মত-বিশ্লেষণ

একুশ আমাদের অহংকার

খালিদ ফেরদৌস: বাঙালির জাতীয় জীবনে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ সর্বশ্রেষ্ঠ বসন্ত। যে বসন্তে দেশের তরে ঝরেছে ৩০ লাখ রক্তাক্ত শিমুল। রক্তে রঞ্জিত হয়েছে কৃষ্ণচূড়া-রাঁধাচড়ার ডাল। বিদ্রোহের অগ্নিতে পাকিস্তানি সেনাদের হটিয়ে, প্রিয়জনের নীরব অভিমান বুকে নিয়ে মেহগনি, জারুল, তমাল, মহুয়া পাতার মতো বাংলার উর্বর মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে অনেক সতেজ-তাজা প্রাণ। তাই স্বাধীনতা আমাদের অহংকারের দীপ্ত শপথ। তবে এই স্বাধীনতা অর্জন আমাদের জন্য সহজ ও কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। এর পেছনে রয়েছে তপ্ত বুলেট, উত্তপ্ত রাজপথে মিছিল-সেøাগানের জ্বলন্ত ইতিহাস। আমাদের অধিকার, স্বাধিকার ও মহান স্বাধীনতা অর্জনে তেভাগা আন্দোলনের ইলা মিত্র, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, মাস্টার দ্য সূর্যসেন, গরিবের স্বার্থ সংরক্ষণে তিতুমীর, হাজী শরীয়তুল্লাহ, কৃষক-প্রজা অধিকার আদায়ে শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক, ভাষা আন্দোলনের রফিক, শফিক, সালাম, বরকত, স্বাধীনতা সংগ্রামে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ হাজার জনতা এক একজন মহানায়ক।

১৭৫৭ সালে পলাশীর প্রান্তরে বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হওয়ার পর এদেশের শাসন ভার চলে যায় ব্রিটিশদের হাতে। প্রায় ২০০ বছরের শাসন-শোষণের পর ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টির মুহূর্ত থেকেই বাঙালির স্বপ্নভঙ্গের বীজ তার অন্তরে নিহিত ছিল এবং সে রাষ্ট্রের স্থায়িত্বের সম্ভাবনা ছিল একান্তই দুর্বল। যে দুটি বিচ্ছিন্ন ভূখণ্ড নিয়ে পাকিস্তান গঠিত হয়েছিল, তাদের মধ্যকার সরলরৈখিক দূরত্ব ১১০০ মাইল। আর স্থল, জল ও আকাশপথে যাতায়াতের দূরত্ব এর চেয়ে অনেক বেশি। সর্বোপরি পাকিস্তানের দুই অংশের জনগণের মধ্যে এক ধর্ম ছাড়া আর কোনো কিছুতেই তেমন সামঞ্জস্য ছিল না। তাদের ইতিহাস আলাদা, ভাষা ও সংস্কৃতি স্বতন্ত্র, অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিমণ্ডল ভিন্ন। এমনকি পোশাক-পরিচ্ছদ ও সামগ্রিক জীবনচরণ আলাদা ছিল। পাকিস্তানবাদী নেতাদের কাছে ধর্মটা শুধুই রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার হয়েছে। পাকিস্তান সৃষ্টির পরপর এসব বিষয়গুলো সামনে চলে আসে। চলে আসে পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে নানা রকমের বৈষম্য। চাকরি-বাকরিসহ সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে মোটা দাগের অসমতা এদেশের মানুষকে প্রতিবাদী করে তুলেছিল। তাই পশ্চিম পাকিস্তানের শোষণ-বঞ্চনার হাত থেকে রক্ষা পেতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অবসম্ভাবী হয়ে পড়েছিল। এই সম্ভাবনাকে আরও বেগবান করেছিল ’৫২-এর ভাষা আন্দোলন।

বাঙালির ন্যায্য অধিকার আদায় ও মহান স্বাধীনতার বীজ বপনের প্রশ্নেÑ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ভাষা আন্দোলন সবচেয়ে বেশি অম্লান এবং অবিস্মরণীয়। হাজার বছরের ঐতিহ্যলালিত আমাদের মাতৃভাষা, আমাদের মুখের ভাষা, যে ভাষায় কথা বলি, মনের ভাব প্রকাশ করি, যে ভাষা কেড়ে নিতে চেয়েছিল তৎকালীন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী। ১৯৪৮ সালের ২০ মার্চ পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকায় আগমন করে ২১ মার্চ বিশাল জনসভায় ঘোষণা দেন, ‘উর্দু এবং উর্দু হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’Ñএই ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে ঢাকায় ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৫২ সালের ২৭ জানুয়ারি পল্টন ময়দানে খাজা নাজিমুদ্দীন আবার ঘোষণা দিলেনÑ‘উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’, তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিবাদ জানায়। আন্দোলন ঢাকাসহ সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। ৩০ জানুয়ারি ঢাকা শহরের সর্বস্তরের বুদ্ধিজীবী, রাজনৈতিক নেতা ও ছাত্রসমাজ কর্তৃক সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়েছিল। ৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকার সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট পালিত হলো। সর্বদলীয় কর্মপরিষদ ২১ ফেব্রুয়ারি সাধারণ ধর্মঘটের ডাক দিল। এদিন সকাল ১০টায় গাজীউল হকের সভাপতিত্বে সভাশেষে ছাত্র-জনতা আমাদের মাতৃভাষা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে মিছিল স্লোগানে ঢাকার রাজপথ প্রকম্পিত করে তোলে। পুলিশ প্রথমে গণ প্রেপ্তার শুরু করে। পরে আন্দোলনের তীব্রতা দেখে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পুলিশকে লেলিয়ে দিয়ে ছাত্র-জনতার মিছিলে গুলি চালায়। বুলেটের আঘাতে অনেকে বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দেয়। তাদের রক্তের বিনিময়ে আমরা মাতৃভাষা বাংলার অধিকার ফিরে পাই।

পৃথিবীতে কোনো জাতি নেই, যারা মাতৃভাষার জন্য আমাদের মতো বুকের তাজা রক্ত ঝরিয়েছে। বাঙালির মাতৃভাষার প্রতি অগাধ ভালোবাসা ও গভীর মমত্ব দেখে ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেস্কোর সাধারণ সম্মেলনের ৩০তম অধিবেশনে ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। ’৫২ ভাষা আন্দোলন শুধু আমাদের মায়ের ভাষার অধিকার ফিরিয়ে দেয়নি, দিয়েছে বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও মুক্তিযুদ্ধের মহান চেতনা। যার পথ ধরে আমরা হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ অর্জন স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ পেয়েছি।

ভাষাকে কেন্দ্র করে স্বপ্নপূরণ হয়েছে আমাদের। একুশের পথ ধরেই আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি। তবে স্বাধীনতার পর আমাদের স্বপ্ন কি পুরোটাই পূরণ হয়েছে? হয়নি। কেন হয়নি? কেন বারবার আমাদের স্বপ্ন ভঙ্গ হচ্ছে? আমরা কেন নৈতিকতা ও মূল্যবোধের শিক্ষা হারিয়ে ফেলছি? যে একুশের চেতনা বুকে ধারণ ও লালন করে দেশ স্বাধীন হলো, সে চেতনা কোথায়? কোথায় আমাদের সংকট? মূলত এই সংকট শুরু হয়েছিল স্বাধীনতা-উত্তর সময় থেকে। ১৯৭২ সাল থেকেই এখানে শুরু হয়েছে অন্য এক প্রক্রিয়া, যার ধারাবাহিকতা রক্ষা করে এক-এগারোর পর থেকে ফেব্রুয়ারি মাস পরিণত হয়েছে এক ধরনের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, ব্যবসায়ী ও মতলববাজ বুদ্ধিজীবীদের বাণিজ্যিক উৎসবে। ফলে একুশের মৌলিক চেতনাকে ধারণ করে দেশের প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে শহীদ মিনারকে কেন্দ্র করে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল অতীতে, তা বর্তমানে আর নেই। এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য নতুন করে আমাদের অন্তরে একুশের চেতনাকে লালন করতে হবে। কারণ একুশ আমাদের শিখিয়েছে দেশের তরে, দশের তরে কীভাবে প্রাণ দিতে হয়। অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হয়। ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি …’ গানটি যখন মধুর সুরে বেজে ওঠে, তখন প্রত্যেকটা বাঙালি দেশের জন্য, ভাষার জন্য মরতে প্রস্তুত হয়। ২১ ফেব্রুয়ারিকে সারা বিশ্বের ১৯৩টা দেশ আনুষ্ঠানিকভাবে পালন করছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস, যা গর্বে আমাদের বুকটা ভরিয়ে দেয়। একুশ আমাদের অনুপ্রেরণার বাতিঘর। শিরা-ধমনিতে ওঠে রণিÑআমরাও পারি, আমরা বীরের জাতি। তাই সারা বিশ্ব আমাদের দিকে অবাক তাকিয়ে রয়।

 প্রভাষক, গাজীপুর ক্যান্টনমেন্ট কলেজ

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..