মত-বিশ্লেষণ

একজন ম্যানেজারের পক্ষে তার কর্মীদের কতটা উন্নয়ন সম্ভব?

মোশারফ হোসেন: কয়েক দিন আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে আড্ডায় বসেছিলেন পরিচিত কিছু ব্যাংকার। তাদের মধ্যে জনপাঁচেক ব্যাংকার ছিলেন বিভিন্ন ব্যাংকের ব্রাঞ্চ ম্যানেজার। ব্যাংকারদের আড্ডা হবে, কিন্তু ব্যাংকিং নিয়ে আলোচনা হবে না এমনটা ভাবা যায় না। ম্যানেজারদের আলোচনায় তাদের নিজ নিজ ব্রাঞ্চ চালানোর চ্যালেঞ্জের কথাই উঠে এসেছে বেশি। তাদের মধ্যে দু-একজন ম্যানেজারের কয়েকটি অভিজ্ঞতায় ব্যাংকারদের জন্য শিক্ষণীয় বার্তা আছে বলেই আমার কাছে মনে হয়েছে। তাই গুটিকয়েক অভিজ্ঞতার কথা পাঠকদের জ্ঞাতার্থে তুলে ধরছি।

ব্যাংক প্রথমবারের মতো ইন্টারনেট ব্যাংকিং সেবা চালু করার পরপরই ম্যানেজারসহ একে একে শাখার সব কর্মকর্তার অ্যাকাউন্ট ইন্টারনেট ব্যাংকিং সেবায় রেজিস্টার্ড করে দেওয়া হলো। দু’দিন পর ম্যানেজারের রেজিস্ট্রেশন কার্যকর হওয়ার পরপরই প্রথমবার ইন্টারনেট ব্যাংকিং সুবিধা ব্যবহার করে ম্যানেজার নিজের মোবাইলে টপ-আপ করলেন, নিজের স্ত্রীর অ্যাকাউন্টে কিছু টাকা ট্রান্সফার করে ইন্টারনেট ব্যাংকিং সেবা পরখ করলেন। নিজে ব্যাংকার হওয়ার পরও দীর্ঘ ১০ বছর পর প্রথম ইন্টারনেট ব্যাংকিংয়ের অভিজ্ঞতা নিতে  যাচ্ছে ভেবে নিজের মধ্যে কিছুটা উম্মাদনাও কাজ করছিল। কোনো চেক ড্র করতে হয়নি, স্ত্রীর হিসাবে জমা করার জন্য কোনো জমা ভাউচারও লিখতে হলো না, ব্যাংক কর্মকর্তাদের দ্বারা লেনদেনটি সম্পন্ন করার জন্য ইনপুট এবং অথারাইজেশনের কোনো প্রয়োজনীয়তাও ছিল না। শুধু নিজের হাতের স্মার্টফোনটি ব্যবহার করে নিমেষেই নিজের হিসাব থেকে টাকা ট্রান্সফার করে ফেললেন। এ যেন নিজেই ব্যাংকার, নিজেই কাস্টমার! কর্মকর্তাদেরও বলা হলো, তাদের ইন্টারনেট ব্যাংকিং সেবা কার্যকর (অ্যাক্টিভ্যাটেড) হলে লেনদেন করে ইন্টারনেট ব্যাংকিং সেবার সঙ্গে পরিচিত হতে। উদ্দেশ্য হচ্ছে, নিজেরা ব্যাংকিংয়ের এই নতুন ফিচারটি ব্যবহার করতে পারলেই না গ্রাহকদেরও এই সেবার আহ্বান জানাতে পারবেন এবং শেখাতে পারবেন।

প্রায় দু’মাস পর ম্যানেজার একদিন হঠাৎ একে একে তার কর্মকর্তাদের ডেকে পাঠিয়ে তাদের ইন্টারনেট ব্যাংকিং সেবাটি সচল (অ্যাক্টিভেটেড) হয়েছে কি না এবং কর্মকর্তারা তা নিয়মিত ব্যবহার করছেন কি না জানতে চাইলেন। তাদের নিজ নিজ মোবাইলে

টপ-আপ করে দেখাতে বললেন। শাখার সেকেন্ড ম্যান টপ-আপ করতে পারলেন। অন্য কর্মকর্তারা যা করলেন এবং বললেন, তা কেমন ছিল চলুন শুনি:

দ্বিতীয় জন: স্যার, আমার ইন্টারনেট ব্যাংকিং আবেদনে যে জিমেইল অ্যাকাউন্টটি ব্যবহার করা হয়েছিল, আমি তার পাসওয়ার্ড ভুলে গেছি। উল্লেখ্য, ইন্টারনেট ব্যাংকিং সেবা চালু করতে গেলে অ্যাকাউন্ট হোল্ডারের ইমেইল অ্যাকাউন্টে একটি ভেরিফিকেশন লিঙ্ক পাঠানো হয়। ওই ভেরিফিকেশন লিংকে ক্লিক করে কনফার্ম করার পরই এই সেবাটি কার্যকর (অ্যাক্টিভ্যাটেড) হয়।

ম্যানেজার তার কর্মকর্তাকে বললেন, ‘পাসওয়ার্ড রিসেট করা যায়।’ ‘স্যার, পাসওয়ার্ড কীভাবে রিসেট করতে হয় আমার তো তা জানা নেই,’ কর্মকর্তার জবাব। ম্যানেজার নিজেই কর্মকর্তাকে নিয়ে বসে পড়লেন ওই কর্মকর্তার জিমেইল অ্যাকাউন্টের পাসওয়ার্ড রিসেট করতে। একপর্যায়ে জিমেইল ওই কর্মকর্তার জিমেইল অ্যাকাউন্টে ব্যবহার করা মোবাইল নম্বরে একটি ভেরিফিকেশন কোড-সংবলিত ম্যাসেজ পাঠাল। ম্যানেজার তার কর্মকর্তাকে বললেন, তার মোবাইল ফোনের মেসেজটি চেক করে ভেরিফিকেশন কোডটি বলতে। কর্মকর্তা উত্তর দিলেন, তার মোবাইল ফোনে কোনো ভেরিফিকেশন কোড যায়নি। ম্যানেজার তখন জিমেইল অ্যাকাউন্টে প্রদর্শিত মোবাইল নম্বরের প্রথম ও শেষ ডিজিটগুলো বলার পর কর্মকর্তা হঠাৎ বলে উঠলেন, ‘স্যার এই মোবাইল নম্বরটি তো আমার নয়, এটি আমার ছোট বোন ব্যবহার করে!’

তারপর তার ছোট বোনকে ফোন করে তার কাছ থেকে ভেরিফিকেশন কোড নিয়ে ওই কর্মকর্তার জিমেইল অ্যাকাউন্টটি অ্যাক্টিভেটেড করা হলো এবং ইন্টারনেট ব্যাংকিং সেবাটিও চালু করা গেল।

তৃতীয় কর্মকর্তা জবাব দিলেন, ‘স্যার, আমার অ্যাকাউন্টে টাকা নেই, তাই ইন্টারনেট ব্যাংকিং সুবিধা ব্যবহার করে এই মুহূর্তে টপ-আপ করতে পারছি না।’

চতুর্থ কর্মকর্তা জানালেন, তিনি তার স্মার্টফোনটি বাসায় রেখে এসেছেন।

এবার পঞ্চম কর্মকর্তার পালা। তার ইন্টারনেট ব্যাংকিং সেবাটি এখনও কার্যকর হয়নি। কারণ জিজ্ঞেস করলে, তার উত্তরটি ছিল, ‘স্যার, ইন্টারনেট ব্যাংকিংয়ের জন্য আমার ইয়াহু মেইল অ্যাকাউন্টটি অমুক ভাই খুলে দিয়েছিলেন, ইয়াহু মেইলের পাসওয়ার্ডটি আমার জানা নেই, তিনি জানেন।’

ষষ্ঠ কর্মকর্তা জবাব দিলেন, তিনি স্মার্টফোনই ব্যবহার করেন না।

সপ্তম কর্মকর্তা যিনি কয়েক দিন আগে পাশের আরেকটি শাখা থেকে বদলি হয়ে বর্তমান শাখায় জয়েন করেছেন, তার উত্তর হলো, ইন্টারনেট ব্যাংকিং রেজিস্ট্রেশনের জন্য তিনি আবেদনই করেননি। ম্যানেজার প্রত্যেক কর্মকর্তাকে সাত দিনের ডেডলাইন বেঁধে দিলেন এই মর্মে যে, আগামী সাত দিনের মধ্যে প্রত্যেককেই তাদের ইমেইল-সংক্রান্ত ঝামেলা চুকিয়ে ইন্টারনেট ব্যাংকিং সেবার রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া ও অ্যাক্টিভেশন সম্পাদন করতে হবে এবং লেনদেন করে অভ্যস্ত হতে হবে। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো ম্যানেজারের নির্দেশনার ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও তিন কর্মকর্তা এখনও তাদের ইমেইল অ্যাকাউন্টই উদ্ধার করতে পারেননি, কিংবা নতুন ইমেইল খোলারও কোনো তাগিদ অনুভব করেননি। তাই ইন্টারনেট ব্যাংকিং তাদের টানছেই না যেন। তারা ব্যাংকের নির্দেশনা কানে তুললেন না, এমনকি ম্যানেজারের সামনে গিয়ে ‘না’ বলাটাও কাউকে সংকোচে ফেলল না। এই শাখায় গ্রাহকদের জন্য ইন্টারনেট ব্যাংকিংয়ের প্রচারণা এবং বাস্তবায়ন কতটা সম্ভব, তা খুব সহজেই অনুমেয়!

ম্যানেজার তার প্রত্যেক কর্মকর্তাকে রকমারি ডট কম থেকে দুটি করে ব্যাংকিং-বিষয়ক বই কিনে দিলেন। টাকার মায়ায় হলেও যেন পড়েন, তাই বইয়ের টাকা কর্মীদের কাছ থেকেই আদায় করলেন। ছয় মাস পরে একদিন ম্যানেজার তার কর্মীদের লিখিত পরীক্ষা নিলেন। সে পরীক্ষার একটি প্রশ্নে তাদের ব্যাংকিং বিষয়ে যেকোনো দুটি বইয়ের নাম এবং লেখকের নাম লিখতে বলা হলো। উদ্দেশ্য ছিল, তারা পড়াশোনা করে কি না সেটা জানা। দুর্ভাগ্যজনকভাবে ম্যানেজারের দেওয়া দুটি বইয়ের নাম বা লেখকের নামও কেউ লিখতে পারলেন না। বাংলাদেশ ব্যাংক সব ব্যাংকের ব্যাংক ও নীতিনির্ধারক। প্রত্যেক ব্যাংকারকেই বাংলাদেশ ব্যাংক সম্পর্কে জানতে হবে এবং পড়তে হবে তাদের জারি করা নীতিমালা, নির্দেশনা ও সার্কুলার। তাই এই পরীক্ষার এক প্রশ্নে ম্যানেজার তার কর্মকর্তাদের বাংলাদেশ ব্যাংকের ওযয়েবসাইটটিও লিখতে বলেছিলেন। পারলেন না কোনো কর্মকর্তাই!

অনেকে নিজের ব্যাংকের ওয়েবসাইট, এমনকি নিজের শাখার ইমেইলটিও লিখতে পারলেন না! কেউ কেউ জানেন না, তার শাখার মূল ব্যবসায়িক লক্ষ্যমাত্রার (মুনাফা, আমানত, ঋণ) একটিও। এছাড়া ম্যানেজারের অনেক ছোট ছোট জিজ্ঞাসা ও অ্যাসাইনমেন্টের বিপরীতে কর্মকর্তাদের কেউ কেউ অবলীলায় ও নির্দ্বিধায় প্রায়ই ‘জানি না’, ‘পারি না’ বলে নির্ভার হয়ে দায়িত্ব এড়িয়ে যেতে যান! নিজের কিছু অজানা থাকা দোষের কিছু নয়। তবে তা সিনিয়র বা অভিজ্ঞ কারও সহায়তা নিয়ে সমাধানের চেষ্টা না করে ‘পারি না’, ‘জানি না’ বলাটা নিশ্চয় পেশাদার আচরণ নয়, ঊর্ধ্বতন কর্তৃক প্রত্যাশিত কোনো জবাবও নয়।

কয়েক দফা নির্দেশ দেওয়ার পরও বছর পাঁচেক চাকরি করা কর্মকর্তাদেরও কেউ কেউ ‘বিজয়’-এ যেমন বাংলা টাইপ করতে পারেন না, তেমনই ‘অভ্র’তেও বাংলা টাইপ করতে পারেন না। যারা পারেন তাদেরও কেউ আবার একটি ফাইল থেকে টেক্সট কপি করে আরেকটি ফাইলে পেস্ট করতে পারেন না, একটি ডকুমেন্টের ঠিকঠাক পেজ সেটআপ না দিয়ে ভেতরের টেক্সট অ্যালাইনমেন্ট এলোমেলো রেখেই প্রিন্ট দিয়ে নিয়ে আসেন। কেউ আবার ওয়েব অ্যাড্রেস বলতে বললে ইমেইল বলেন। তাই ম্যানেজার কম্পিউটার বিষয়ে কর্মকর্তাদের জ্ঞান ও দক্ষতা বৃদ্ধিতে রকমারি ডট কমে প্রত্যেকের জন্য কম্পিউটারবিষয়ক আরও দুটি করে বই অর্ডার করে দিলেন। পরে বই দুটির দাম বাবদ প্রত্যেক কর্মকর্তার কাছ থেকে ৪৫০ টাকা করে আদায়ের দায়িত্ব দিলেন সেকেন্ড ম্যানকে। সেকেন্ডে ম্যান ম্যানেজারের বরাত দিয়ে সবার কাছ থেকে টাকা আদায় করতে গেলে এক কর্মকর্তা বলে উঠলেন, তাকে বই দুটির নাম বললে সে নিজেই কিনে নেবে! আরও দুজন কর্মকর্তা বললেন, বইয়ের টাকা বেতন পেয়ে ২৫ তারিখে দেবেন!

কোনো এক মাসের ১৫ তারিখে এক গ্রাহক ম্যানেজারের চেম্বারে ঢুকলেন এবং বললেন, ‘স্যার, আমারে চেকটিতে কী সমস্যা একটু দেখবেন?’ ম্যানেজার  প্রশ্ন করলেন, ‘কেন, কী হয়েছে?’  আপনার ডিপোজিটে বসা অফিসার (ডিপোজিট ইনচার্জ) বলছেন, ‘চেকে সমস্যা, টাকা দেওয়া যাবে না।’ ম্যানেজার দেখলেন, চেকের সবই তো ঠিকঠাক! তাই তিনি সংশ্লিষ্ট সেই চেক পেয়িং ডিপোজিট ইনচার্জকে ডেকে পাঠালেন এবং জানতে চাইলেন, ‘কেন চেকটির পেমেন্ট দেওয়া যাবে না।’ ছয় বছর ধরে অ্যাকাউন্ট ওপেনিং এবং ডিপজিট ইনচার্জের দায়িত্ব পালন করা কর্মকর্তার বলিষ্ঠ উত্তর, ‘স্যার, আজকে ১৫ তারিখ, কিন্তু চেকের তারিখ তো ১০ লেখা!’ আরেক দিন নিয়মিত মিটিংয়ের একপর্যায়ে চেক ইনপুটিং এবং অথারাইজিং দুই কর্মকর্তার কাছে জানতে চাওয়া হলো, চেক কত টাকার হলে ডাবল ক্যানসেলেশন লাগে। দুজনই নিজেদের ইচ্ছামতো উত্তর দিলেন। সঠিক উত্তরটি কারও কাছ থেকেই পাওয়া গেল না। আরেকবার ক্যাশ পেইয়িং কর্মকর্তার কাছে জানতে চাওয়া হলো, ‘পোস্ট-ডেটেড চেক’ বলতে কী বোঝেন? তিনিও হতাশ করলেন, জানেন না ‘পোস্ট-ডেটেড চেক’, ‘অ্যান্টি-ডেটেড চেক’ এবং ‘স্টেল চেক’ কী? অথচ তার ক্যাশে চাকরির অভিজ্ঞতা পাঁচ বছরের অধিক!

শাখার ‘ব্রাঞ্চ অ্যান্টি-মানি লন্ডারিং কমপ্লায়েন্স অফিসার (ইঅগখঈঙÑব্যামেলকো)’ ছয় বছর চাকরির অভিজ্ঞতা নিয়ে ১৬ দিনের ফাউন্ডেশন কোর্স ট্রেনিংয়ে যাচ্ছেন। ট্রেনিংয়ে যাওয়ার দু’দিন আগে ম্যানেজার ওই কর্মকর্তাকে ট্রেনিংয়ে গিয়ে নিজেকে এবং নিজের শাখাকে যেন বিব্রতকর অবস্থায় না ফেলেন, তাই কিছু প্রাথমিক জ্ঞান দেওয়া-নেওয়ার প্রয়াস করলেন। কর্মকর্তাকে ব্যামেলকো’র পূর্ণ রূপ জিজ্ঞেস করলে তার উত্তর ছিল ‘ব্যাংক অ্যান্টি-মানি লন্ডারিং কমপ্লায়েন্স অফিসার’। একইভাবে ক্যামেলকো’র (ঈঅগখঈঙ) পূর্ণরূপ বলতে পারলেন না। ম্যানেজার রেগে গিয়ে বললেন, ‘চিফ অ্যান্টি-মানি লন্ডারিং কমপ্লায়েন্স অফিসার’ এবং তা লিখে নিতে বললেন। কর্মকর্তার জিজ্ঞাসা, স্যার, ‘চিফ’ বানানটা কী হবে? ‘লন্ডারিং’ বানানটিও ম্যানেজারকেই বলে দিতে হলো।

দীর্ঘদিন ধরে আনডেলিভার্ড থাকা চেকবইগুলো কর্মকর্তাদের মাঝে ভাগ করে দেওয়া হলো সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্ট হোল্ডারকে ফোন করে নিজ নিজ চেকবই ব্যাংকে এসে নিয়ে যাওয়ার অনুরোধ করতে। প্রত্যেক কর্মকর্তার ভাগে প্রায় ৩০টির মতো করে চেকবই ছিল। দিনশেষে নিজ নিজ মোবাইল ব্যবহার করে গ্রাহকদের ফোন করা বাবদ সবাই মোবাইল বিল দাবি করে বসলেন! গ্রাহকদের চাপ থাকায় অফ-ডিউটিতে থাকা একজন সিকিউরিটি গার্ডকে ঘণ্টাখানেক ফ্লোরে সময় দিতে বলা হলো। পরদিন এই সিকিউরিটি গার্ডও তার সেই এক ঘণ্টার পারিশ্রমিক চেয়ে ম্যানেজারের কাছে আরজি পেশ করলেন।

নিবন্ধটি আত্মসমালোচনার উদ্দেশ্যেই লিখেছি। নিজেকে বড় করতে বা কাউকে ছোট করতে লিখিনি। শুধু বোঝাতে চেয়েছি, পেশাদারিত্বে আমরা কোথায় আছি, আর কোথায় যেতে হবে আমাদের। দেখাতে চেয়েছি, কেমন আমাদের প্রফেশনালিজম, ক্যারিয়ার ওরিয়েন্টেশন এবং প্রতিষ্ঠানের প্রতি আমাদের অ্যাটাচমেন্ট ও লয়্যালটি। শাখাপ্রধান হিসেবে কর্মীদের এহেন দৃষ্টিভঙ্গি এবং কর্মের জন্য ম্যানেজার দায়মুক্ত নন অবশ্যই। হয়তো প্রতিষ্ঠান ও প্রতিষ্ঠানের করপোরেট কালচারও কিছুটা দায়ী। তবে কর্মকর্তাদেরও ভেবে দেখতে হবে, কর্মে কর্মীদের এহেন ব্যর্থতা ও উদাসীন মনোভাবের জন্য একজন ম্যানেজার কিংবা প্রতিষ্ঠানের দায় কতটুকু আর কর্মীর নিজের দায় কতটুকু।

ম্যানেজারদের সর্বদাই অফিসার তৈরি করতে বলা হয়, অর্থাৎ তার অধীনস্থ অফিসারদের যোগ্য করে গড়ে তুলতে বলা হয়। ম্যানেজাররাও নিরন্তর চেষ্টা করেন অফিসারদের সুদক্ষ করে গড়ে তুলতে। তবে ইটখোলা স্থাপন করে সেখানে কাঁচা ইট উৎপাদন করে পুড়িয়ে তারপর সেই পোড়া ইট দিয়ে বিল্ডিং নির্মাণে যে সময় লাগবে, রেডিমেড পোড়া ইট দিয়ে বিল্ডিং নির্মাণ করতে নিশ্চয় সেই সময় লাগবে না। ঠিক একইভাবে মাটি পুড়িয়ে ইট বানানো যাবে, কিন্তু সোনা বানানো যাবে কি? তেমনিভাবে নিজের পদায়নের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ যোগ্যতা, দক্ষতা ও উন্নয়ন প্রচেষ্টা যদি অফিসারদের না থাকে এবং অফিসারদের নিজেদের মধ্যে যদি নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়ার প্রয়াস না থাকে, চাকরি টিকিয়ে রেখে তারা মাসে মাসে বেতন পাওয়াটাকেই যথেষ্ট মনে করেন, তাহলে একজন ম্যানেজার তাকে কতদূর নিয়ে যেতে পারবেন? কর্মীরা যদি তাদের প্রতিটি কর্মের জন্য আর্থিক বিনিময়মূল্য দাবি করেন, তখন বোঝাই যায় প্রতিষ্ঠান ও কর্মীদের মধ্যে চুক্তিভিত্তিক সম্পর্কের বাইরে আর কোনো অ্যাটাচমেন্ট কাজ করে না। কর্মীরা প্রতিষ্ঠানকে নিজের বলে মনে করেন না।

ম্যানেজাররা তার কর্মকর্তাদের কতটুকু দক্ষ করে গড়ে তুলতে পারবেন, তা ম্যানেজারের নেতৃত্বগুণের পাশাপাশি নির্ভর করে কর্মকর্তাদের শিক্ষা, মেধা, পরিশ্রম, চেষ্টা, বুদ্ধিমত্তা এবং প্রতিষ্ঠানের প্রতি ডেডিক্যাশনের ওপর। ব্যাংকিং কেবল লেনদেন ইনপুট আর অথারাইজেশনের পেশা নয়, ব্যাংকিং বহুলাংশে জ্ঞানভিত্তিক পেশা। ব্যাংকারকে চেক চিনলেই হবে না, কিংবা চেক পেয়েই টাকা পরিশোধ করে দিলে হবে না। ব্যাংকারকে জানতে হবে চেকের পেমেন্ট দেওয়ার আগে কী কী দেখতে হয়, কখন চেকের পেমেন্ট দেওয়া যাবে, কখন দেওয়া যাবে না, কখন চেকের পেমেন্ট দিলে ব্যাংক বিপদে পড়তে পারে, কখন তছরুপ হতে পারে তার গ্রাহকের অর্থ প্রভৃতি।

তবে কর্মীদের সেই জানার ও মানার পরিবেশ তৈরি করে দেওয়াটা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বের মধ্যেও পড়ে। একজন সচেতন ব্যাংকার সে নিজে নিরাপদ থাকেন এবং প্রতিষ্ঠানেরও নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন। অন্যদিকে অজ্ঞ এবং বেখায়ালি ব্যাংকার নিজে গর্তে পা ফেলেন, একইসঙ্গে ব্যাংককেও অতল গহ্বরে পতিত করেন। তাই কর্মীর কাজ আদায়ের পাশাপাশি কাজের জন্য কর্মীকে যোগ্য করে গড়ে তোলাটাও খুবই গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত ট্রেনিং, কাউন্সেলিং ও গাইডেনসের পাশাপাশি কর্মীদের যোগ্য হয়ে ওঠার পরিবেশ ও করপোরেট কালচার নিশ্চিত করে কর্মীদের যোগ্য হয়ে ওঠার মানসিকতা জাগিয়ে তোলাটাও প্রতিষ্ঠানের অত্যন্ত জরুরি বিষয় হিসেবে করণীয়। ম্যানেজারকেও তার অধস্তনদের লক্ষ্যমুখী ও চাঙা রাখতে তাদের দায়িত্বের সুষম বণ্টন, কর্মের যথাযথ ও ন্যায়নিষ্ঠ মূল্যায়ন, প্রেষণা প্রদান, মনোবল জাগ্রত করা, তাদের অভাব-অভিযোগ শোনা এবং কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে তাদের দাবি-দাওয়া ও প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধা আদায় করার প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। এসবের অপূর্ণতাও কর্মীকে বিচ্যুত আচরণে প্রভাবিত করে।

তবে প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত দায়িত্ব, কর্মঘণ্টা ও পারিশ্রমিক, পুরস্কার, মূল্যায়ন, লজিস্টিক্যাল সাপোর্ট প্রভৃতিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যেকোনো পেশার কর্ম যদি এমন হয় যে ৬টার অফিস শেষ করতে করতে ৯টা বাজে, তাহলে কর্মীরা জানার জন্য পড়াশোনা করার সময় এবং প্রতিষ্ঠানকে নিয়ে ভাবার আগ্রহ কোনোটাই পাবেন না। বেতন, বোনাস, পদোন্নতি, কাজের চাপ, কাজের পরিবেশ প্রভৃতি নিয়ে কর্মীদের মাঝে যদি সন্তুষ্টি না থাকে, তাহলে তারা প্রতিষ্ঠানের সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত সময়কেই মনে ধারণ করেন এবং চার ঘণ্টায় নিজের কিবোর্ড, মাউস, কম্পিউটার আর ডেস্ক সামলানোটাকেই চাকরি মনে করেন। এর বাইরের কিছু তাদের টানে না, এসব কিছুর জন্য কেউ তাদের খবরদারি করতে গেলেও তারা তা অপ্রাসঙ্গিক ও জঞ্জাল মনে করেন। কখনও কখনও অবাধ্য আচরণও করেন। নিবন্ধে উপস্থাপিত উদাহরণগুলো হয়তো কর্মীদের এমন কিছু আচরণও নির্দেশ করে।

ব্যাংক কর্মকর্তা

[email protected]

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন
ট্যাগ »

সর্বশেষ..