এইডস কী বাঁচতে হলে জানতে হবে

বিশ্ব এইডস দিবস ২০২১

মো. আরাফাত রহমান: এইডস বা অ্যাকুয়ার্ড ইমিউনো ডেফিসিয়েন্সি সিনড্রোম হচ্ছে এইচআইভি বা হিউম্যান ইমিউনো ডেফিশিয়েন্সি ভাইরাসের কারণে সৃষ্ট একটি রোগলক্ষণসমষ্টি, যা মানুষের দেহে রোগ-প্রতিরোধের ক্ষমতা হ্রাস করে। এর ফলে এইডস রোগী খুব সহজেই যে কোনো সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত তার মৃত্যু ঘটাতে পারে। এইচআইভি সংক্রমণের সঙ্গে সঙ্গেই সর্বদা এইডস হয় না। শুরুতে ক্ষেত্রবিশেষে ইনফ্লুয়েঞ্জা-জাতীয় উপসর্গ দেখা যেতে পারে। এরপর বহুদিন কোনো উপসর্গ দেখা যায় না। এইচআইভি ভাইরাসের আক্রমণ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে দেহের প্রতিরক্ষাতন্ত্র দুর্বল হতে থাকে এবং আক্রান্ত ব্যক্তি সাধারণ সংক্রামক ব্যাধি, উদাহরণস্বরূপ যক্ষ্মায় যেমন আক্রান্ত হতে পারে, তেমনই সুযোগসন্ধানী সংক্রামক ব্যাধি ও টিউমারের শিকার হতে পারে, যেগুলো কেবল সেসব লোকেরই হয়, যাদের দেহের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা কাজ করে না। এইচআইভি সংক্রমণের এই পর্যায়টিকেই এইডস বলা হয়। এই পর্যায়ে প্রায়ই রোগীর ওজন অনিচ্ছাকৃতভাবে ও অত্যধিক পরিমাণে হ্রাস পায়।

যেহেতু একবার সংক্রামক এইচআইভি শরীরে ঢুকলে তাকে পুরোপুরি দূর করা এখন পর্যন্ত সম্ভব হয়নি, তাই এইচআইভি সংক্রমণ হলে এইডস প্রায় অনিবার্য। তবে বিনা চিকিৎসায় এইডস পর্যায়ে পৌঁছাতে যদি লাগে গড়ে ১০ বছর, তবে চিকিৎসার দ্বারা তাকে আরও কিছু বছর পিছিয়ে দেয়া যায়। বিশ্ব এইডস দিবস ১৯৮৮ সাল থেকে প্রতি বছর ১ ডিসেম্বর পালিত হচ্ছে। এইচআইভি সংক্রমণের জন্য এইডস মহামারি ছড়িয়ে পড়ার বিরুদ্ধে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে এবং যারা এই রোগে মারা গেছে, তাদের প্রতি শোক পালন করতে এই দিনটি বেছে নেয়া হয়েছে।

বিশ্ব এইডস দিবস বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা দ্বারা চিহ্নিত বিশ্ব জনস্বাস্থ্য সচেতনতার উদ্দেশে ঘোষিত আটটি বিশেষ দিনের মধ্যে একটি। ২০১৭ সালের হিসাব অনুযায়ী, এইডসের জন্য বিশ্বজুড়ে ২৮ দশমিক ৯ মিলিয়ন থেকে ৪১ দশমিক পাঁচ মিলিয়ন মানুষ মারা গেছে এবং আনুমানিক ৩৬ দশমিক সাত মিলিয়ন মানুষ এইচআইভি সংক্রমিত হয়ে বেঁচে আছে। এর ফলে এটি নথিভুক্ত ইতিহাস অনুযায়ী বিশ্বব্যাপী গুরুত্বপূর্ণ অন্যতম জনস্বাস্থ্য বিষয় হিসেবে পরিণত হয়েছে। বিশ্বের অনেক অঞ্চলে সাম্প্রতিক সময়ে উন্নত অ্যান্টিরেট্রোভাইরাল চিকিৎসা পৌঁছানোর ফলে ২০০৫ সালে সর্বোচ্চ সংখ্যায় মৃত্যুর পর এইডস মহামারি থেকে মৃত্যুর হার কমেছে। বেশিরভাগ এইডস-আক্রান্ত রোগীই সাহারা-নিন্ম আফ্রিকা অঞ্চরের।

এইডসকে বর্তমানে একটি মহামারি ব্যাধি হিসেবে গণ্য করা হয়, যা বিশ্বের বিশাল এক আয়তন জুড়ে বিদ্যমান এবং যা সক্রিয়ভাবে ছড়িয়ে পড়ছে। এইচআইভি ভাইরাসটি সম্ভবত ১৯ শতকের শেষভাগে বা ২০ শতকের শুরুর দিকে পশ্চিম-মধ্য আফ্রিকায় উৎপত্তি লাভ করে। ১৯৮১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র সিডিসি সর্বপ্রথম রোগটি শনাক্ত করে এবং তারপর আশির দশকের শুরুর দিকে এই রোগের কারণ হিসেবে এইচআইভি ভাইরাসকে শনাক্ত করা হয়। সিডিসির ২০১৭ সালের জরিপ অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রে এইচআইভি আক্রান্তের ৭০ শতাংশই সমকামী ও উভকামী পুরুষ।

আসলে দেহজাত অধিকাংশ তরল ক্ষরণে এইচআইভি নিষ্কৃত হয়। তবে স্নেহপদার্থের আবরণ থাকায় এইচআইভি অত্যন্ত ভঙ্গুর। তাই এইচআইভি শরীরের বাইরে বেশিক্ষণ বাঁচে না। এ কারণে সরাসরি রক্ত বা যৌন নিঃসরণ শরীরে প্রবেশ না করলে এইচআইভি সংক্রমণের আশঙ্কা খুব কম। শুধু স্পর্শ, একসঙ্গে খাওয়া, এমনকি একই জামাকাপড় পরা বা মশার কামড়ে কখনও এইচআইভি ছড়ায় না। তাই এইচআইভি সংক্রমণ ছোঁয়াচে নয়। ১৯৮১ সালে নিউমোসিস্টিন কারিনি এবং কাপোসিস সার্কোমা নামে দুটি বিরল রোগের সংক্রমণ ভয়াবহভাবে বৃদ্ধি পেলে যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র তথা সিডিসি (সেন্টার ফর ডিজিজ কনট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন) সতর্ক হয়ে ওঠে। অবশেষে ১৯৮৪ সালে ফ্রান্স ও যুক্তরাষ্ট্রের বিজ্ঞানীরা এই মহামারি রোগের ভাইরাস শনাক্ত করেন।

ফরাসি বৈজ্ঞানিকরা এর নাম দেন লিম্ফাডেনোপ্যাথি-অ্যাসোসিয়েটেড ভাইরাস। আর মার্কিনিরা এর নাম দেয় মানব টি-কোষ লসিকাগ্রন্থি-অভিমুখী ভাইরাস। ১৯৮৬ সালে এই ভাইরাসের পুনঃনামকরণ করা হয় এইচআইভি। এইচআইভি ভাইরাস মানুষের শরীরের টি-সহায়ক কোষগুলোকে আক্রমণ করে, যেগুলো শরীরের রোগ প্রতিরোধের জন্যে অতীব প্রয়োজনীয়। এইডস এখন বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে। এইডস রোগে আক্রান্ত হয়ে বিশ্বের তিন-চতুর্থাংশেরই মৃত্যু ঘটেছে আফ্রিকার সাহারা-নি¤œ ও অর্থনৈতিকভাবে অনগ্রসর অঞ্চলে। এইচআইভি ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত বেশিরভাগ রোগীই কোনো লক্ষণ ছাড়া এই রোগ বহন করে। তবে কখনও কখনও এই ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ছয় থেকে সাত সপ্তাহ পর কিছু অনির্দিষ্ট লক্ষণ দেখা দিতে পারে, যেমন জ্বর, গলাব্যথা, মাথাব্যথা, ফুলে ওঠা লসিকা গ্রন্থি প্রভৃতি। এসব লক্ষণ কোনো রকম চিকিৎসা ছাড়াই সেরে যায়, যার কারণে রোগী এ ভাইরাস সম্পর্কে অবগত হয় না। এইচআইভি ভাইরাস কোনোরকম লক্ষণ ছাড়াই সর্বোচ্চ ১০ বছর মানুষের শরীরে নীরবে বাস করতে পারে।

এইডস রোগের কোনো চিকিৎসা এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। গবেষকরা এ পর্যন্ত অনেক ওষুধ আবিষ্কার করেছেন। প্রথম শ্রেণির ওষুধের নাম নিউক্লিওসাইড রিভার্স ট্রান্সক্রিপটেজ ইনহিবিটর, যা এইচআইভি ভাইরাসের সংক্রমণকে বিলম্বিত করে। দ্বিতীয় শ্রেণীর ওষুধের নাম প্রোটিয়েজ ইনহিবিটর, যা এইচআইভি ভাইরাসের পুনরাবৃত্তিতে বাধা সৃষ্টি করে। যেহেতু শুধু যে কোনো একটি শ্রেণির ওষুধ এককভাবে শরীরে কার্যকর হয় না, তাই সমন্বিত ওষুধ দেয়া হয়। এই চর্চাকে বলা হয় হার্ট বা হাইলি অ্যাকটিভ অ্যান্টিরেট্রোভাইরাল থেরাপি, অর্থাৎ অতি সক্রিয় রেট্রোভাইরাস প্রতিরোধী চিকিৎসা। যদিও হার্ট এইডস উপশম করে না, তবে এটি এইডস রোগীর মৃত্যুসংখ্যা কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করে।

এইচআইভি ও এইডস সম্পর্কে অনেক ভুল ধারণা রয়েছে। সবচেয়ে সাধারণ তিনটি ভুল ধারণা হচ্ছে ১. এইডস স্বাভাবিক যোগাযোগের মাধ্যমে ছড়িয়ে যেতে পারে; ২. কোনো কুমারীর সঙ্গে যৌন সম্পর্ক করলে এইডস থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে এবং ৩. এইচআইভি দ্বারা শুধু সমকামী পুরুষ ও মাদকদ্রব্য ব্যবহারকারীরা সংক্রমিত হতে পারে। বাংলাদেশে এইডস রোগীর সংখ্যা এখনও খুব বেশি নয়, মোট জনসংখ্যার শূন্য দশমিক এক শতাংশ। তবে নতুন রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধির হার বাড়ছে। যৌনকর্মী ও ইঞ্জেকশনের মাধ্যমে মাদকসেবীদের মধ্যেই এইচআইভির বিস্তার বেশি ঘটছে। অবশ্য গত পাঁচ বছরে গৃহবধূ ও গর্ভধারিণী নারীদের মধ্যেও এইচআইভির সংক্রমণ বেড়েছে। নারীদের মধ্যে এইচআইভি ছড়িয়ে পড়াকে বৈশ্বিকভাবে মহামারির অশনি সংকেত হিসেবে দেখা হয়।

বাংলাদেশে সর্বপ্রথম এইডস শনাক্ত হয় ১৯৮৯ সালে। ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত চার হাজার মানুষের মধ্যে পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা যায়, বাংলাদেশ এইডস মহামারির দ্বারপ্রান্তে উপনীত। বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র (আইসিডিডিআর,বি) এবং জাতীয় এইডস নিবারণ ও নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি পরিচালিত এই সমীক্ষায় দেখা যায়, বাংলাদেশে প্রতি ১০০ মাদকদ্রব্য গ্রহণকারীর মধ্যে অন্তত দুজন এইচআইভি ভাইরাসের বাহক যা এইডস রোগ ঘটায়। এছাড়া প্রতি ১০০ যৌনকর্মীর মধ্যে অন্তত একজনের এইচআইভি আছে। এইচআইভির বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষা কীভাবে গড়ে তোলা যায়, এ বিষয়ে দিকনির্দেশনা না থাকার কারণেই পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে। এছাড়া অপ্রতুল স্বাস্থ্য সচেতনতা এবং একাধিক মাদকাসক্ত ব্যক্তির একই সুচ ব্যবহারও এর বড় কারণ। আশঙ্কা করা যাচ্ছে, আফ্রিকার দেশগুলোর মতো এদেশেও এইডসের বিস্তৃতি দ্রুত হবে, যদি সময়োচিত ও সঠিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিয়ে এই প্রবণতা রোধ করা না যায়। 

বাংলাদেশের ৬৪ জেলায়ই এইডস-আক্রান্ত মানুষ ছড়িয়ে আছে। তবে পার্বত্য চট্টগ্রামের জেলাগুলোয় এ বিষয়ে নজরদারির সুযোগ সীমিত। লাখ লাখ বাংলাদেশি শ্রমিক মধ্যপ্রাচ্য আর ইউরোপে অভিবাসী হয়েছে। তারা সেখানে প্রধানত কায়িক শ্রম দেয়। অভিবাসী শ্রমিকদের মধ্যে এইচআইভির সংক্রমণ বেশি এবং তা আরও বাড়ছে বলে গবেষণায় দেখা গেছে। এইচআইভি সংক্রমণের উপায়গুলো জেনে এ সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে এইডস প্রতিরোধ করা সম্ভব। এইডস প্রতিরোধে যেসব ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায়, তা হলোÑ১. অন্যের রক্ত গ্রহণ বা অঙ্গ প্রতিস্থাপনের আগে রক্তে এইচআইভি আছে কি না পরীক্ষা করে নেয়া; ২. ইনজেকশন নেয়ার ক্ষেত্রে প্রতিবারই নতুন সুচ/সিরিঞ্জ ব্যবহার করা; ৩. অনিরাপদ যৌন আচরণ থেকে বিরত থাকা; ৪. এইচআইভি/এইডস-আক্রান্ত মায়ের সন্তান গ্রহণ বা সন্তানকে বুকের দুধ দেয়ার ক্ষেত্রে ডাক্তারের পরামর্শ নেয়া; ৫. কোনো যৌন রোগ থাকলে বিলম্ব না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া; ৬. অন্যের ব্যবহার করা ব্লেড ব্যবহার না করা এবং ৭. ধর্মীয় রীতিনীতি মেনে চলা।

সহকারী কর্মকর্তা

ক্যারিয়ার অ্যান্ড প্রফেশনাল ডেভেলপমেন্ট

সার্ভিসেস বিভাগ

সাউথইস্ট বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন   ❑ পড়েছেন  ৯১৪৭  জন  

সর্বশেষ..