প্রচ্ছদ প্রথম পাতা

ঊর্ধ্বমুখী বাজারে ‘ইনসাইডার ট্রেডিং’ বাড়ছে ‘শর্ট সেল’

 

নিজস্ব প্রতিবেদক: সূচক ও লেনদেনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ‘ইনসাইডার ট্রেডিং’। একই সঙ্গে বাড়ছে সিকিউরিটিজ হাউজের মাধ্যমে ‘শর্ট সেল’। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) বিভিন্ন হাউজের মাধ্যমে দুই শতাধিক শর্ট সেল হয়েছে বলে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) স্থাপিত ‘ইনস্ট্যান্ট ওয়াচ মার্কেট সার্ভিলেন্স সিস্টেম’ (এমএসএস) সতর্ক বার্তা দিয়েছে। এ বিষয়ে তদন্ত-পূর্বক ডিএসইর মতামত চেয়ে চিঠি ইস্যু করেছে বিএসইসি।

উল্লেখ্য, ‘ইনসাইডার ট্রেডিং’ হচ্ছে, কোম্পানির কোনো গোপন খবর স্টক এক্সচেঞ্জ বা গণমাধ্যমে প্রকাশ না করে নিজেদের মধ্যে লেনদেন করাকে সুবিধাভোগী প্রকৃত গ্রাহক (ইনসাইডার টার্নওভার নেট ক্লায়েন্ট) বলে। যদিও তালিকাভুক্ত কোম্পানির যে কোনো মূল্য সংবেদনশীল তথ্য প্রথমে স্টক এক্সচেঞ্জের  ওয়েবসাইটের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের অবহিত করার বিধান রয়েছে। সেটি না করে প্রথমে তা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বাজারে প্রচার করে তারা সিংহভাগ শেয়ার ক্রয় করে। তারপর তা মূল্য সংবেদনশীল তথ্য হিসেবে ডিএসইতে প্রচার করা হয়। তখন সেই তথ্যে আকৃষ্ট হয়ে যখন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা শেয়ার ক্রয় করতে থাকেন তখন বেশি দামে সিন্ডিকেট সেগুলো বিক্রি করতে থাকে; যা আইনগতভাবে সম্পূর্ণ অবৈধ।

অন্যদিকে হিসাবধারীর পোর্টফোলিওতে শেয়ার না থাকা সত্ত্বেও শেয়ার বিক্রি করাকে ‘শর্ট সেল’ বলে।

জানা গেছে, ঊর্ধ্বমুখী বাজারে বাড়ছে প্রাতিষ্ঠানিক ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ। এ সুযোগে কিছু কোম্পানির শেয়ারদর অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। স্টক এক্সচেঞ্জ দায়সারা গোছের একটি কারণ দর্শানো নোটিস দেয়। কোম্পানিগুলোর নিকট থেকে মেলে না সদুত্তর। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। এমন অবস্থাকে ইনসাইডার ট্রেডিং নামক কারসাজি করে শেয়ারদর বাড়ানো হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত সাত কার্যদিবসে ৯টি কোম্পানির শেয়ারদর অস্বাভাবিক বেড়েছে। শেয়ারদর বাড়ার পেছনে কোনো কারণ নেই বলে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের জানিয়েছে কোম্পানিগুলো। যদিও বিএসইসি এসব কোম্পানির অস্বাভাবিক দর বৃদ্ধির কারণ অনুসন্ধানে এখনও তদন্তে নামেনি। কোম্পানিগুলো হলো- সিঅ্যান্ডএ টেক্সটাইল, কে অ্যান্ড কিউ, মেঘনা কনডেন্স মিল্ক, লিগ্যান্সি ফুড, রূপালী ব্যাংক, মেঘনা পেট, সমতা লেদার, রিজেন্ট টেক্সটাইল ও খুলনা প্রিন্টিং।

এ প্রসঙ্গে ডিএসইর পরিচালক ও সাবেক প্রেসিডেন্ট শাকিল রিজভী শেয়ার বিজকে বলেন, ‘পুঁজিবাজারে মিথ্যা তথ্য প্রচার করে শেয়ারের দাম বাড়ানো কিংবা তথ্য গোপন করে বা ইনসাইডার ট্রেডিংয়ের ক্ষেত্রে আইনগত নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। পুঁজিবাজারে কারা এ ধরনের কার্যক্রম চালায় তা চিহ্নিত করা কঠিন। যদি তা চিহ্নিত করা সম্ভব হয় তাহলে তাদের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করার বিধান রয়েছে। আর সময় সময় যেসব কোম্পানির শেয়ারের দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়তে থাকে সেসব কোম্পানিকে কেন দাম বাড়ছে কারণ জানতে চেয়ে নোটিস করা হচ্ছে।’

বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঢালাওভাবে বাজার অতিমূল্যায়িত হয়ে গেছে এমন কথা বলা ঠিক হবে না। কারণ এখনও অনেকে কোম্পানির শেয়ারের দাম তুলনামূলকভাবে অনেক নিচেই রয়ে গেছে। তবে কিছু কোম্পানির শেয়ারের দাম অতিমূল্যায়িত হয়ে গেছে। ইনসাইডার ট্রেডিং হচ্ছে কি না- তা খতিয়ে দেখতে সংশ্লিষ্টদের আরও হার্ডলাইনে যাওয়া দরকার বলে মনে করছেন তারা।

এদিকে অস্বাভাবিকভাবে কোনো কোম্পানির শেয়ারের দর বৃদ্ধির নেপথ্যে অবশ্যই কারণ আছে বলে মনে করেন পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, গুজব ছড়িয়ে শেয়ারদর বৃদ্ধি করে হাতে থাকা শেয়ার ছেড়ে দেয় একটি অসৎ চক্র। আর এ বিষয়ে কোম্পানিকে স্টক এক্সচেঞ্জের দেওয়া কারণ দর্শানোর নোটিস ফর্মালিটি রক্ষা ছাড়া কিছুই নয়।

এ প্রসঙ্গে শীর্ষস্থানীয় একটি ব্রোকারেজ হাউজের প্রধান নির্বাহী শেয়ার বিজকে বলেন, ‘ডিএসই বা সিএসইর দেওয়া কারণ দর্শানোর উদ্যোগ অবশ্যই প্রশংসিত। তবে এর পাশাপাশি যদি শেয়ার লেনদেনের বিষয়টি নজরদারি করা হতো, তবে দর বৃদ্ধির নেপথ্যে যারা কাজ করছে তাদের চিহ্নিত করা সম্ভব হতো।’

তার মতে, শেয়ারবাজারে কারসাজি মূলত এভাবেই হয়। অস্বাভাবিকভাবে শেয়ারদর বাড়ানোর নেপথ্যে যারা, তাদের আইনের আওতায় আনা জরুরি। একটি স্বাভাবিক মার্কেটের জন্য এ কাজটি আরও জোরালোভাবে করা নিয়ন্ত্রক সংস্থার দায়িত্ব।

এদিকে বিএসইসি সূত্রে জানা গেছে, শুধু মে মাসেই বিএসইসির ইনস্ট্যান্ট ওয়াচ মার্কেট সার্ভিলেন্স সিস্টেমে (এমএসএস) দুই শতাধিক শর্ট সেলের সতর্কবার্তা দিয়েছে। গত ১৮ জুন সার্ভিলেন্স বিভাগের নির্বাহী পরিচালক মো. সাইফুর রহমান স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে ডিএসইর চিফ রেগুলেটরি অফিসারকে (সিআরও) অভিযুক্ত সিকিউরিটিজ হাউজের বিরুদ্ধে তদন্তপূর্বক মতামত দিতে বলা হয়েছে। পত্র পাওয়ার পরবর্তী ২০ কার্যদিবসের মধ্যে বিএসইসিতে লিখিত মতামত জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে ওই চিঠিতে।

জানা গেছে, মে মাসের শেষ দিকে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের বিভিন্ন ব্রোকারেজ হাউজে দুই শতাধিক শর্ট সেল সংঘটিত হয়। এ ধরনের কর্মকাণ্ড বিএসইসির সফটওয়্যারে ধরা পড়ে, যা পর্যালোচনা করে গুরুত্বপূর্ণ ২০০টি শর্ট সেল তদন্তের নির্দেশনা দেওয়া হয়। শর্ট সেল হওয়া ব্রোকারেজ হাউজের মধ্যে রয়েছে, ব্রোকার আইডি (এমএসএস অনুযায়ী) -এবিডিব্রোকার, এডিআইব্রোকার, এআরসিব্রোকার, বিএলআইব্রোকার, বিএসআরব্রোকার, এফআইসিব্রোকার, ইপিএসব্রোকার, আইএলডিব্রোকার, আইএসটিব্রোকার, এলএএনব্রোকার, এসএলটিব্রোকার ও  টিসিএসব্রোকার। এসব ব্রোকারেজ হাউজের মাধ্যমে বিভিন্ন কোম্পানির শর্ট সেল হয়েছে বলে বিএসইসির অভিযোগ।

নিষিদ্ধ শর্ট সেলের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত বলে মনে করেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম। তিনি শেয়ার বিজকে বলেন, ‘সিকিউরিটিজ হাউজগুলো যে টেকনিক্যাল সমস্যার কথা বলে যদি শর্ট সেল না করে থাকে, তাহলে তথ্য-উপাত্ত দিয়ে প্রমাণ করুক। শর্ট সেলের জন্য ব্যবস্থা নেওয়ার আগে তদন্ত করা হয় তারপর হিয়ারিং করা হয়। তারা অনেক সময় পান। কিন্তু কখনোই অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে শাস্তির ব্যবস্থা করা হয় না।’

এ প্রসঙ্গে পুঁজিবাজার বিশেষজ্ঞ ও অর্থনীতিবিদ আবু আহমেদ বলেন, ‘ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা হারানো পুঁজি উদ্ধার করতে গিয়ে আবার যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে বিষয়ে খেয়াল রাখতে হবে। অতিরিক্ত শর্ট সেল ও ইনসাইডিং ট্রেড বন্ধ করতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার নজরদারি আরও বাড়ানো উচিত।’

এদিকে বিএসইসির পক্ষ থেকে ১১ ধরনের কারসাজি সম্পর্কে বিনিয়োগকারীদের সতর্ক করা হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে, শেয়ার না থাকার পরও বিক্রি (শর্ট সেল), লেনদেন একাগ্রতা, বিজ্ঞপ্তি সতর্কতা, সুবিধাভোগী প্রকৃত গ্রাহক, সর্বশেষ অবস্থান সূচক, সর্বশেষ মূল্য কারসাজি ও আদেশের বিস্তার, স্বয়ংক্রিয় গ্রাহক, সামনে চলমান গ্রাহক (ফ্রন্ট রানিং ক্লায়েন্ট), চক্রাকার লেনদেন, প্রতারণা ইত্যাদি। চক্রাকার লেনদেন কারসাজির আওতায় দাম বাড়াতে পরিকল্পিতভাবে একাধিক ব্যক্তির মধ্যে কৃত্রিম লেনদেনের মাধ্যমে দাম প্রভাবিত করা হয়। পরপর তিন কার্যদিবস নির্দিষ্ট শেয়ারের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ শেয়ার কেনাবেচা করা হয় লেনদেন একাগ্রতার আওতায়।

 

 

 

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..