ফারুক রহমান, খুলনা : বঙ্গোপসাগর পাড়ে সুন্দরবনের দুবলার চরে শুরু হচ্ছে শুটকি মৌসুম। এ মৌসুমকে ঘিরে বাগেরহাটের মোংলার উপকূলের নদ-নদীতে জড়ো হয়েছে শতশত জেলে ট্রলার। বনবিভাগের কাছ থেকে পাস-পারমিট নিয়ে আজ শনিবার মধ্যরাত থেকে সমুদ্রে যাত্রা করবেন এসব জেলেরা। এখন মোংলায় অবস্থান নিয়ে এসব জেলেরা তাদের প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ট্রলার ভর্তি করছেন। এরই মধ্যে জীবনের ঝুঁকি ও ঋণের বোঝা নিয়ে মাছ আহরণে সমুদ্রে যাত্রা করছেন খুলনা জেলার পাইকগাছা উপজেলার উপকূলীয় এলাকার সমুদ্রগামী জেলেরা।
সংশ্লিষ্ট স–ত্রে জানা গেছে, ইলিশ ধরার নিষিদ্ধ সময় ২৫ অক্টোবর শেষ হলে সুন্দরবনের দুবলার চরে শুঁটকি মৌসুম শুরু হবে। সমুদ্রগামী শুঁটকিপল্লির জেলেরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মৎস্য আহরণ করলেও নানা প্রতিকূলতায় ভাগ্যের চাকা ঘোরাতে পারেনি। ধারাবাহিক ক্ষতির মুখে পুঁজি, জাল ও নৌকা হারিয়ে অনেকেই পেশা বদলেছেন। অনেকে চড়া হারে মহাজনদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে এ পেশায় টিকে থাকতে কঠোর সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন।
পাইকগাছা উপজেলা মৎস্য অফিস জানায়, শীত মৌসুমে বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরতে যাওয়ার জন্য পাইকগাছার জেলে পল্লিগুলো থেকে প্রায় ২৫০ ট্রলার ও নৌকা নিয়ে ১ হাজার ৯৫০ জন জেলে রওনা দিয়েছেন। বুধবার পাইকগাছা থেকে রওনা দিয়ে সুন্দরবনের দুবলার চরে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে তারা মোংলায় অবস্থান করবে। নিষেধাজ্ঞার সময় শেষ হলে পাস পারমিট নিয়ে সুন্দরবনের দুবলার চরে অস্থায়ী জেলেপল্লি তৈরি করে থাকবে।
জেলেরা সমুদ্রে মৎস্য আহরণকে ঘিরে নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখছেন। ঘুরে দাঁড়ানোর আশায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সমুদ্র যাত্রা করছেন উপকূলের জেলেরা। যে যার মতো প্রস্তুত করছেন জাল, দড়ি ও নৌকা-ট্রলার। কেউ গড়ছেন নতুন ট্রলার, আবার কেউ পুরোনো নৌকা মেরামত করে নিয়েছেন। প্রস্তুতি অনুযায়ী অনেকেই আগেভাগেই রওনা দিয়েছেন।
দুবলার চর বাংলাদেশ অংশের সুন্দরবনের দক্ষিণে, কটকার দক্ষিণ-পশ্চিমে এবং হিরণ পয়েন্টের দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত একটি দ্বীপ, যা চর নামে হিন্দুধর্মের পুণ্যস্নান, রাসমেলা এবং হরিণের জন্য বহুল পরিচিত। কুঙ্গা ও মরা পশুর নদের মাঝে এটি একটি বিচ্ছিন্ন চর। এই চরের মোট আয়তন প্রায় ৮১ বর্গমাইল। দুবলার চরে তৈরি হয় জেলে গ্রাম। মাছ ধরার সঙ্গে চলে শুঁটকি শুকানোর কাজ।
বর্ষা মৌসুমের ইলিশ শিকারের পর বহু জেলে পাঁচ মাসের জন্য সুদূর কক্সবাজার, চট্টগ্রামসহ, বাগেরহাট, পিরোজপুর, খুলনা ও সাতক্ষীরা থেকে ডেরা বেঁধে সাময়িক বসতি গড়ে সেখানে। মেহের আলীর খাল, আলোরকোল, মাঝেরচর, অফিসকেল্লা, নারিকেলবাড়িয়া, মানিকখালী, ছাফরাখালী ও শ্যালারচর প্রভৃতি এলাকায় জেলে পল্লি স্থাপিত হয়। এই পাঁচ মাস তারা শুঁটকি তৈরিতে ব্যস্ত থাকেন। এখান থেকে শুঁটকি চট্টগ্রামের আসাদগঞ্জের পাইকারী বাজারে মজুত ও বিক্রি করা হয়।
খুলনা জেলার বিভিন্ন নদ-নদীতে পলি জমে ভরাট হয়ে গেছে। আর একারণে শুধু সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল হওয়ার কারণে এবং নানা প্রতিকূলতায় ভাগ্যের চাকা ঘোরাতে পারেনি জেলে পরিবারগুলো। ব্যাংক থেকে জেলেদের সহজ শর্তে ঋণ প্রদান করার কথা থাকলেও বিভিন্ন শর্ত জুড়ে দেয়া হয়। সেগুলো পূরণ করতে ব্যর্থ হয়ে শেষ পর্যন্ত মহাজনের কাছ থেকে চড়া সুদে ঋণ নিতে বাধ্য হয় হত দরিদ্র জেলেরা।
পাইকগাছা উপজেলার বোয়ালিয়া জেলেপল্লির শিতেনাথ বিশ্বাস বলেন, প্রতিবছর আমরা মহাজনদের কাছ থেকে ঋণ করে সমুদ্রে যাই। সরকারিভাবে আমরা তেমন সাহায্য-সহযোগিতা পাই না। সুন্দরবনে জলদস্যু-বনদস্যুর উৎপাত ও মুক্তিপণ আদায়সহ আসাধু বনরক্ষীদের দৌরাত্ম্য কিছুটা বন্ধ হলেও এখনও সীমাহীন সমস্যায় মধ্যে থাকতে হয় আমাদের।
বোয়ালিয়ার জেলে অধিবাস বিশ্বাস ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমরা প্রতিবছর জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সমুদ্র থেকে মাছ ধরে কোটি কোটি টাকা রাজস্ব দিই সরকারকে। আমরা সমুদ্রে মাছ ধরার জন্য কোনো ঋণ পাই না। জেলেদের সব সমস্যা সমাধানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণসহ প্রয়েজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জোর দাবি জানান তিনি।
প্রিন্ট করুন











Discussion about this post