দিনের খবর প্রচ্ছদ শেষ পাতা

ঋণ বিতরণে অসম প্রতিযোগিতায় রাষ্ট্রায়ত্ত তিন ব্যাংকের এমডি

শেখ আবু তালেব: ব্যাংক খাতের সবচেয়ে বড় ও আলোচিত ঋণ কেলেঙ্কারি হচ্ছে বিসমিল্লাহ, হলমার্ক, অ্যানন টেক্স ও সর্বশেষ ক্রিসেন্ট ট্যানারিতে। এসব ঘটনা ঘটছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতেই। ব্যাংক খাতের মোট খেলাপির ৫১ শতাংশই রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত ছয় ব্যাংকের। রয়েছে মূলধন ঘাটতি। আদায় পরিস্থিতিও সন্তোষজনক নয়। এর পরও ব্যাংকগুলোর আমানত সংগ্রহের চেয়ে বেশি মনোযোগ ঋণ বিতরণে। এ নিয়ে অসম প্রতিযোগিতায় নেমেছেন সোনালী, জনতা ও অগ্রণী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকরা।

ব্যাংকগুলোর আর্থিক প্রতিবেদন ও বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে পাওয়া গেছে এমন তথ্য। সংগৃহীত আমানতের একটি অংশ ঋণ হিসেবে বিতরণ করতে পারে ব্যাংকগুলো। এজন্য ব্যাংকগুলো ঋণ বিতরণ বাড়াতে আমানত সংগ্রহে বেশি তৎপরতা দেখায়।

কিন্তু সোনালী, জনতা ও অগ্রণী ব্যাংকের বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালকরা আমানত সংগ্রহের চেয়ে ঋণ বিতরণে বেশি উৎসাহী। কে কার চেয়ে বেশি ঋণ বিতরণ করতে পারেন, সেই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে তাদের মধ্যে।

তথ্য অনুযায়ী, গত জুন শেষে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংকের মূলধন ঘাটতির পরিমাণ হচ্ছে ১৫৯ কোটি ২৩ লাখ টাকা। এই সময়ে বিতরণকৃত ঋণের পরিমাণ ছিল ৪৭ হাজার ৬৭৬ কোটি ৪১ লাখ টাকা। খেলাপির পরিমাণ দাঁড়ায় ১০ হাজার ৮৬ কোটি ৪১ লাখ টাকা। খেলাপির হার ২১ দশমিক ১৬ শতাংশ।

খেলাপি ঋণের ৯ হাজার ৮৮ কোটি টাকাই আদায় অযোগ্য হবে। প্রয়োজনীয় শর্ত পরিপালন না করে ব্যাংকটি ঋণ দেওয়ায় এ বিশাল পরিমাণ অর্থ আদায় হওয়ার সম্ভাবনা নেই বলেই ধরে নিয়েছেন ব্যাংকাররা। এর বিপরীতে জামানত রাখা সম্পত্তি বিক্রি করে ঋণের অর্ধেকও আদায় হবে না। কারণ হিসেবে ব্যাংকাররা জানিয়েছেন, অনেক ঋণের বিপরীতেই প্রয়োজনীয় জামানত নেই। আবার সম্পত্তি অতিমূল্যায়িত করে ঋণ নেওয়া হয়েছে।

মূলধন সংকট থাকায় খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রয়োজনীয় পরিমাণ নিরাপত্তা সঞ্চিতি (প্রভিশন) রাখতে পারেনি সোনালী ব্যাংক। জুন শেষে ব্যাংকটির প্রভিশন ঘাটতির পরিমাণ ছিল ৮৯২ কোটি ৬৫ লাখ টাকা।

তারপরও ঋণ বিতরণ বাড়িয়ে চলেছে ব্যাংকটি। তথ্য অনুযায়ী, গত জুন শেষে ব্যাংকটির আমানতের পরিমাণ দাঁড়ায় এক লাখ ১৭ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা। এই সময়ে ব্যাংকটির ঋণ বিতরণের স্থিতি ছিল ৫৩ হাজার ৬৯৭ কোটি টাকা। ঋণ বিতরণের প্রবৃদ্ধি ১৩ শতাংশ। অথচ আমানত সংগ্রহের প্রবৃদ্ধি হয় ছয় দশমিক ৫৯ শতাংশ।

অপরদিকে ব্যাংকটির ঋণ আদায় কার্যক্রম সন্তোষজনক না হওয়ায় চলতি অর্থবছরে গত অর্থবছরের তুলনায় লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়।

এ বিষয়ে সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আতাউর রহমান প্রধান শেয়ার বিজকে বলেন, ‘সোনালী ব্যাংকের আমানত অনুযায়ী আরও ঋণ বিতরণ করাটাই যৌক্তিক। ১৯৮৯ সাল থেকেই সোনালী ব্যাংকের খেলাপির হার আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের চেয়ে বেশি। গত তিন বছর ধরে খেলাপির হার কমে আসছে। হলমার্কসহ কিছু ঋণ কেলেঙ্কারিতে খেলাপির পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে। আশা করছি সামনের দিনগুলোয় কমে আসবে। কিন্তু করোনা মহামারি শেষ হলে বাস্তবতা বোঝা যাবে।’

এদিকে গত জুন শেষে ব্যাংকটির আমানতের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৬৮ হাজার ৯৩৬ কোটি টাকা। ঋণের স্থিতি ৫২ হাজার ৩১৪ কোটি টাকা। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে আমানতের সংগ্রহের তুলনায় জনতা ব্যাংক সর্বোচ্চ পরিমাণ ঋণ বিতরণ করেছে। ঋণ প্রবৃদ্ধি সাত দশমিক ৭১ শতাংশ, যেখানে আমানত প্রবৃদ্ধি হয় চার দশমিক ৫১ শতাংশ।

এই সময়ে খেলাপির পরিমাণ দাঁড়ায় ১৪ হাজার ছয় কোটি টাকা। খেলাপির হার ২৬ দশমিক ৭৬ শতাংশ। অর্থাৎ বিতরণকৃত ১০০ টাকা ঋণের মধ্যে প্রায় ২৭ টাকাই খেলাপি হয়ে পড়ছে। খেলাপি হওয়া ঋণের মধ্যে ১৩ হাজার ২২৯ কোটি টাকাই আদায় অযোগ্য হয়ে পড়ছে। ব্যাংকটির মূলধন ঘাটতি রয়েছে তিন হাজার ৫৭০ কোটি টাকা, যা রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের মধ্যে সর্বোচ্চ।

আর গত জুন শেষে ব্যাংকটির আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭৪ হাজার ১৮৯ কোটি টাকা। এই সময়ে ঋণের পরিমাণ ছিল ৪৬ হাজার ৮২৯ কোটি টাকা। ব্যাংকটির খেলাপির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ছয় হাজার ৩৪৯ কোটি টাকা। খেলাপির হার ১৪ দশমিক ৯২ শতাংশ। মোট খেলাপির মধ্যে পাঁচ হাজার ৪৮১ কোটি টাকাই আদায় অযোগ্য।

উচ্চ হারের খেলাপির কারণে ব্যাংকটি প্রয়োজনীয় প্রভিশনও সংরক্ষণ করতে পারেনি। জুন শেষে প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়ায় ৮৮৫ কোটি ৭১ লাখ টাকা। আমানতের প্রবৃদ্ধি হয় সাত দশমিক ৩৩ শতাংশ। অথচ এই সময়ে ঋণ প্রবৃদ্ধি হয় ১০ দশমিক শূন্য ছয় শতাংশ।

এ বিষয়ে জনতা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শামস্ উল ইসলাম বলেন, ‘অগ্রণী ব্যাংক আমদানি-রপ্তানি ও রেমিট্যান্সে ভালো করছে। সরকারি একটি ফান্ড চলে যাওয়ায় আমানত প্রবৃদ্ধি কিছুটা শ্লথ হয়েছে, সামনের দিনগুলোয় বৃদ্ধি পাবে। কিছু ঋণের বিষয়ে কমিটমেন্ট করা ছিল, তা বিতরণ করতে হয়েছে। আমানত আসলে এডি রেশিও আরও কমে আসবে।’

জানা গেছে, বর্তমানে প্রচলিত সুদভিত্তিক ব্যাংকগুলোর ঋণ-আমানত অনুপাত (এডি রেশিও) হচ্ছে ৮৭। অর্থাৎ কোনো ব্যাংক ১০০ টাকা আমানত সংগ্রহ করতে পারলে তার মধ্যে সর্বোচ্চ ৮৭ টাকা ঋণ হিসেবে বিতরণ করতে পারবে।

ব্যাংকিংয়ের আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, কোনো ব্যাংকের খেলাপির হার সর্বোচ্চ পাঁচ শতাংশ হবে। কিন্তু রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে খেলাপির হার ১৫ থেকে সর্বোচ্চ সাড়ে ৫১ শতাংশ দাঁড়িয়েছে। উচ্চহারের খেলাপির কারণে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোয় পর্যবেক্ষক পর্যন্ত বসিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তারপরও ব্যাংকগুলোয় দিনের পর দিন খেলাপির হার বৃদ্ধি পাচ্ছে।

সবচেয়ে উদ্বেগ হয়ে দেখা গেছে উচ্চ হারের খেলাপি ঋণের মধ্যে আদায় অযোগ্যর পরিমাণই সিংহভাগ হওয়াকে। খেলাপি ও আদায় অযোগ্য ঋণের পরিমাণ প্রায় সমান হয়ে আসছে।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..