আজকের পত্রিকা মত-বিশ্লেষণ সর্বশেষ সংবাদ

একুশ শতকী বিপর্যয়ে ভঙ্গুর বিশ্ব অর্থনীতি

এই গ্রহটি ধ্বংস হওয়ার রব মাঝে মাঝেই শোনা যায়। গত ২০ বছরে সবচেয়ে আলোচিত দুটি সংবাদ ছিল ২০০০ ও ২০১২ সালের পৃথিবী ধ্বংসের ভবিষ্যদ্বাণী। কিছু লোক তা নিয়ে মাতামাতি করলেও তার প্রভাব ছিল নগণ্য। তবে পৃথিবীর ধ্বংস নিয়ে হলিউড যত সিনেমা তৈরি করেছে, তা এ-সংক্রান্ত ঝুঁকির ঘটনার চেয়ে অনেক বেশি।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে অনেকবারই তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের কথা এসেছে। তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ সংঘটিত না হলেও পৃথিবীকে আতঙ্কিত করার মতো ঘটনা কম ছিল না। দেশে দেশে যুদ্ধ, চেরনোবিল দুর্ঘটনা, সোভিয়েত বনাম যুক্তরাষ্ট্রের শীতল যুদ্ধ, অসংখ্য ঘূর্ণিঝড়, বন্যা ও সুনামির মতো ঘটনাগুলো উল্লেখযোগ্য।

২০০১ সালে টুইন টাওয়ার হামলার পর বিশ্ব ব্যবস্থায় অর্থনৈতিক, ধর্মীয়, পররাষ্ট্র-সংক্রান্ত ও সামাজিক ক্ষেত্রে একটা বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটে। সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের নামে মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক আগ্রাসন চলেছে। সঙ্গে আরব বসন্ত ছিল। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও স্বাস্থ্যগত ক্ষেত্রে বড় বিপর্যয় হয়েছে। এ ঘটনাগুলোর কোনোটাই সারা বিশ্বকে একযোগে সম্পৃক্ত করেনি। ঘটনাগুলো ছিল বিচ্ছিন্ন। কোনো একটা দেশকে বা কোনো একটা অঞ্চলকেই শুধু আক্রান্ত করেছে। বিগত বছরগুলোয় সারা বিশ্বকে সম্পৃক্ত করার মতো সম্ভবত একটাই ঘটনা ছিল, সেটা বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন। কিন্তু যারা এর জন্য দায়ী তারা এটা অস্বীকার করে এসেছে। আর যারা ক্ষতিগ্রস্ত তারা বুঝতেই পারেনি। কারণ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সঙ্গে সঙ্গে বোঝা কঠিন।

তবে বর্তমান সময়ে সারা বিশ্বকে একযোগে আতঙ্কিত করতে পেরেছে একমাত্র করোনাভাইরাস এবং এর দ্বারা সংঘটিত কোভিড-১৯ রোগ। ধনী থেকে দরিদ্র সবাই এ রোগে আক্রান্ত হতে পারে। গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি থেকে শুরু করে অতি সাধারণ মানুষ, কেউই করোনাভাইরাস থেকে নিরাপদ নয়। এটি মানে না কোনো সীমান্ত, বোঝে না কোনো সীমানা—সুযোগমতো সবাইকেই এটি সাদরে নিমন্ত্রণ করে নেয় অতি সহজেই।

সারা বিশ্বের অর্থনীতি হঠাৎ করে থমকে দাঁড়িয়েছে। বিনোদন জগৎ বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠেছে শুধু ইন্টারনেট। খাদ্যের সরবরাহে বিঘ্ন ঘটনায় খাদ্যসংকটও দেখা দিয়েছে। শুধু চিকিৎসা ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পৃক্ত মানুষেরা কাজ করে যাচ্ছে। কিন্তু করোনাভাইরাসের সংক্রমণের মাত্রা এতটাই যে হাসপাতালগুলো হিমশিম খাচ্ছে। প্রতিদিনই পরিসংখ্যানের খাতায় আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা বেড়ে চলেছে। এভাবে চলতে থাকলে মধ্যবিত্ত বা নিম্নআয়ের মানুষেরা সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়বেন। কারণ তাদের পাশে ধনীদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে উন্নত চিকিৎসা পাওয়া সম্ভব নয়। এ ছাড়া নিম্নআয়ের মানুষেরা অর্থনৈতিকভাবে সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়বেন। এমন অবস্থা চলতে থাকলে অচিরেই এ মহামারি আরও ভয়ংকর হয়ে উঠবে। কারণ তখন আক্রান্ত না হয়েও খাদ্য বা চিকিৎসা সংকটে আরও অনেক মানুষ মারা পড়বে। আর আমাদের মতো দুর্বল অর্থনীতি বা চিকিৎসাসেবার দেশে এই মহামারি কতটা ভয়ংকর হতে পারে, তা ভাবতে গেলেও শিউরে উঠতে হয়।

যেসব ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান দেশের প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে আর্থিক সহযোগিতা করে যাচ্ছে, তাদের ও যেমন দুর্ভোগ পোহাতে হবে, তেমনি এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের অন্তর্ভুক্ত দেশের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকেও পড়তে হবে নিদারুণ কষ্টে। যে মানুষগুলো দেশের বড় বড় আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বারান্দায় পা দিতেও সাহস পায় না, তাদের সাদরে গ্রহণ করে নেয় মাঝারি ও ক্ষুদ্র আর্থিক প্রতিষ্ঠান। এদের বাঁচিয়ে না রাখলে অর্থনীতি আরও ভেঙে পড়বে। মানবজীবন আরও অতিষ্ঠ হয়ে উঠবে। তাই সরকারের উচিত যত দ্রুত সম্ভব তাদের আগের মতো কার্যক্রমে সহযোগিতা করা।

এ বিপর্যয় কত বিস্তৃত হবে বা কত দিন ধরে চলবে, তা সময়ই বলে দেবে। তবে এ মুহূর্তে সবার একযোগে এগিয়ে আসতে হবে। এই এগিয়ে আসা মানে নিজেদের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি। নিজেরা যাতে এই ভাইরাসের বাহক না হয়ে যাই, সেজন্য জনসমাগম এড়িয়ে চলা, নিজেদের গৃহবন্দি করা এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকার ওপর গুরুত্বারোপ করতে হবে। আর একান্তভাবে আক্রান্ত হয়ে গেলে দ্রুত চিকিৎসার আওতায় আসা জরুরি।

সোহরাওয়ার্দী শুভ

ফিচার লেখক

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..