প্রচ্ছদ প্রথম পাতা

ঋণের সাড়ে ২৯ শতাংশই শীর্ষ ২৩ গ্রাহকের কাছে

অগ্রণী ব্যাংক

পলাশ শরিফ: নিয়ম ভেঙে বিতর্কিত ব্যবসায়ী গ্রুপকে দেওয়া বড় ঋণের বোঝায় ধুঁকছে রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ব্যাংক। দফায় দফায় সুযোগ দিয়েও সিংহভাগ গ্রুপের কাছ থেকে ঋণ আদায় করা যাচ্ছে না। ২০১৮ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকটির শীর্ষ ২৩ গ্রাহকের ঋণের পরিমাণ সাড়ে ১১ হাজার কোটি টাকা ছাড়াল, যা ব্যাংকটির মোট ঋণের প্রায় সাড়ে ২৯ শতাংশ। এ অবস্থাকে ব্যাংকের জন্য বাড়তি চাপ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। সে সঙ্গে ছাড় না দিয়ে ঋণ আদায়ে শক্ত অবস্থানে যাওয়ার তাগিদও দিচ্ছে ব্যাংকটি।
প্রাপ্ত তথ্যমতে, ২০১৮ সালের ডিসেম্বর শেষে অগ্রণী ব্যাংকের শীর্ষ ঋণগ্রাহকের সংখ্যা ২৩-এ দাঁড়াল। এর মধ্যে ২০টিই বেসরকারি ব্যবসায়িক গ্রুপ। এর বাইরে দুটি করপোরেশনসহ তিনটি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান রয়েছে। শীর্ষ গ্রাহকের মধ্যে টাকার অঙ্কে সবচেয়ে বেশি ঋণ রয়েছে নরসিংদীর জাকিয়া গ্রুপের কোম্পানি জাকিয়া কটনটেক্সের নামে। জালিয়াতির মাধ্যমে নেওয়া ওই ঋণের অঙ্ক ৭১৫ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। বারবার প্রতিশ্রুতি দিয়ে সুবিধা নিলেও ঋণ পরিশোধ করছে না বিতর্কিত কোম্পানিটি।
ঋণের অঙ্কে এর পরের অবস্থানে রয়েছে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি বাংলাদেশ সার্ভিসেস লিমিটেড। রাজধানীর পাঁচতারকা হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের মালিক ওই প্রতিষ্ঠানটি। সম্প্রতি হোটেলটির অবকাঠামোগত উন্নয়ন ব্যয় মেটাতে অগ্রণী ব্যাংক থেকে বড় ঋণ নিয়েছে কোম্পানিটি। সর্বশেষ বাংলাদেশ সার্ভিসেসের মোট ঋণ ৭১৪ কোটি ৭৯ লাখ টাকা ছাড়াল। এমনকি, একক গ্রাহক হিসেবে বাংলাদেশ সার্ভিসেসের মোট ঋণ এখন অগ্রণী ব্যাংকের মূলধনের ১৫ শতাংশেরও বেশি। যদিও রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান হওয়ায় বড় অঙ্কের ওই ঋণ নিয়ে ব্যাংকটির উদ্বেগের কোনো কারণ নেই।
ব্যাংকটিতে এখন ২৩ বড় ঋণগ্রহীতা রয়েছে। শীর্ষ ওইসব গ্রাহকের কাছে অগ্রণী ব্যাংকের মোট ঋণের পরিমাণ সাড়ে ১১ হাজার কোটি টাকা ছাড়াল। আর ব্যাংকের হিসাবে, ২০১৮ সালের ডিসেম্বর শেষে অগ্রণী ব্যাংকের মোট ঋণ প্রায় ৩৯ হাজার ৩৩৯ কোটি ১৩ লাখ টাকায় দাঁড়াল।
অগ্রণী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ শামস-উল ইসলাম শেয়ার বিজকে বলেন, ‘বড় ঋণের বেশিরভাগই পুরোনো, যেগুলো অনেক আগে দেওয়া হয়েছে। স্বনামখ্যাত কয়েকটি গ্রুপ ও রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বা করপোরেশনের ঋণ নিয়ে দুশ্চিন্তার কিছু নেই। কিছু ঋণ আদায় নিয়ে জটিলতা রয়েছে। অনেকে প্রতিশ্রুতি দিয়েও ঋণ পরিশোধ করেনি, যে কারণে ঋণের অঙ্ক বেড়ে গেছে। আমরা ওই ঋণগুলো নিয়মিত রাখা ও পাওনা আদায়ে জোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।’
অগ্রণী ব্যাংকের শীর্ষ অন্য গ্রাহকের মধ্যে তানাকা ট্রেডকমের প্রায় ৬৪৭ কোটি ৪০ লাখ টাকা, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের প্রায় ৬২৫ কোটি ৯১ লাখ টাকা, জজ ভুঁইয়া গ্রুপের প্রায় ৬৩৯ কোটি ১৩ লাখ টাকা, প্রাইম গ্রুপের প্রায় ৫৮৬ কোটি ৪৮ লাখ টাকা, শিকদার গ্রুপের প্রায় ৫৩৭ কোটি ৩১ লাখ টাকা ও বিএসআরএম গ্রুপের প্রায় ৪৯৪ কোটি টাকা ঋণ রয়েছে। অন্য বড় গ্রাহকের তালিকায় যমুনা, সিটি, থার্মেক্স, মুন, সোনালী, বেক্সিমকো, প্যাসিফিক, ম্যাগপাই, সিটি গ্রুপসহ আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান বা ব্যবসায়িক গ্রুপ রয়েছে।
‘মুষ্টিমেয় কয়েকজন বড় গ্রাহকের কাছেই ঋণের বড় অংশ আটকে যাওয়া ব্যাংকের জন্য ভালো নয়’ উল্লেখ করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ। শেয়ার বিজকে তিনি বলেন, ‘কয়েকজনের হাতে বড় অঙ্কের অর্থ আটকে গেলে ব্যাংকের ঝুঁকি বাড়ে। তাই ঋণ দেওয়ার আগেই বিষয়গুলো আমলে নেওয়া দরকার। যেহেতু বড় অঙ্কের অর্থ চলে গেছে; এখন ঋণ আদায়ের দিকে জোর দিতে হবে। বিশেষ করে, যারা ঋণ পরিশোধ
করছে না, তাদের কাছ থেকে তা আদায়ের কোনো বিকল্প নেই। আর যদি বারবার সুযোগ
দিয়েও ঋণ আদায় করা না যায়, তাহলে কঠোর অবস্থানে যেতে হবে। তা না হলে ঋণের অঙ্কের সঙ্গে ব্যাংকের ওপর চাপও বাড়বে। বড় গ্রাহকদের ঋণ প্রদান ও আদায় প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন উঠবে।’

সর্বশেষ..