নুরুন্নাহার চৌধুরী কলি : বিশ্বজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দ্রুত অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও গণমাধ্যমসহ নানা খাতে প্রভাব বিস্তার করলেও বাংলাদেশ এখনো এই প্রযুক্তি গ্রহণে পিছিয়ে রয়েছে। সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও নীতিগত দুর্বলতা, দক্ষ মানবসম্পদের ঘাটতি ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে এআই ব্যবহারে কাক্সিক্ষত অগ্রগতি হচ্ছে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সূচক ও বিনিয়োগ চিত্রে দেখা যাচ্ছে, দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত এআই উন্নয়নে শক্ত অবস্থান তৈরি করলেও বাংলাদেশ এখনো প্রাথমিক পর্যায়েই আটকে আছে।
গ্লোবাল এআই ইনডেক্স ২০২৫ অনুযায়ী, ৮৩টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৭৫তম, যেখানে ভারত রয়েছে শীর্ষ ১০ দেশের তালিকায়। সিঙ্গাপুর শীর্ষ ৫ এবং চীন দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। এআই গবেষণা, অবকাঠামো, সরকারি নীতি ও বেসরকারি বিনিয়োগÑ সব ক্ষেত্রেই বাংলাদেশ পিছিয়ে।
বাংলাদেশ সরকার ২০২০ সালে ‘জাতীয় এআই কৌশল’ ঘোষণা করলেও এর বাস্তবায়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। এখনো দেশে শক্তিশালী হাই-পারফরম্যান্স কম্পিউটিং সেন্টার, কেন্দ্রীয় ডেটা অবকাঠামো বা এআই স্যান্ডবক্স গড়ে ওঠেনি। বাজেটে এআই খাতে বরাদ্দ অত্যন্ত সীমিত এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব (পিপিপি) কার্যকর নয়।
অন্যদিকে, ভারত ২০২৪ সালে এআই খাতে প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলার স্টার্টআপ বিনিয়োগ আকর্ষণ করেছে। দেশটি ১.৩ বিলিয়ন ডলারের ‘ন্যাশনাল এআই মিশন’ চালু করে কৃষি, স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় এআই ব্যবহার বাড়িয়েছে। বেঙ্গালুরুসহ বিভিন্ন শহরে এআই হাব গড়ে উঠেছে এবং লাখো জনবল এআই প্রশিক্ষণ পাচ্ছে।
বাংলাদেশে কিছু স্টার্টআপ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে এআই নিয়ে কাজ হলেও সেগুলোর পরিসর সীমিত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে ডিজিটালাইজেশনের কথা বলা হলেও বাস্তবে এআই ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় ডেটা অবকাঠামো, গবেষণা সক্ষমতা ও দক্ষ জনবল তৈরি হয়নি। সরকারি ও বেসরকারি খাতে এখনো এআইকে মূলধারার প্রযুক্তি হিসেবে গ্রহণের মানসিকতা গড়ে ওঠেনি।
এ বিষয়ে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগের সচিব শীষ হায়দার চৌধুরী শেয়ার বিজকে বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) পলিসি করার জন্য কাজ করছি। পাশাপাশি আরও বেশ কয়েকটি পলিসি নিয়ে কাজ করছি। এই পলিসিগুলো আমরা জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেই শেষ করব। এআই ব্যবহারে সচেতনতা এবং তথ্যের অখণ্ডতা নিশ্চিত করার জন্য আমরা ইতোমধ্যে অনেক প্রশিক্ষণ কর্মশালার আয়োজন করেছি।
ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নিয়ে কোনো বিভাগ আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি জানান, না এ রকম কোনো বিভাগ নেই। তবে অফিসের কাজে আমরা এআইয়ের সাহায্য নিয়ে থাকি।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব আইসিটি ইন ডেভেলপমেন্ট-এর একজন প্রযুক্তি বিশ্লেষক নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শেয়ার বিজকে বলেন, ‘এআই শুধু সফটওয়্যার নয়, এটি ডেটা, নীতি ও দক্ষতার সমন্বয়। আমাদের দেশে ডেটা ব্যবস্থাপনা দুর্বল, আর এআই নীতিমালাও এখনো কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়নি।’ বর্তমানে বিশ্বের অনেক দেশ প্রশাসন পরিচালনা, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, স্বাস্থ্যসেবায় রোগ নির্ণয় এবং সাংবাদিকতায় ডেটা বিশ্লেষণে এআই ব্যবহার করছে। অথচ বাংলাদেশে এআই ব্যবহার এখনো পরীক্ষামূলক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ। কয়েকটি স্টার্টআপ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা থাকলেও তা জাতীয় পর্যায়ে প্রয়োগের উদ্যোগ নেই বললেই চলে। তিনি আরও বলেন, শিক্ষা খাতেও এআই সংশ্লিষ্ট পাঠ্যক্রম সীমিত। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে কিছু কোর্স থাকলেও প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে এআই বা ডেটা চিন্তা-ভাবনার কোনো কাঠামোগত শিক্ষা নেই। ফলে ভবিষ্যৎ কর্মশক্তি তৈরিতে বড় ধরনের ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে।
এদিকে এআই নিয়ে ভয়ের বিষয়টিও বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, এআই এলে চাকরি হারাবে মানুষ। ফলে নীতি নির্ধারক পর্যায়েও এক ধরনের দ্বিধা কাজ করছে। তবে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সঠিক পরিকল্পনা থাকলে এআই কর্মসংস্থান ধ্বংস নয়, বরং নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে।
এর আগে, ২০২০ সালে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ ‘জাতীয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কৌশল’ প্রণয়ন করে। যেটিতে অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি এবং প্রশাসনসহ বিভিন্ন খাতে এআই ব্যবহারের রূপরেখা তৈরি করা হয়। কিন্তু বাস্তবায়ন হয়নি সেটি।
একই সাথে ২০২৪ সালে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার সরকার এআই এর একটি খসড়া নীতিমালা তৈরি করেছিল। যদিও খসড়া ‘ন্যাশনাল এআই পলিসি’ এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
এই নীতির উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য সম্পর্কে বলা হয়েছে, বাংলাদেশকে এআই উদ্ভাবন ও প্রযুক্তি গ্রহণে অগ্রগামী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে এবং ডিজিটাল বাংলাদেশ থেকে স্মার্ট বাংলাদেশে রূপান্তরে সহায়তা করতে তা করা হচ্ছে।
এই খসড়া নীতিমালায় যেসব খাতকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে, সেগুলো হলো সরকারি সেবা ও বিচারিক ব্যবস্থা, টেলিযোগাযোগ, ডেটা গভর্ন্যান্স, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, শিক্ষা, কৃষি, গবেষণা ও উদ্ভাবন ইত্যাদি খাত।
একটি স্বাধীন ন্যাশনাল আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স সেন্টার অব এক্সিলেন্স প্রতিষ্ঠা এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকেও এর অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হয়েছে ওই খসড়া নীতিমালায়। ইউনেস্কোর ১৯৩টি সদস্য রাষ্ট্র ২০২১ সালের নভেম্বরে সর্বসম্মতিক্রমে ‘এথিকস অব আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স (ইউনেস্কো, ২০২২)’ অনুমোদন করে।
এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সর্বোত্তম ব্যবহার এবং ঝুঁকি হ্রাস করাই ইউনেস্কোর এই বৈশ্বিক কাঠামোর লক্ষ্য।
অর্থাৎ বিভিন্ন দেশ যাতে তাদের পলিসি ও প্রস্তুতির সিদ্ধান্ত নিতে পারে, সেজন্যই ইউনেস্কো ‘রেডিনেস অ্যাসেসম্যান্ট মেথোডলজি’ তৈরি করেছে। নৈতিক এআই অনুশীলনের ক্ষেত্রে একটি দেশের প্রস্তুতি নির্ধারণ করা হয় এই র্যামের মাধ্যমে। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে বাংলাদেশ ইউনেস্কোর এই প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত কার্যকর নীতি বাস্তবায়ন, পর্যাপ্ত বাজেট, ডেটা অ্যাক্সেস এবং গবেষণাভিত্তিক ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে না পারলে এআই থেকে সম্ভাব্য বড় অর্থনৈতিক সুফল হারাবে বাংলাদেশ।
প্রিন্ট করুন









Discussion about this post