটোকলের গাড়িবহরের বাইরে দেশে কিছুদিন আগ পর্যন্তও শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী ও দমকল সংস্থা আর অ্যাম্বুলেন্স এসবের গাড়িতে লাল-নীল বাতি (হুটার) ও সাইরেন ব্যবহার করা হতো। কিছু পদস্থ সামরিক কর্মকর্তার গাড়িতেও সে ব্যবস্থা ছিল। এছাড়া জরুরি বিদ্যুৎ, গ্যাস ও কিছু ভিআইপির গাড়িতে সে ধরনের ব্যবস্থা ছিল, যা সব সময় ব্যবহার করা হতো না। অনুমতি সাপেক্ষে কিছু বেসরকারি নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান এ ধরনের হুটার ও সাইরেন ব্যবহার করতো মাঝেমধ্যে। হঠাৎ করেই দেখা গেল, প্রায় সব ধরনের সরকারি গাড়িতে লাল-নীল ইমার্জেন্সি বাতি ও সাইরেন যুক্ত করা হয়েছে। সিল-ছাপ্পড়বিহীন কিছু সাধারণ গাড়িতেও আজকাল সে রকম বাতির ব্যবহার দেখা যায়। কিছু ব্যক্তিগত গাড়ি ও মোটরসাইকেল থেকেও সম্প্রতি বিশেষ হর্নের শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। আমার বোধগম্য নয়, এসব গাড়িতে আসলে কারা চলাচল করে। এছাড়া গণহারে প্রায় সব সরকারি দফতরের গাড়িতে কেন ইমার্জেন্সি বাতি ও বিশেষ সাইরেন যুক্ত করা হয়েছে, সেটি এ ক্ষুদ্র মস্তিষ্কের যাবতীয় চিন্তাধারার বাইরে। একটি সভ্য দেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীরও তো জরুরি মুহূর্ত ছাড়া এসব বাতি ও সাইরেন ব্যবহার করার কথা নয়। তবে এসব ব্যবহার করে যদি ভিআইপি ও অন্যরা আনন্দ লাভ করে থাকেন, তাতে সাধারণ এ নাগরিকের আপত্তি নেই। আপত্তি আছে অন্য একটি জায়গায়। সেটি হলো ভিআইপিদের রাস্তার উল্টো দিকে গাড়ি চালনা। স্বয়ং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রীও এর বিপক্ষে কথা বলেছেন মন্ত্রিসভায়। সেজন্য তাকে ধন্যবাদ না দিয়ে পারা যাচ্ছে না। মন্ত্রী বলেছেন, ভিআইপিদের গাড়িই রাস্তার উল্টো দিকে সবচেয়ে বেশি চলে। সংগত কারণে এর সঙ্গে দ্বিমত পোষণের সুযোগ নেই। কিছু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস ও মোটরসাইকেল চালকও এ কাজ করে থাকে। তবে আজকের আলোচনা ভিআইপিতেই সীমাবদ্ধ থাক।

কিছুদিন আগে বিপরীত দিক থেকে আসা একজন বিচারপতির গাড়ির নিচে পড়েন এক মোটরসাইকেল চালক। সেটি গণমাধ্যমে আলোড়ন তুলেছিল। অবশ্য বিচারপতি তখন গাড়িতে ছিলেন না। ট্রাফিক পুলিশ ও গণমাধ্যমকর্মীদের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা গাড়িতে না থাকলেও অনেক সময় তাদের চালক ও সহকারী সাইরেন বাজিয়ে রাস্তার উল্টো দিক দিয়ে গাড়ি নিয়ে যায়। ট্রাফিক পুলিশ চ্যালেঞ্জ করলে চালক বা ভিআইপির বডিগার্ড বা পিএসের পক্ষ থেকে পুলিশকে ‘হাইকোর্ট দেখানোর’ নজিরও রয়েছে। সূর্যের চেয়ে বালি গরমÑপ্রবাদটি বোধহয় এক্ষেত্রে বেশ খাটে। তবে অনেক সময় কিছু ভিআইপি যানজট এড়াতে আইন অমান্য যে করেন না, সে কথা বলা ঠিক হবে না। লাল-নীল বাতির ঝলক দেখাতে দেখাতে এবং সুললিত সাইরেনের কণ্ঠ শোনাতে শোনাতে তারা সুযোগ পেলেই রাস্তার উল্টো দিকে চালককে গাড়ি নিয়ে যেতে বলেন একটু যানজটে পড়লে। তাদের পক্ষ থেকে যে যুক্তিটি সবচেয়ে বেশি উপস্থাপন করা হয় সেটি হলো, গুরুত্বপূর্ণ মিটিংয়ে সময়মতো পৌঁছাতে হবে। আমরা মানি, ভিআইপিরা গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি, মানে সে কারণে তাদের আমরা ভিআইপি (ভেরি ইম্পর্ট্যান্ট পারসন) বলি; তারা অতি গুরুত্বপূর্ণ মিটিংয়ে যাবেন-আসবেন সেটি স্বাভাবিক। কিন্তু উল্টো পথে গাড়ি নিয়ে গিয়ে যানজট বাড়িয়ে তোলা কিংবা সাধারণ নাগরিকের প্রাণ ঝুঁকির মুখে ফেলা এসব কাণ্ড তো তাদের কাছ থেকে আশা করা যায় না। রাষ্ট্রের রথী-মহারথীরা যদি নিত্যদিন এসব বেআইনি কাজ করেন, তাহলে আমজনতাই বা কী শিখবে? আইন সবার জন্য সমান এমন একটি কথা আইনের লোক ও বাংলা চলচ্চিত্রে প্রায়ই শোনা যায়। কথাটি মধুর এবং এর সঙ্গে আমরা দ্বিমত পোষণ করি না। কিন্তু এ গুরুত্বপূর্ণ বাণীর প্রমাণ যদি রাস্তাঘাটে না মেলে, তবে মানুষ অসন্তুষ্ট হবে সেটি স্বাভাবিক।

রাজধানীর অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ যানজট। জলাবদ্ধতা মৌসুমি সমস্যা হতে পারে, যানজটের সমস্যা বছরব্যাপী। নগরবাসীর সময়ের দাম আছে। দীর্ঘ যানজটে তাদের গুরুত্বপূর্ণ কর্মঘণ্টার বড় অংশ নষ্ট হয়। সময়মতো কোথাও পৌঁছানো এ শহরে এক বিরাট চ্যালেঞ্জ। নি¤œমানের গণপরিবহনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অবস্থান করা ততোধিক বড় চ্যালেঞ্জ। এমন পরিস্থিতিতে পেশির জোরে ভিআইপি, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মী কিংবা মোটরসাইকেল চালকরা যদি রাস্তার বিপরীত পথে শোঁ করে স্বীয় বাহনটি উঠিয়ে দেন, তাহলে তা যেমন বেআইনি, তেমনি অশোভনও দেখায়। ঢাকার তীব্র যানজটকে এসব অনিয়ম তীব্রতর করে। জনমনে ভিআইপি না হওয়ার আক্ষেপও বাড়ে। দেশের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে যারা রয়েছে, আমরা বিশ্বাস করি তারা জনমানুষের এ কষ্টগুলো বোঝেন। আমাদের প্রতি তারা সহনশীল, এ কথা অস্বীকার করবো না। বিষয়টি বিবেচনায় তারা সমস্যা সমাধানে দ্রুত ব্যবস্থা নেবেন সে আশাও আমরা করতে পারি।

আবারও চলে আসি সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রীর কথায়। ভিআইপিদের বেআইনি আচরণ প্রসঙ্গে তিনি ভারতের উদাহরণ টেনেছেন। পয়লা মে থেকে ভারতে ভিআইপি এমনকি রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর মতো ভিভিআইপিদের গাড়িতেও লাল-নীল বাতির ব্যবহারে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। বাতি ও সাইরেন জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করে এমন কথাও বলেছেন তিনি। নিজের গাড়িতে এ ধরনের কাজও তিনি করেন না। তার এ বক্তব্যে আমরা আশ্বস্ত হয়েছি। আমাদের আশা থাকবে, অযথা বাতি জ্বালিয়ে ও সাইরেন বাজিয়ে যেন কোনো ভিআইপি বা তাদের চালক মানুষকে ভোগান্তিতে না ফেলে। তবে তার চেয়েও জরুরি, রাস্তার বিপরীত দিকে তাদের চলাচল রোধ করা। এ কথা অবশ্য প্রযোজ্য বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্রদের বাস, রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী ও মোটরসাইকেল চালকদের ক্ষেত্রেও। সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা লাভ করলে ট্রাফিক বিভাগ এক্ষেত্রে কঠোর ভূমিকা রাখতে পারবেÑতেমনটাই আমাদের বিশ্বাস। শুধু আইনের ভয় নয়, নিজেদের সভ্যতার পরিচয় দিতেও উচিত ট্রাফিকসহ দেশের অন্য আইনগুলো মেনে চলা।

 

বেসরকারি সংস্থায় কর্মরত