দিনের খবর প্রথম পাতা

ঋণ-আমানত অনুপাতের নিচেই বেশিরভাগ ব্যাংকের বিনিয়োগ

জয়নাল আবেদিন: ঋণ আমানতের অনুপাতের (এডিআর) নিচে নেমে এসেছে বেশিরভাগ ব্যাংকের বিনিয়োগ। অনেক ব্যাংকই এখন নতুন বিনিয়োগে যাচ্ছে না। যেটুকু ঋণ দেয়া হচ্ছে, তা অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে। নতুন বিনিয়োগ কমে যাওয়ায় বেশিরভাগ ব্যাংকের বিনিয়োগ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বেঁধে দেয়া ঋণ আমানতের অনুপাতের নিচে নেমে গেছে। নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হওয়ায় বছর শেষে কাক্সিক্ষত প্রবৃদ্ধি অর্জনে সংশয় দেখা দিয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, ইসলামী উইংসহ সাতটি ব্যাংকের এডিআর নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি। বাকি ৫১টি ব্যাংকের এডিআর নির্ধারিত সীমার মধ্যেই রয়েছে। দেখা গেছে, অগ্রণী, রূপালী, সোনালী, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক ও সিটি ব্যাংক এনএ’র এডিআর ৬০ শতাংশেরও নিচে। যে সাতটি ব্যাংক নির্ধারিত সীমার ওপরে বিনিয়োগ করছে, সেগুলো হলো বেসিক, ন্যাশনাল, এনআরবি গ্লোবাল, পদ্মা, প্রিমিয়ার (ইসলামি উইং), স্ট্যান্ডার্ড ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক।

জানা গেছে, ব্যাংকগুলো কী পরিমাণ বিনিয়োগ করতে পারবে, তার সীমা বেঁধে দেয়া হয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে। আগে প্রতিটি ব্যাংক বিনিয়োগ করতে পারত মোট আমানতের ৮৫ শতাংশ। অর্থাৎ ১০০ টাকার আমানত নিয়ে ৮৫ টাকা বিনিয়োগ করতে পারত। ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য গত বছর কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ২ শতাংশ বাড়িয়ে দেয়া হয়। বলা হয়, এখন থেকে প্রচলিত ব্যাংকগুলো ১০০ টাকার আমানতের ৮৭ টাকা বিনিয়োগ করতে পারবে। অন্যদিকে ইসলামি শরিয়াহ অনুযায়ী পরিচালিত ব্যাংকগুলো ৯২ টাকা বিনিয়োগ করতে পারবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বেসরকারি ব্যাংকগুলোর বেশিরভাগেরই ঋণ আমানত অনুপাত ৮০ শতাংশের নিচে রয়েছে।

কয়েকজন ব্যাংকার জানিয়েছেন, কভিডের প্রাদুর্ভাবের কারণে বেশিরভাগ ব্যাংকই বিনিয়োগ দেয়ার ক্ষেত্রে সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নিয়েছে। কারণ, কভিডের প্রভাবে অভ্যন্তরীণ ও বিদেশে পণ্যের চাহিদা কমেছে। এতে শিল্পকারখানার উৎপাদন অর্ধেকে নেমে গেছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রকৃত বিনিয়োগকারীরা ব্যবসা সম্প্রসারণ করছেন না। তারা চলমান ব্যবসায় টিকে রাখার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু একশ্রেণির ব্যবসায়ী ঋণ নিয়ে আর ফেরত দেন না। তারাই ব্যাংকে ব্যাংকে ঋণ পাওয়ার জন্য ধরনা দিচ্ছেন। এ মুহূর্তে ব্যাংকগুলো ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে অত্যন্ত সতর্ক রয়েছে। ফলে নতুন বিনিয়োগ বাড়ছে না।

বিশ্লেষকরা বলছেন, বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি বাড়লে কর্মসংস্থান বেড়ে যায়। কারণ ঋণ নিয়ে উদ্যোক্তারা নতুন শিল্পকারখানা স্থাপন করেন। এতে বর্ধিত হারে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়। ফলে তা জাতীয় প্রবৃদ্ধিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে। কিন্তু নতুন বিনিয়োগ কমে যাওয়ায় বর্ধিত হারে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে না। ফলে বছর শেষে জাতীয় প্রবৃদ্ধি অর্জন চ্যালেঞ্জে পড়ে যাবে। এ কারণে নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টি করে তাদের মধ্যে বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য চেষ্টা করতে হবে। অন্যথায় জাতীয় প্রবৃদ্ধি অর্জনই শুধু বাধাগ্রস্ত হবে না, ব্যাংকের মুনাফা কমে গিয়ে দুর্বল হয়ে পড়বে ব্যাংক খাত।

পূবালী ব্যাংকের সদ্য অবসরপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুল হালিম চৌধুরী শেয়ার বিজকে বলেন, বাংলাদেশে উৎপাদিত বেশিরভাগ পণ্য ইউরোপ ও আমেরিকায় রপ্তানি হয়। কিন্তু এসব দেশে এখনও কভিডের প্রভাব চলছে। তারা কোনো পণ্যের অর্ডার দিচ্ছে না। পুরোনো ক্রয়াদেশ বাতিলের উদাহরণও রয়েছে। পণ্যের চাহিদা কমে যাওয়ায় কমেছে দেশের সার্বিক বিনিয়োগ। এ কারণেই এডিআরও নেমে এসেছে নির্ধারিত সীমার নিচে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, শুধু বিনিয়োগ কমে গেছে, তা নয়। সরকারি প্রণোদনার অর্থ আসছে ব্যাংকগুলোতে। তাই সব ব্যাংকেই এখন অতিরিক্ত তারল্য রয়েছে। তাছাড়া বড় গ্রাহকরা এখন অফশোর ব্যাংকিংয়ের ফান্ড ব্যবহার করছে। দেশে যেসব ঋণ বিতরণ হচ্ছে, তার বেশিরভাগই ক্ষুদ্রঋণ। এরূপ পরিস্থিতিতে সার্বিক বিনিয়োগ ও এডিআর কমে আসা খুবই স্বাভাবিক।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..