Print Date & Time : 9 May 2021 Sunday 1:00 pm

একুশের চেতনা উজ্জীবিত থাকুক বছরজুড়ে

প্রকাশ: March 2, 2021 সময়- 12:53 am

একুশ মানেই চেতনা, একুশ মানেই ত্যাগ-মহিমার এক উজ্জীবিত প্রেরণা। অমর একুশে ফেব্রুয়ারি বাঙালি জাতির জীবনের এক উজ্জ্বলতম অধ্যায়। এই গৌরব, ইতিহাস, ঐতিহ্য ও মহিমা পৃথিবীর কোনো জাতির নয়, তা একান্তই বাঙালির। পৃথিবীর বুকে বাঙালিই প্রথম কোনো জাতি, যারা নিজেদের জীবন উৎসর্গ করে মর্যাদা রক্ষা করেছিল মাতৃভাষার। আজ তারা ভাষাশহীদ নামে খ্যাত। এর গৌরবোজ্জ্বল সম্মাননা হিসেবে জাতিসংঘ ২১ ফেব্রুয়ারিকে মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। এর ফলে বাংলার চেতনার ইতিহাস যেমন ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বব্যাপী, পাশাপাশি আজ সারা বিশ্বে একুশে ফেব্রুয়ারি দিনটিকে উদ্যাপন করা হচ্ছে।

অমর একুশে ফেব্রুয়ারি ও মাতৃভাষাকে শ্রদ্ধার সঙ্গে বরণ করছেন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি নাগরিকরা। বিশেষ করে একুশে ফেব্রুয়ারিতে সবার সব পথ মিশে হয় এক অভিন্ন ঠিকানা। সেই ঠিকানা হলো শহীদ মিনারের উদ্দেশে হাতে হাতে বসন্তে ফোটা ফুল নিয়ে অভিযাত্রা। কণ্ঠে কণ্ঠে অমর সেই গানÑ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি/আমি কি ভুলিতে পারি…।’ ধীরপায়ে এগিয়ে যায় নানা বয়সের মানুষ। ভাষাশহীদ ও মাতৃভাষার প্রতি নিবেদিত ফুলে ফুলে ছেয়ে যায় শহীদ মিনারের বেদি। এত সম্মান, এত শ্রদ্ধা, এত ভক্তি ও ভালোবাসা দেখানোর পেছনে আছে এক তাজা রক্তদানের ইতিহাস।

বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে বাংলার (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) দামাল ছেলেরা এবং সর্বস্তরের মানুষ সে সময়ের শোষকগোষ্ঠীর চোখরাঙানি ও প্রশাসনের ১৪৪ ধারা উপেক্ষা করে স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাজপথে নেমে এসেছিল ১৯৫২ সালের সেই দিনে। ঢাকার রাজপথ রঞ্জিত হয়েছিল সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারসহ নাম না জানা অগণিত শহীদের রক্তে। আর রক্তঋণে বাঁধা বাঙালি জাতিসহ সারা বিশ্ব আজ সেসব শহীদকে সম্মান জানাচ্ছে। কিন্তু দুঃখের বিষয় আজ আমরা এই ত্যাগ, মহিমা ও বীরত্বকে শুধু বিশেষ দিন বা মাসে সীমাবদ্ধ করে ফেলেছি, যা আমাদের জাতির জন্য আজ এক সমবেদনা ছাড়া যেন কিছু নয়, যেখানে ভাষাশহীদরা শিক্ষা দিলেন ত্যাগের। মা, মাতৃভাষা ও মাতৃভূমিকে জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবাসার স্বাক্ষর রাখলেন তারা। আজ আমরা তাদের আদর্শ ভুলে বিদেশি কালচার গ্রহণ করে আধুনিক হওয়ার স্বপ্ন দেখি। পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে নিজের ও জাতির উন্নতি কামনা করি। এর ফলে একদিকে যেমন হারিয়ে ফেলছি আমাদের নিজস্ব চেতনা, পাশাপাশি ভূলুণ্ঠিত হচ্ছে আমাদের ঐতিহ্য, ত্যাগ ও মহিমার ইতিহাস। সরে যাচ্ছি আমরা আমাদের নিজ সক্রিয়তা ও স্বাধিকারের অনুপ্রেরণা থেকে, সংক্ষিপ্ত করছি আমাদের ঐতিহ্য।

একুশে ফেব্রুয়ারি নির্দিষ্ট দিনকে কেন্দ্র করে চলে আমাদের বিশাল কর্মপ্রচেষ্টা, কিন্তু একবারও ভাবি না আমাদের এই সীমাবদ্ধ আয়োজন আস্তে আস্তে আমাদের কালচারে পরিণত হচ্ছে। এর ফলে আমরা আজ একুশের মহান আদর্শ ভুলে জড়িয়ে পড়েছি দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও বৈষম্যের কালো ছায়ায়। আমরা নতুন প্রজš§কে বঞ্চিত করছি ত্যাগের শিক্ষা থেকে। তাই শুধু বিশেষ দিন বা মাসে নয়, ভাষাশহীদ ও মাতৃভাষার সম্মান অটুট থাকুক বছরজুড়ে। কেননা একুশের চেতনা ও ভাষাশহীদের মহিমা লালন না করে উন্নত জাতি গড়ার অবকাশ নেই।

লুৎফর রহমান লাভলু

শিক্ষার্থী, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ

ঢাকা কলেজ