মত-বিশ্লেষণ

একুশে গ্রন্থমেলা ও আমাদের সৃজনশীলতার স্বরূপ

ইমদাদ হক: ঘড়ির কাঁটা রাত চারটা ছুঁইছুঁই। এই রাতের বেলাতেও বেজে ওঠে ফোন। পেশাগত কারণে দিনরাত ফোন রিসিভ করতে হয়, বেশিরভাগেরই অপরিচিত নম্বর। আমাদের মোবাইল ফোনসহ বিভিন্ন সেবার হটলাইনের নম্বরেও তাও গ্রাহককে অপেক্ষা করতে হয় কয়েক মিনিট পর্যন্ত। আপনার চ্যানেলের সবগুলো নম্বর এখন ব্যস্ত আছে অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। এমন সুযোগ আমার বেলায় নেই। মানুষ তো দরকারেই ফোন দেয়। সুদূর প্রবাসে কারও মৃত্যু হলো, মৃত দেহ দেশে আনতে হবে। প্রবাসে যেতে গিয়ে আবার কে কোন ঝামেলায় পড়ল সব তথ্য জেনে সংশ্লিষ্ট বিভাগে তথ্য জানানোই আমার কাজ। আবার বাজে ফোন, বাজতেই থাকে। ভাইব্রেশন মুডের শব্দটাও নির্জন সময়ে কর্কশ লাগে। অনিচ্ছা সত্ত্বেও ফোনটা রিসিভ করি। কণ্ঠে ঘুমের আবেশ।

: হ্যালো, ইমদাদ বলছি।

: ইমদাদ, আমি (নামটা আর উল্লেখ করলাম না), তোমার বেস্ট ফ্রেন্ড।

আমার বেস্ট ফ্রেন্ড!

: সরি। মনে করতে পারছি না। কেন ফোন দিয়েছেন বলুন প্লিজ।

: আরে, ওই যে, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে দেখা হয়েছিল। চার বছর আগে। সাকিব পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল। আমরা তো ফেসবুকেও আছি, ফেসবুক ফ্রেন্ড।

কষ্ট হচ্ছিল মনে করতে।

: আচ্ছা বলেন। হুম, বলেন। এত রাতে ফোন করেছেন।

: না মানে, একুশে বইমেলা তো। তাই আর কি।

: হুম। রাতেও মেলা চলছে না কি।

: আরে নাহ্। আপনি খুব ফাইজলামি করেন এখনও। মেলায় যাব আগামীকাল।

: হুম।

: না, তুমি কি বিরক্ত হচ্ছো।

সম্বোধন আপনি থেকে তুমিতে।

: হুম। বলেন…।

: তুমি কি কাল আমার সঙ্গে দেখা করবে। একটু জরুরি দরকার।

: কখন। সকালে হলে দেখা করতে পারি। আমার অফিসে আসেন।

: না না, সকালে নয়। আসলে বিকাল তিনটার পর। অবশ্য রাত আটটার আগে হলেও হবে।

: জরুরি কী বিষয়। ফোনেই বলেন।

: না না। তুমি আসো। কাল দেখা করো। জরুরি।

ফোনটা বন্ধ করেই চোখ বন্ধ করলাম। বাকি রাতটুকু ঘুমানো দরকার।

সকাল থেকে আবার শুরু হলো ফোন। আমাকে ভালোই কষ্ট করতে হলো। অফিসের কাজ সামলে নিয়ে গেলাম পাবলিক লাইব্রেরিতে। তাকে ফোন দিলাম। দশ মিনিটের মধ্যে এলেন তিনি।

: চলো। বইমেলায়। তোমায় নিয়ে বইমেলায় যাই।

সৌজন্যতার খাতিরে নাও বলতে পারলাম না। অনুরোধে ঢেঁকি গেলার মতো সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের মেলা প্রাঙ্গণে গেলাম। ভালোই মেলার পরিবেশ। কত দিন পর এলাম। উনার সঙ্গে যখন পরিচয়, তখন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র, আজিজ মার্কেট, পাবলিক লাইব্রেরিতে যাতায়াত ছিল নিয়মিত। বন্ধুদের সঙ্গে কতশত আড্ডা। লিটল ম্যাগাজিন, সাহিত্য পত্রিকা, গল্পের বই, বাংলা লেখালেখির রকমফের, ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে বক্তৃতার তুবড়ি একেকজনের। সবাই বেশ লিখতও। দৈনিক পত্রিকার সাহিত্য পাতার জন্য আমাদের আগ্রহভরে অপেক্ষা। কার লেখা কে ছাপল, রাবিশ মার্কা লেখা বলে ছাপা হলো নাÑনা ছাপা হওয়াদের টিপ্পনি। এখন সেই চক্রের কে কোথায়। লেখালেখির চর্চা ঠিক থাকবে বলে সবারই প্রাথমিক ভাবনা ছিল সাংবাদিকতায় পেশা গড়ার। সেই চক্রের বেশিরভাগ এখন এ পেশাতেই। তবে সেই সময়ের পড়াশোনা নেই, নেই লেখালেখির চর্চাও।

আমরা হাঁটতে হাঁটতে মেলায় ঢুকলাম। আমার চিন্তার সময়ে তার নতুন লেখা নিয়ে গল্প বলে গেল। অবশ্য এসব আমার মাথায় ঢুকেনি।

একটি স্টলের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। দোকানিকে তার ঝটপট অর্ডার।

: দুইটা বই দাও তো। তাড়াতাড়ি।

: কিসের বই। কার বই।

এবার ভদ্রলোক আসলেন মূল কথায়। তিনি লিখেন। নিয়মিত লিখেন। এসব লেখা ছাপা হয় পরিচিত-অপরিচিত নানা অনলাইনে। সেসব নিয়েই তার বই, ‘এই সময়ের হালচাল’। বই নিয়ে শুরু করলেন অটোগ্রাফি। আমার নামে, আমার এক বান্ধবীর নামে। যাকে তিনি সে সময়ে চিনতেন। গত চার বছরে সেই বান্ধবীর সঙ্গে আমার কোনোই যোগাযোগ নেই। এই তথ্য অবশ্য তার অজানা। জানাতেও মন চাইল না। তিনি এবার বেশ প্রফুল্ল। খুশি লাগছে। তার খুশি দেখে আমার হাসি চলে এলো। সাহিত্য পাগলরা একটু পাগলাটে হয়, তরুণ বয়সের আড্ডায় এই কথাটা আলোচনা হতো বেশ। সেই সময়ে আমাদের জব্বার ছিল নতুন ধারার লিটল ম্যাগ ভক্ত। একবার গ্রামের বাড়িতে গরু বিক্রি করে লিটল ম্যাগের একটা সংখ্যা বের করলো। পরে ব্যাগে করে নিয়ে ঘুরত। যার সঙ্গে দেখা হতো, হাতে তুলে দিত একটা কপি। জোর করে হলেও ম্যাগাজিনের দাম ১৫ টাকা আদায় করে নিত। সেই জব্বারের তুলনায় এই ভদ্রলোকের পাগলামির মাত্রা একটু কম মনে হচ্ছে। দুইটা বইয়ের দাম পৌনে ২০০ টাকা পরিশোধ করতে হলো আমাকে। তাতে তার খোশ মেজাজ।

এবার ফটোসেশনের মানে সেলফির পালা। মোবাইল বের করে নানা কসরত করে ছবি উঠালেন। আমার কোনো বিরক্তি নেই। ভালো লাগাও নেই। উনি যা বলছেন, আমি তাই করছি।

খুশিতে বেশ গদগদ তিনি। বললেন

: আমি আসলে অনেক ব্যস্ত দোস্ত। যাও। ভালো থেকো। কথা হবে আবার। আগে কবিতা লিখতাম। জানোই তো। তবে এখন কবিতার কাটতি কম। মানুষ কবিতা পড়তে চায় না। সবাই নতুন নতুন বিষয় জানতে চায়। আমি এখন আর কবিতা লিখি না। এই সময়ের বিষয়ে আমার অনেক জ্ঞান। তোমার বইটা মনোযোগ দিয়ে পড়া দরকার। সরকারের অনেক কাজে লাগবে। প্রচুর বিক্রি হচ্ছে। ঢাকার বাইরের বিভিন্ন জেলা থেকে লোকজন এসে বই কিনছে। মজার ব্যাপার কি জানো, সেলফির যুগে মনে করেছিলাম অটোগ্রাফের দিন শেষ। ভুল ধারণা। অটোগ্রাফির সঙ্গে এখন ফটোগ্রাফি যোগ হয়েছে। আমার অফিসের সবাই দলবেঁধে এসে বই কিনে নিয়ে গেছে। আরও আসবে। আমার জেলা থেকে আসছে। বই লিখলে এমনই লেখা উচিত। হাজারে একটা। আমি আবার কাউকে না করতে পারি না। সবাই আসে। অটোগ্রাফি! ফটোগ্রাফি!! অটোফটোগ্রাফি!!!

মুখ খুলে দাঁত বের করে হাসলেন। সুয্যি মামা তখন পশ্চিমাকাশে। টুপ করে ডুবে যাবে এখনই। মেলার এলইডি লাইটের আলোতে তার খোঁচা খোঁচা দাড়ির মাঝে দাঁতগুলোকে হলদেটে মনে হলো।

আপাতত বিদায়। চলে এলাম। গাড়ি তখন বাংলামোটরের যানজটে। এই আধা ঘণ্টার মধ্যেই ফেসবুকে ছবি। অনেক বিশেষণ আর শ্রুতি বাক্য। আমার অফিসের ব্যস্ততা সত্ত্বেও বইমেলায় গিয়েছি তার সঙ্গে দেখা করতে। তার বই কিনেছি। তার কলাম ও প্রবন্ধের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছি। তার অটোগ্রাফ নিয়েছি, ছবি তুলেছি। শুধু আমার জন্য নয়, আমার গার্লফ্রেন্ডের জন্যও বই কিনেছি। আমার মতো অনেকেই তার সঙ্গে ছবি উঠাচ্ছেন। তার কবিতা কিনছেন।

ফেসবুক থেকে লগআউট করলাম শুধু।

০২.

বইমেলা নিয়ে লেখকদের উচ্ছ্বাস বরাবরই। সৃজনশীল আয়োজন বইমেলা। সময়ের সঙ্গে এর পরিসর বাড়ছে। সেই সঙ্গে বাড়ছে প্রতারণা ও চাটুকারিতাও। বই প্রকাশের ক্ষেত্রে লেখক ও প্রকাশকের সঙ্গে একটা লিখিত চুক্তির বিধান আছে। প্রচ্ছদ শিল্পীরও সম্পৃক্ততা থাকে এতে। আমাদের বইমেলার ক্ষেত্রে এর কতটুকু মানা হয়। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, সরকারি কর্মকর্তা বা গবেষকদের মূল্যবান পাণ্ডুলিপি নিয়ে বই বের করেন প্রকাশক। কাক্সিক্ষত বিক্রি হলো কি না, সে হিসাব আর কে রাখে। প্রকাশকের একই কথা, বিক্রি নেই। লেখককে সম্মানী দেওয়া দূরের কথা, উল্টো প্রকাশককে দিলেই হয়। আর সৌজন্য সংখ্যার ২৫ কপির টাকাও নামিদামি লেখকের কাছ থেকে আদায়ের ঘটনাও জানা আছে বেশ কয়েকটা। তরুণ লেখক হলে কথাই নাই। প্রকাশককে টাকা দিতে হবে। না হলে, অন্তত ২০০-৩০০ কপি বই কিনে নিতে হবে লেখককে। লেখকের যাই হোক, প্রকাশকের যেন মান থাকে। আবার লেখকের পেছনে টাকার জন্য ঘুরে ঘুরে সব হারাতেও দেখেছি দু-একজন প্রকাশককে। প্রকাশনার ব্যবসাটা যাচ্ছে কোন দিকে আসলে!

০৩.

বর্তমান সরকারের প্রভাবশালী এক মন্ত্রী। লেখালেখি তার পুরোনো অভ্যাস। এখনও লিখেন রাত জেগে। দায়িত্ব পাওয়ার এক বছরের মধ্যেই এই মন্ত্রীর চার-চারটি বই বের হলো। সব নামিদামি প্রকাশনা। এত বড় মন্ত্রণালয়, এত ব্যস্ততাÑএর মধ্যে আবার এতগুলো বইও বের হলো এক বছরেই?

একজনের জিজ্ঞাসায় প্রাণ খুলে হাসলেন তিনি। তার ভাষায়,

শোনেন মজার কথা। আমার বড় ভাই (সাবেক এক মন্ত্রী) নিয়মিত লেখেন। মন্ত্রী হওয়ার পরও লিখেন, আগেও লিখতেন। বলতে পারেন, আমাদের ভাইবোনদের লেখালেখির অভ্যাস পারিবারিকভাবেই, সেই কিশোরকাল থেকেই। তা যাই হোক, বড় ভাইয়ের ধুমধাম করে আত্মজীবনী বের হচ্ছে। উন্নয়ন, অর্থনীতি নিয়ে বের হচ্ছে একের পর এক বই।

একবার ভাইয়ের বাসায় বই নিয়ে কথা হচ্ছে। ভাই বললেন, তোমার লেখাগুলো নিয়েও তো বই বের করতে পার।

আমি আর কে? প্রকাশক আমার বই বের করবে কেন?

চিন্তা করো না। প্রকাশকের সঙ্গে তোমার পরিচয় করিয়ে দিচ্ছি। বই বের করে দেবে।

সেই যে প্রকাশক পাণ্ডুলিপি নিয়ে গেলেন। এরপর দিন যায়, মাস যায়, বছরও পার হয়ে যায়। দুই বছরে আর বই বের হয় না। বারবার প্রকাশকের একই কথা, কাজ চলছে, খুবই মানসম্মত বই বের হবে। সেই দুই বছরে আর কোনো বই বের হয়নি। কিন্তু মন্ত্রী হওয়ার পর কী যে হলো, প্রকাশকদের ততপরতা এত বেড়ে গেল যে, এক বছরের মাথায় বের হলো চারটি বই। মন্ত্রী মহোদয়ের প্রাণখোলা হাসি!

ফ্রিল্যান্স লেখক ও গবেষক

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..