দিনের খবর প্রচ্ছদ শেষ পাতা

উৎপাদন-বিক্রি হ্রাস পেয়েছে ৩০ শতাংশ

মোটরসাইকেল শিল্প
এক লাখ টাকার নিচে মিলবে ১৫০ সিসির মোটরসাইকেল

রহমত রহমান: করছাড় দেওয়ায় দেশের মোটরসাইকেল শিল্পের বাজার দ্রুত সম্প্রসারিত হয়েছে। এ খাতে বেড়েছে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ। ফলে বর্তমানে এ শিল্পে বিনিয়োগ সাড়ে ৯ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। মোটরসাইকেলের উৎপাদন ও বিক্রি দুই-ই বেড়েছে। ফলে গত অর্থবছরে সরকার এ খাত থেকে রাজস্ব পেয়েছে এক হাজার ২৭৮ কোটি টাকারও বেশি। চলতি অর্থবছরে রাজস্ব সুবিধা সীমিত করা ও নতুন ভ্যাট আইনের কারণে এ খাতে প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। এরই মধ্যে উৎপাদন ও বিক্রি ৩০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। রাজস্বের বিষয় বিবেচনা করা না হলে উৎপাদন ও বিক্রি আশঙ্কাজনক হারে কমে যাবে, ক্ষতিগ্রস্ত হবে উদীয়মান এ শিল্প। অর্থবছর শেষে সরকার রাজস্ব হারাবে প্রায় ৫৯০ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ মোটরসাইকেল অ্যাসেম্বলার্স ও ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএএমএ) প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। স্থানীয় মোটরসাইকেল উৎপাদনকারী শিল্পের বিকাশের স্বার্থে আগামী অর্থবছরে বাজেটে প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনতে সম্প্রতি এনবিআর চেয়ারম্যানকে চিঠি দিয়েছেন বিএমএএমএ প্রেসিডেন্ট ও নিটল-নিলয় গ্রুপের চেয়ারম্যান আবদুল মাতলুব আহমাদ। এনবিআর সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

চিঠিতে আবদুল মাতলুব আহমাদ তুলে ধরেন, সরকার স্থানীয় মোটরসাইকেল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে  কয়েক বছর ধরে করছাড় সুবিধা দিয়ে আসছে। এর মধ্যে রয়েছেÑউপকরণ আমদানির ক্ষেত্রে আমদানি পর্যায়ে, উৎপাদন ও সরবরাহ পর্যায়ে মূসক, শুল্ক ও কর রেয়াতের সুবিধা। ফলে বাজাজ, হিরো, টিভিএস, হোন্ডা, সুজুকি, ইয়ামাহার মতো আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বিদেশি মোটরসাইকেল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে শিল্প স্থাপন করেছে। এছাড়া শুল্কমুক্ত সুবিধার আওতায় স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের একক বিনিয়োগের মাধ্যমে রানার, গ্রামীণ মোটরস, লিফান, রোডমাস্টারের মতো স্থানীয় ব্র্যান্ড প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এসব কোম্পানির মাধ্যমে এ শিল্পের যন্ত্রাংশ তৈরিতে রানার ইন্ডাস্ট্রিজ, নিটল মেশিনারিজ ও কিউভিসিসহ বিভিন্ন শিল্প গড়ে উঠেছে। বর্তমানে এ শিল্পে বিনিয়োগ সাড়ে ৯ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে এবং প্রায় ২০ হাজার কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।

আরও বলা হয়, দেশি-বিদেশি কোম্পানির মোটরসাইকেল উৎপাদন ও বিক্রি বেড়েই চলেছে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে তিন লাখ ৬০ হাজার ৫০০ মোটরসাইকেল বিক্রি হয়। এছাড়া ২০১৭-১৮ অর্থবছরে বিক্রি বেড়ে দাঁড়ায় চার লাখ ৯২ হাজার ৫০০। মোটরসাইকেলের চাহিদা অনুযায়ী আর চলতি অর্থবছরে সম্ভাব্য বিক্রির পরিমাণ ধরা হয়েছে পাঁচ লাখ ৫৬ হাজার ৫০০। উৎপাদন আর বিক্রি বৃদ্ধির ফলে এ খাত থেকে সরকার বিপুল অঙ্কের রাজস্ব পাচ্ছে। গত অর্থবছরে সরকার এ শিল্প থেকে এক হাজার ২৭৮ কোটি ৬৮ লাখ টাকার রাজস্ব পেয়েছে। এর মধ্যে ১৩৫ কোটি টাকা করপোরেট কর, আট কোটি ৬৮ লাখ টাকার ব্যক্তি কর ও এক হাজার ১৩৫ কোটি টাকার আমদানি কর।

বলা হয়, চলতি অর্থবছর থেকে নতুন ভ্যাট আইন বাস্তবায়ন হচ্ছে। এ আইনে মোটরসাইকেল শিল্পে বেশ কিছু করারোপ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছেÑব্যবসায়িক পর্যায়ে পাঁচ শতাংশ হারে ভ্যাট আরোপ, আমদানি পর্যায়ে পাঁচ শতাংশ হারে অগ্রিম করারোপ, সব আমদানিকারক পর্যায়ে যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশ ন্যূনতম আমদানি মূল্য প্রতি কেজি চার ডলারে উন্নীতকরণ এবং মোটরসাইকেল রেজিস্ট্রেশন ব্যয়ের ওপর ১০ শতাংশ হারে সম্পূরক শুল্কারোপ। বাড়তি করারোপের ফলে প্রতিটি মোটরসাইকেলের বিক্রি পর্যায়ে দাম প্রায় ১০ হাজার টাকা বেড়ে গেছে, কমেছে বিক্রি। ব্যবসায়িক পর্যায়ে পাঁচ শতাংশ হারে ভ্যাট আরোপের প্রভাব বিষয়ে বলা হয়, নতুন ভ্যাট আইন অনুযায়ী পাঁচ শতাংশ মূসক পরোক্ষভাবে ক্রেতাকে পরিশোধ করতে হবে। এর ফলে মোটরসাইকেলের দাম বৃদ্ধি পাবে, প্রভাব পড়বে সামগ্রিক ব্যবসায়। মোটরসাইকেল অনুমোদিত বিক্রয় পরিবেশক, ডিলারের মাধ্যমে বিক্রি করা হয়। নতুন আইন অনুযায়ী, প্রতিটি পর্যায়ে বিক্রয়ের জন্য বিক্রিমূল্যের ওপর পরিবেশক ও ডিলারকে পাঁচ শতাংশ হারে মূসক প্রদান করতে হবে। এক্ষেত্রে প্রতিটি মোটরসাইকেলের দাম ৯ থেকে ১০ হাজার টাকা বৃদ্ধি পায়।

উদাহরণ দিয়ে বলা হয়, কোম্পানি একটি মোটরসাইকেল পরিবেশকের কাছে এক লাখ টাকায় বিক্রি করে। বিক্রয় পরিবেশক ডিলারের কাছে মূসক ছাড়া এক লাখ ১০ হাজার টাকায় বিক্রি করে। আর ডিলার মূল ক্রেতার কাছে ভ্যাট ছাড়া বিক্রি করেন এক লাখ ১৬ হাজার টাকায়। এক লাখ টাকার মোটরসাইকেলের ক্ষেত্রে উৎপাদন পর্যায়ে নতুন ও পুরাতন আইনের ক্ষেত্রে দেখা যায়, আমদানি মূল্য ৭০ হাজার টাকার সঙ্গে ৩০ হাজার টাকা ভ্যালু এডিশন করা হয়। ফলে উৎপাদন পর্যায়ে প্রভাব পড়েনি। বিক্রয় পরিবেশক পর্যায়ে দেখা যায়, পুরাতন আইনে ক্রয়মূল্য এক লাখ টাকা, ভ্যালু এডিশন ১০ হাজার টাকা, ভ্যাট ১৫ হাজার টাকাসহ (আউটপুট ভ্যাট ১৫ শতাংশ) মোট মূল্য দাঁড়ায় এক লাখ ১১ হাজার ৫০০ টাকা। আর নতুন আইনে ক্রয়মূল্য, ভ্যালু এডিশন ঠিক থাকলেও ভ্যাট হয় ৫৫ হাজার টাকা (পাঁচ শতাংশ হারে)। ভ্যাটের কারণে প্রতিটি গাড়ির মূল্য বেড়ে যায় চার হাজার টাকা।

অপরদিকে, ডিলার পর্যায়ে পুরাতন আইনে ইনপুট ভ্যাট ১৫ শতাংশ (১৫০০ টাকা), খরচ (ক্রয়মূল্যসহ) এক লাখ ১০ হাজার টাকা, ভ্যালু এডিশন ছয় হাজার টাকা, আউটপুট ভ্যাট ১৫ শতাংশসহ (৯০০ টাকা) মোট খরচ দাঁড়ায় এক লাখ ১৮ হাজার ৪০০ টাকা। আর নতুন আইনে খরচ (ক্রয়মূল্যসহ), ভ্যালু এডিশন ঠিক থাকলেও ইম্পুট ভ্যাট পাঁচ শতাংশ (৫৫০০ টাকা) ও আউটপুট ভ্যাট পাঁচ শতাংশের (৬০৭৫ টাকা) ফলে দাম বেড়ে দাঁড়ায় এক লাখ ২৭ হাজার ৫৭৫ টাকা। অর্থাৎ, ডিলার পর্যায়ে প্রতিটি মোটরসাইকেলে ৯ হাজার ১৭৫ টাকা বেড়ে যায়।

চিঠিতে বলা হয়, পুরাতন আইনে উৎপাদনকারীরা ভ্যাট অব্যাহতিপ্রাপ্ত ছিল। কিন্তু বিক্রয় পরিবেশক ও ডিলাররা ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট প্রদান করেছে। কিন্তু নতুন আইনে বিক্রি মূল্যের ওপর ভ্যাট প্রদান বাস্তবায়ন হওয়ায় মোট ভ্যাট বাবদ খরচ বর্তমান মূল্যের চেয়ে ১০ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। সরকার মোটরসাইকেলের আমদানি শুল্ক হ্রাস ও ভ্যাট অব্যাহতি দেওয়ায় এ শিল্পে বিনিয়োগ বেড়েছে এবং প্রতিষ্ঠানগুলো উৎপাদনে আগ্রহী হয়। ফলে ক্রেতারা আন্তর্জাতিক মানের মোটরসাইকেল পেয়েছে। ২০১৪ সালে মোটরসাইকেল বিক্রির পরিমাণ ছিল এক লাখ ৮৫ হাজার ইউনিট। আর ২০১৮ সালে এসে দাঁড়িয়েছে চার লাখ ৫০ হাজার ইউনিট। নতুন আইন বাস্তবায়নের ফলে মোটরসাইকেলের মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় এ শিল্পের বাজার ব্যাপক হারে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ শিল্পের বিকাশে বিক্রয় পরিবেশক ও ডিলার পর্যায়ে মূসক পূর্বের ন্যায় ১৫ শতাংশ বহাল রাখার সুপারিশ করা হয়।

রেজিস্ট্রেশনের ব্যয়ের ওপর ১০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক প্রত্যাহারের সুপারিশ করে বলা হয়, বর্তমানে ১০০ সিসি মোটরসাইকেলের রেজিস্ট্রেশন ব্যয় ২১ হাজার, ১৫০ সিসির ২৪ হাজার টাকা। দীর্ঘদিন ধরে এ ব্যয় কমানোর সুপারিশ করা হলেও তা কমানো হয়নি। বরং চলতি বাজেটে ১০ শতাংশ সম্পূরক শুল্কারোপ করা হয়েছে। ফলে ক্রেতাকে বাড়তি দুই হাজার ১০০ ও দুই হাজার ৪০০ টাকা অতিরিক্ত দিতে হচ্ছে। ফলে মোটরসাইকেলের মূল্যের ৩৩ শতাংশ হলো রেজিস্ট্রেশন ব্যয়। যেখানে পাশ্ববর্তী দেশে নিবন্ধন ব্যয় ছয় থেকে সাত হাজার টাকা। ব্যয় কমানো হলে বিক্রি বৃদ্ধি পাবে।

মূসক, আগাম কর, ব্যবসায়ী পর্যায়ে মূসক ও সম্পূরক শুল্কের ফলে এ শিল্পের ক্ষতি তুলে ধরে বলা হয়, ২০১৯ সালের মে ও জুনে বিক্রি হয়েছে ৬৩ হাজার ৫০০ এবং ৪৯ হাজার ৬০০ ইউনিট। নতুন আইন বাস্তবায়ন হওয়ার পর জুলাইয়ে বিক্রি হয়েছে ২০ হাজার ইউনিট। আর ডিসেম্বরে বিক্রি হয়েছে ৩৮ হাজার। মোটরসাইকেল শিল্পের প্রবৃদ্ধি ১৫ শতাংশ ধরা হলেও বর্তমান বাজারচিত্র অনুযায়ী তা ৩০ শতাংশ হারে হ্রাস পাবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিক্রি ৩০ শতাংশ হারে হ্রাস পেলে এ শিল্পে বেকারত্বও ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে। আর সরকার আগের বছরের তুলনায় ৫৯০ কোটি টাকার রাজস্ব কম পাবে এবং মূসক, আগাম কর, ব্যবসায়ী পর্যায়ে মূসক, সম্পূরক শুল্ক বিবেচনা করা হলে রাজস্ব আগের অর্থবছরের তুলনায় ৩৫০ কোটি টাকা বৃদ্ধি পাবে।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..