দিনের খবর শেষ পাতা

ঋণ শোধ করেও অনাপত্তি পাচ্ছেন না পিপলস লিজিংয়ের গ্রাহক

জয়নাল আবেদিন: দীর্ঘ দুই বছর ধরে টাকার জন্য হন্যে হয়ে ঘুরছেন পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেডের আমানতকারীরা। অন্যদিকে ঋণগ্রহীতাদের ঋণের টাকা পরিশোধের পর অনাপত্তিপত্র (এনওসি) দিতে গড়িমসি করছেন পিপলস লিজিংয়ে কিছু অসাধু কর্মকর্তা।

গ্রাহক ঋণের টাকা পরিশোধ করলেও ব্যাংকের হিসাব-নিকাশ রক্ষণাবেক্ষণকারী সফটওয়্যার আলটিমাসে এন্ট্রি দিচ্ছে না। এতে বিপাকে পড়েছেন অনেক গ্রাহক। পিপলস লিজিং এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনাপত্তির জন্য বহুদিন ঘোরার পরও কোনো কাজ হয়নি। ফলে ব্যবসায়িক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে ডিসেন্ট হোল্ডিংসহ বহু প্রতিষ্ঠান। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের ব্যাংক কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ না করার কারণও অজানা।

২০১৯ সালের ২৬ জুন পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানি পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেসকে অবসায়ন করা হয়। পরবর্তী মাসের ১৪ তারিখ আদালতের আদেশে প্রতিষ্ঠানটিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের উপমহাব্যবস্থাপক আসাদুজ্জামান খানকে অবসায়ক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। এরপর থেকে প্রতিষ্ঠানের সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত পিপলস লিজিংয়ের হিসাবে প্রায় ৩৪ কোটি টাকা জমা করেছেন গ্রাহক। কিন্তু আদালতের নির্দেশনা না পাওয়ায় এখনও পর্যন্ত টাকাগুলো আমানতকারীদের ফিরিয়ে দিতে পারছেন না তারা। অন্যদিকে আদালতের নির্দেশনা ছাড়া ঋণ পরিশোধকৃত গ্রাহকদের অনাপত্তিপত্র দিতে পারবেন না বলে জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সূত্র জানায়, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আগ্রহের অভাবেই এতদিন পর্যন্ত কাজগুলো পড়ে আছে।

বিশেষ সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী আনিসুজ্জামান চৌধুরী, নুরুল ইসলাম চৌধুরী, কালার লিংক, আব্দুস সামাদ, ফিনিক্স হ্যাচারি এবং ডিসেন্ট হোল্ডিংসহ বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যেই পিপলস লিজিংকে টাকা পরিশোধ করেছে। কিন্তু বছর শেষে অর্থ পরিশোধের তথ্য (ই-এরেন্ট) শূন্য না দেখার কারণে অনাপত্তি পত্র পাচ্ছে না গ্রাহক।

এ প্রতিষ্ঠানের ভুক্তভোগী ডিসেন্ট হোল্ডিংয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা জানায়, ২০২০ সালের ডিসেম্বর মাসে আমরা টাকা পরিশোধ করেছি। কিন্তু পিপলস লিজিং অনাপত্তি দিলেও বাংলাদেশ ব্যাংকের অনাপত্তি পাচ্ছি না। এর ফলে ঋণের বিপরীতে রাখা জামানতের জমি (মর্টগেজ) অন্য কোনো কাজে লাগাতে পারছি না। ব্যবসায়িক প্রয়োজনে অন্য ব্যাংকে ঋণের আবেদন করে রাখলেও তা মঞ্জুর হচ্ছে না কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনাপত্তির কারণে।

এছাড়া পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেডের সহযোগী প্রতিষ্ঠান পিএলএফএসএল ইনভেস্টমেন্টের বিনিয়োগকারী এসএন মনজুর মোর্শেদ বলেন, ‘আমি পুঁজিবাজারে ব্যবসা করার জন্য এখানে বিও হিসাব খুলেছি। বিওতে বিভিন্ন সময়ে মোট ৬৪ লাখ টাকা জমা দিয়েছি। কয়েক বারে ১৫ লাখ টাকার মতো তুলেছি। তারা নিজেদের মতো করে বাই-সেল করে আমার হিসাবের মূল টাকা তো নষ্ট করছেই। উল্টো এখন আরও ২ কোটি ৬৬ লাখ টাকা আমার কাছে দাবি করছে। এখন আমি বিপদে আছি।’

১৯৯৭ সালের ২৪ নভেম্বর পিপলস লিজিং আর্থিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে অনুমোদন পাওয়ার পর ২০০৫ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়। ২০১৪ সাল থেকে প্রতিষ্ঠানটি লোকসানে ছিল। ২০১৯ সালে ২১ মে বাংলাদেশ ব্যাংক অর্থ মন্ত্রণালয়ে পিপলসের অবসায়নের আবেদন করে। গত ২৬ জুন অর্থ মন্ত্রণালয় সে আবেদন অনুমোদন করলে ১০ জুলাই পিপলসের অবসানের বিষয়টি অনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দেয়া হয়।

একই বছরের ১১ জুলাই বাংলাদেশ ব্যাংক পিপলস লিজিং থেকে টাকা তোলার বিষয়ে বিধিনিষেধ আরোপ করে। ১৪ জুলাই বাংলাদেশ ব্যাংকের ডিজিএম মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান খানকে প্রতিষ্ঠানটির অবসায়ক নিয়োগ দেয়া হয়।

প্রতিষ্ঠানটিতে ছয় হাজার ব্যক্তি শ্রেণির আমানতকারী এবং বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক আমানতকারীর ১ হাজার ৯৯৬ কোটি টাকা আটকে পড়েছে। এই টাকার পুরোটাই পিপলস ঋণ হিসেবে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছে পাওনা রয়েছে। এর একটি বড় অংশ প্রতিষ্ঠানটির পরিচালকরা নামে-বেনামে ঋণ নিয়ে আত্মসাৎ করেছেন। আর এর পেছনে ছিলেন এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রশান্ত কুমার হালদার ওরফে পিকে হালদার।

পিকে হালদার নানা কৌশলে নামে-বেনামে অসংখ্য কোম্পানি খুলে শেয়ারবাজার থেকে বিপুল পরিমাণ শেয়ার কেনেন এবং ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে ও পরে নিজের আত্মীয়, বন্ধু ও সাবেক সহকর্মীসহ বিভিন্ন ব্যক্তিকে পর্ষদে বসিয়ে চারটি ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ নেন। এর একটি হলো পিপলস লিজিং।

প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা পাচার করার অভিযোগ নিয়ে বিদেশে পালিয়ে থাকা পিকে হালদারকে গ্রেপ্তারে ইতোমধ্যে ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড নোটিশ জারি করা হয়েছে। তার মা লীলাবতী হালদার এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর এস কে সুর চৌধুরীসহ ২৫ জনের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন হাইকোর্ট।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের উপমহাব্যবস্থাপক ও পিপলস লিজিংয়ের অবসায়ক আসাদুজ্জামান খান শেয়ার বিজকে জানান, ‘ইতোমধ্যে বেশ কিছু গ্রাহকের আবেদন জমা পড়েছে। আমরা কাগজগুলো যাচাই-বাছাই করে অনাপত্তির জন্য হাইকোর্টে পাঠাব। আদালতের অনুমতি ছাড়া আমরা অনাপত্তি দিতে পারব না। তবে যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া কতদিনে শেষ হবে, সে বিষয়ে কিছু জানাতে পারেননি তিনি।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..