প্রচ্ছদ প্রথম পাতা

ঋণ পুনঃতফসিলে মুহিতের ভাগ্নের ‘মামাবাড়ির আবদার’

মাসুম বিল্লাহ ও শেখ শাফায়াত হোসেন: সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের ভাগ্নে রাফফাত আহমেদের স্ত্রী শিরিন সুলতানার দুটি প্রতিষ্ঠানের নামে রূপালী ব্যাংকে খেলাপি ঋণ রয়েছে ১৭ কোটি ২৯ লাখ টাকা। সুদ মওকুফ না করা হলে ঋণের পরিমাণ দাঁড়াত ২৮ কোটি টাকার বেশি। এক বছরের বেশি সময় ধরে ওই ঋণের সুদ আরোপ বন্ধ রয়েছে। ঋণগুলো স্ত্রীর নামে থাকলেও সেগুলো পুনঃতফসিল করতে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকসহ বাংলাদেশ ব্যাংকে দৌড়ঝাঁপ করছেন রাফফাত নিজেই। গ্রাহকের আবদার দুবছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ ২৫ বছরে পরিশোধের সুযোগ দিয়ে তাদের ঋণগুলোকে পুনঃতফসিল করতে হবে। এক্ষেত্রে দুই শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দেওয়ার যে পদ্ধতি রয়েছে, তাও মানতে নারাজ ঋণগ্রহীতা।
সরেজমিনে জানা যায়, মুহিতের ওই ভাগ্নের স্ত্রীর একটি প্রতিষ্ঠান পুরোপুরি বন্ধ, আরেকটি আংশিক চালু আছে। ঋণ পরিশোধ করতে না পারায় গ্রাহকের অনুরোধে সাড়ে ১১ কোটি টাকা মুলতবি ও অনারোপিত সুদ মওকুফ করেছে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।
গত বছরের সেপ্টেম্বরে প্রতিষ্ঠান দুটিকে ১৭ কোটি ২৯ লাখ টাকা ঋণ দুই শতাংশ ডাউন পেমেন্ট (এককালীন নগদ জমা) নিয়ে দুবছর গ্রেস পিরিয়ডসহ ২৫ বছর পর্যন্ত কিস্তিতে পরিশোধের সুযোগ দিতে রাজি হয় রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকটি। অবশ্য বাংলাদেশ ব্যাংক সর্বোচ্চ আট বছরের জন্য পুনঃতফসিলের অনুমোদন দেয়। কিন্তু গ্রাহক দুই শতাংশ ডাউন পেমেন্ট ছাড়াই ওই ঋণটি পুনঃতফসিল করতে চায়। তাও আবার ২৫ বছরের জন্য।
জানা গেছে, রাফফাত একটি বেসরকারি ব্যাংকে চাকরিরত। রূপালী ব্যাংক সূত্র জানায়, রাফফাতের স্ত্রী শিরিন সুলতানা মেসার্স মারমেইড অ্যাগ্রো ফার্ম লিমিটেড ও সেইফ অব দ্য সিটি লিমিটেডের পরিচালক পরিচয়ে রূপালী ব্যাংকের ঢাকাস্থ স্থানীয় কার্যালয় থেকে ঋণ নেওয়া শুরু করেন। এক সময় ঋণের অঙ্ক দাঁড়ায় প্রায় ২০ কোটি টাকা। সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীর পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও এ দুটি প্রতিষ্ঠানের বিপরীতে বড় অঙ্কের ঋণ দেয় ব্যাংকটি। তেমন কোনো জামানতও নেওয়া হয়নি ওই ঋণের বিপরীতে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, তৎকালীন অর্থমন্ত্রীর আত্মীয় হওয়ায় পর্যাপ্ত জামানত ছাড়াই বড় অঙ্কের ঋণ বিতরণের বিষয়ে কোনো প্রশ্ন তোলেনি ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ। এমনকি বিগত বছরগুলোয় ওই ঋণ আদায়েও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
বরং প্রতিষ্ঠান দুটির ঋণ পরিশোধের সুবিধার্থে বিশেষ সুবিধা দিতে সব সময় উদার হস্ত ছিল ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। এরই মধ্যে প্রতিষ্ঠানটির নেওয়া ঋণের মুলতবি ও অনারোপিত সুদ সবই মওকুফ করেছে ব্যাংক। এরপরও সাবেক অর্থমন্ত্রীর ওই আত্মীয় এখনও কোনোভাবেই দুই শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিতে রাজি হচ্ছেন না। উল্টো বিনা ডাউন পেমেন্টে ঋণটি পুনঃতফসিলের অনুমোদন নিতে শিরিন সুলতানার স্বামী রাফফাত বাংলাদেশ ব্যাংকে যোগাযোগ করছেন। এক্ষেত্রে তিনি তার মামার পরিচয়কে কাজে লাগাতেও চেষ্টা করছেন বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে।
জানতে চাইলে রাফফাত আহমেদ শেয়ার বিজকে বলেন, ‘আমরা বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে আবেদন করেছি। বাংলাদেশ ব্যাংক অনুমোদন দিলে টাকা-পয়সা যা পারি, জোগাড় করে ঋণটি পুনঃতফসিল করব।’
রূপালী ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে মারমেইড অ্যাগ্রো ফার্ম লিমিটেডের নামে ঋণের অঙ্ক প্রায় ৯ কোটি ৮০ লাখ টাকা। ওই প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ছয় কোটি টাকার মুলতবি ও অনারোপিত সুদ মওকুফ করা হয়েছে। গত বছরের ১৯ সেপ্টেম্বর রূপালী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের ১০৫৯তম সভায় ওই ঋণটি দুবছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ ২৫ বছরে সমান ত্রৈমাসিক কিস্তিতে সুদবিহীনভাবে পরিশোধের জন্য পুনঃতফসিল সুবিধা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। এ বিষয়ে অনুমোদন নিতে গেলে বাংলাদেশ ব্যাংক বিশেষ বিবেচনায় অন্যূন দুই শতাংশ ডাউন পেমেন্ট নগদে আদায়সাপেক্ষে এক বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ সর্বোচ্চ আট বছরের জন্য পুনঃতফসিলের অনুমোদন দেয়। কিন্তু ওই গ্রাহক দুই শতাংশ ডাউন পেমেন্ট কোনোভাবেই জোগাড় করা সম্ভব নয় বলে জানিয়ে পর্ষদের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের অনুরোধ জানান। নিরুপায় হয়ে সম্প্রতি রূপালী ব্যাংক আবারও ২৫ বছরে ঋণটি পুনঃতফসিলের অনুমোদন চেয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে আবেদন পাঠিয়েছে।
জানা গেছে, এ প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক পলাতক এবং সেটি বন্ধ। তবে ব্যাংক বলছে, প্রতিষ্ঠানটির কিছু খামার এখনও রয়েছে। কিন্তু ব্যাংকের পাওনার তুলনায় জামানত অপ্রতুল। নিলাম বিজ্ঞপ্তি দিয়েও সম্পত্তি বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে না। আইনি প্রক্রিয়ায় ঋণটি আদায় করা সময়সাপেক্ষ ও জটিল বলে বাংলাদেশ ব্যাংককে জানিয়েছে রূপালী ব্যাংক।
গত বছরের ২৮ আগস্ট থেকে ওই ঋণের বিপরীতে আর কোনো সুদ আরোপ করছে না রূপালী ব্যাংক। ওই সময় শিরিন সুলতানার দায়-দেনা রাফফাত আহমেদের ভাই রোমেল আহমেদের নামে স্থানান্তর করার একটি অনুরোধ গ্রাহক কর্তৃক উপস্থাপন করা হলে ব্যাংক তাতে রাজি হয়নি।
একইভাবে শিরিন সুলতানাকে চেয়ারম্যান দেখিয়ে একই ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণের মধ্যে এখনও সাত কোটি ৪৯ লাখ টাকা ঋণ রয়েছে মেসার্স সেইফ অব দ্য সিটি লিমিটেডের নামে। ওই ঋণের বিপরীতে গত বছরের ২৮ আগস্ট থেকে সুদ আরোপ বন্ধ রয়েছে। ওই বছরের ১৯ সেপ্টেম্বরের পর্ষদ সভার নির্দেশে প্রায় পাঁচ কোটি টাকার মুলতবি ও অনারোপিত সুদ এরই মধ্যে মওকুফ করা হয়েছে।
এক্ষেত্রেও ঋণটি দুই শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিয়ে পুনঃতফসিলে রাজি নয় খেলাপি ওই গ্রাহক। রূপালী ব্যাংক ওই গ্রাহককে দুবছর গ্রেস পিরিয়ডসহ ২৫ বছরের জন্য পুনঃতফসিলে রাজি হলেও বাংলাদেশ ব্যাংক দুই শতাংশ ডাউন পেমেন্টসাপেক্ষে এক বছর গ্রেস পিরিয়ডসহ আট বছরের জন্য পুনঃতফসিলের অনুমোদন দেয়। এক্ষেত্রেও গ্রাহক কোনোভাবেই দুই শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দেওয়া সম্ভব নয় বলে ব্যাংককে জানিয়েছেন।
সেইফ অব দ্য সিটি লিমিটেডের কার্যালয় ছিল উত্তরায়। সরেজমিনে জানা যায়, প্রতিষ্ঠানটি একটি ভাড়া করা ভবনে অবস্থিত ছিল। বর্তমানে ওই ফ্লোর অন্য প্রতিষ্ঠানকে ভাড়া দিয়েছেন ভবন মালিক। এলাকার কেউ সেইফ অব দ্য সিটির কোনো তথ্য জানেন না। ওয়েবসাইটও বন্ধ রয়েছে। মারমেইড অ্যাগ্রো ফার্মেরও একই অবস্থা। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক পলাতক রয়েছেন।
প্রতিষ্ঠান দুটির কোনো অফিস না থাকায় এর উদ্যোক্তাদের মন্তব্য পাওয়া যায়নি। জানা গেছে, উদ্যোক্তারা ব্যাংকের সঙ্গে যথাযথভাবে যোগাযোগও রক্ষা করছেন না। ব্যাংক নিরুপায় হয়ে তাদের অনেক সুযোগ-সুবিধা দিয়ে ঋণ আদায়ের চেষ্টা করছে। এতদিন আবুল মাল আবদুল মুহিত অর্থমন্ত্রী থাকায় এ বিষয়ে তেমন একটা তোড়জোড় করেনি রূপালী ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। বর্তমানে মুহিত অর্থমন্ত্রীর পদ থেকে অব্যাহতি পাওয়ায় ঋণটি আদায়ে সোচ্চার হয়েছে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।
রূপালী ব্যাংকের ঢাকাস্থ স্থানীয় শাখার মহাব্যবস্থাপক খান ইকবাল হোসেন শেয়ার বিজকে বলেন, ‘আমরা ঋণ পুনঃতফসিলের জন্য গ্রাহকের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছি। গ্রাহক এখনও পর্যন্ত দুই শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিতে রাজি হননি।’
শাখার অন্যান্য কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মুহিতের আত্মীয় হওয়ায় গ্রাহক সব সময় বাড়তি সুবিধা পেয়েছেন। তবে ব্যাংকটির সাবেক এক ব্যবস্থাপনা পরিচালক শেয়ার বিজকে বলেন, ‘আমি দায়িত্বে থাকাকালে ওই দুটি প্রতিষ্ঠানের কোনো উদ্যোক্তা আমার কাছে আসেননি। তাছাড়া তৎকালীন অর্থমন্ত্রীও ঋণ প্রদানের জন্য কোনো ধরনের সুপারিশ করেননি।’

সর্বশেষ..