প্রচ্ছদ শেষ পাতা

ঋণখেলাপির দায়ে চট্টগ্রামে এক বছরে ৫৯৯ মামলা

সাইফুল আলম, চট্টগ্রাম: সাধারণত ব্যবসার প্রয়োজনে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যক্তি এবং প্রতিষ্ঠানকে ঋণ সুবিধা প্রদান করে। কিন্তু চট্টগ্রামের ৫৯৯ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান ঋণের টাকা সময়মতো পরিশোধ করতে পারেনি। ফলে পাওনাদার ব্যাংক এসব খেলাপির বিরুদ্ধে চট্টগ্রামের অর্থঋণ আদালতে ৫৯৯টি মামলা করে। ব্যাংকগুলোর খেলাপি প্রতিষ্ঠানের তালিকায় আছে ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠান থেকে বৃহৎ শিল্পগ্রুপের নাম। বিপুল পরিমাণের পাওনা আদায় নিয়ে চিন্তিত অধিকাংশ ব্যাংক ব্যবস্থাপক।
অর্থ ঋণ আদালতের সূত্রে জানা যায়, ২০১৮ সালে ব্যবসায়িক প্রয়োজনের বিভিন্ন সময় আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে ঋণ নিয়ে সময়মতো পরিশোধ করতে না পেরে খেলাপি হয়ে পড়ে চট্টগ্রামের ৫৯৯টি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে আছে ভোজ্যতেল আমদানিকারক, আবাসন নির্মাতা, পোশাক উৎপাদন ও জাহাজ ভাঙা শিল্পপ্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন ধরনের পাইকারি পণ্য বিক্রেতা। আর এসব খেলাপি গ্রাহকের কাছে প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা পাওনা আছে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর। এর মধ্যে ব্যবসায়ী শাহাবুদ্দিন আলমের মালিকানাধীন এসএ গ্রুপের বিরুদ্ধে মামলা হয় মোট ১৩টি।
বড় ঋণখেলাপি গ্রুপের তালিকায় আছে ইয়াসির গ্রুপ, ক্রিস্টাল গ্রুপ, নূরজাহান গ্রুপ, সানম্যান গ্রুপ, সানোয়ারা গ্রুপ, হালদা গ্রুপ, ফরচুন গ্রুপ প্রভৃতি। আর এসএমই খাতের সোকাস ফ্যাশন, লেডিস সিক্রেট, আমিন স্টোর, গোল্ডেন চয়েস এন্টারপ্রাইজ, মেসার্স তিথি অ্যালুমিনিয়াম স্টোর, মেসার্স হক ইলেকট্রিক অ্যান্ড ইলেকট্রনিক্স, মুজাহিদ ডিপার্টমেন্টাল স্টোর, ফ্যামিলি ফুড অ্যান্ড হোম সার্ভিস, জন আই পি এম, আবিবা টেলিকম, মেসার্স তাহমিদ এন্টারপ্রাইজ, আরিফ ডিস্ট্রিবিউশন এবং ইরা ট্রেডিং, মেসার্স মেঘনা হোম সার্ভিস, মেসার্স সাদিয়া কার্গো এন্টারপ্রাইজ, মেসার্স ইসলাম অ্যান্ড ব্রাদার্স, মেসার্স নিউ শাহিন অ্যান্ড ব্রাদার্স, মেসার্স নওজোয়ান, মেসার্স সাইরা হোসেন ট্রেডিং, মাহবুবা আক্তার, মেসার্স বিসমিল্লাহ আয়রন, মেসার্স রুপালি প্রেস, মেসার্স সাগা-ই- বাজার, নওজোয়ান শাহ, মেসার্স কাজল এন্টারপ্রাইজ, মেসার্স মহুয়া নকশা, আকলিমা আহমদ, দিদার ইলেক্ট্রিক, শাওন মোবাইল মিডিয়া, বিসমিল্লাহ ট্রেডার্স, আহমদ হোসেন, হাশেম নুর, মেসার্স আল বাইক সিএনজি ওয়ার্কশপ, মেসার্স তারা এন্টারপ্রাইজ, মেসার্স জামাল এন্টারপ্রাইজ প্রভৃতি প্রতিষ্ঠানসহ আরও বেশি কিছু প্রতিষ্ঠান।
মাসভিত্তিক প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করা দেখা যায়, ২০১৮ সালে জানুয়ারি মাসে ১২টি, ফেব্রুয়ারিতে ১৩টি, মার্চে ৪৯টি, এপ্রিলে ৩২টি, মে মাসে ৩৪টি, জুনে ২৫টি, জুলাইয়ে ৩৭টি, আগস্টে ৫১টি, সেপ্টেম্বরে ৬৪টি, অক্টোবরে ৯৭টি এবং নভেম্বরে ১৮৫টি মামলা হয়। গ্রাহকের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের শীর্ষে ব্র্যাক ব্যাংক। ব্যাংকটি মোট মামলা করে ১১৩টি। ইস্টার্ন ব্যাংক মোট ৬১টি মামলা করে দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল। সাউথ ইস্ট ব্যাংক, লংকাবাংলা ফাইন্যান্স, উত্তরা ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক, ওয়ান ব্যাংক, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক, জনতা, সোনালী ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, ডার্চ-বাংলা ব্যাংক, ডেলটা ব্র্যাক, অগ্রণী ব্যাংক, আল-আরাফাহ্ ব্যাংক প্রভৃতি।
ঋণখেলাপি একাধিক প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তারা বলেন, আগ্রাসী ব্যাংকিং, ব্যাংক ঋণের বেশি সুদ, ব্যবসায়িক অদক্ষতা, টানা লোকসান ও ব্যাংকের দায় পরিশোধে ব্যর্থতার কারণে চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীদের এমন অবস্থা। এ অবস্থায় আমাদের এক অঙ্কের সুদে অর্থায়ন করতে হবে, যাতে আমরা ব্যাংকের টাকা সুদে-আসলে দিয়ে দিতে পারব।
সাবেক ব্যাংকার ও মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সচিব সলিম উল্লাহ বলেন, ব্যাপক দুর্নীতি ও অনিয়ম, ঋণ বিতরণে রাজনৈতিক প্রভাব, সুশাসনের অভাব ও ব্যাংকগুলোর ওপর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ কম থাকার কারণেই মূলত ঋণখেলাপির পরিমাণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। এছাড়া বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে পরিচালকরা নিজেদের মধ্যে ঋণ ভাগাভাগি করায় সেখানেও খেলাপির সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে। এ কালচার থেকে বের হতে না পারলে আগামীতে অর্থনৈতিক বিপর্যয় নেমে আসবে। ফলে খেলাপিদের বিরুদ্ধে নিয়ন্ত্রণ সংস্থাগুলোর কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
উল্লেখ্য, ২০১৭ সালে ঋণখেলাপির দায়ে চট্টগ্রামে সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো মোট ৬৬৯টি মামলা করে। আগের বছর এ সংখ্যা ছিল ৭৪৪টি, ২০১৫ সালে ৯৫৮টি ও ২০১৪ সালে ৪৫৪টি।

সর্বশেষ..