দিনের খবর প্রচ্ছদ প্রথম পাতা

এক দশকে ক্যাপাসিটি চার্জ ৫৯ হাজার ৬১২ কোটি টাকা

বেসরকারি খাত থেকে বিদ্যুৎ কেনা

বেসরকারি খাতে স্থাপিত বিদ্যুৎকেন্দ্রের সংখ্যা প্রতি বছর বাড়ছে। এতে বাড়ছে ক্যাপাসিটি চার্জের বোঝাও। গত এক দশকে শুধু এ চার্জ থেকেই প্রচুর আয় করেছে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো। ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ এক দশকে কোন কোম্পানি কত আয় করেছে, তা সম্প্রতি অনুসন্ধান করেছে শেয়ার বিজ। এ নিয়ে ধারাবাহিক আয়োজনের আজ ছাপা হচ্ছে প্রথম পর্ব

ইসমাইল আলী: ২০০৯ সালের পর থেকেই বেসরকারি খাতে বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনে অগ্রাধিকার দিচ্ছে সরকার। আবার মেয়াদ পেরিয়ে যাওয়ার পরও বেশ কয়েকটি রেন্টাল-কুইক রেন্টাল কেন্দ্রের চুক্তি নবায়ন করা হয়েছে। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদনে বেসরকারি খাতের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়ছে। আর এ বিদ্যুৎ কেনায় বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডকে (পিডিবি) প্রতি বছর মোটা অঙ্কের ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করতে হচ্ছে।

সংস্থাটির হিসাব বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১০-১১ থেকে ২০১৯-২০ পর্যন্ত ১০ বছরে দেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয় প্রায় ৪৮ হাজার ৬৭৮ কোটি ৩৭ লাখ কিলোওয়াট ঘণ্টা। এর মধ্যে বেসরকারি খাত থেকে কেনা হয় ২১ হাজার ৯৬৩ কোটি ৭৯ লাখ কিলোওয়াট ঘণ্টা বিদ্যুৎ। এজন্য পিডিবিকে বিল পরিশোধ করতে হয় এক লাখ ৪৯ হাজার ৮৭৪ কোটি ৪১ লাখ টাকা। এর মধ্যে ক্যাপাসিটি চার্জই ছিল ৫৯ হাজার ৬১১ কোটি ৯৪ লাখ টাকা।

এ হিসাবে গত এক দশকে বেসরকারি খাত থেকে বিদ্যুৎ কেনায় ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ ৩৯ দশমিক ৭৭ শতাংশ অর্থ পরিশোধ করতে হয়েছে পিডিবিকে। এছাড়া প্রতি বছর এ খাতে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাটির ব্যয় বেড়েই চলেছে। এর মধ্যে গত অর্থবছর ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ পিডিবির খরচ বেড়েছে প্রায় ২৫ শতাংশ।

পিডিবির তথ্যমতে, গত অর্থবছর জুন শেষে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা দাঁড়ায় ১৮ হাজার ৯৬৬ মেগাওয়াট। এর মধ্যে বেসরকারি খাতে রয়েছে আট হাজার ৪১১ মেগাওয়াট। বেসরকারি এসব কেন্দ্র থেকে কেনা হয় দুই হাজার ৮৮৬ কোটি ৭৬ লাখ কিলোওয়াট ঘণ্টা বিদ্যুৎ। এতে ব্যয় হয় ২০ হাজার ৫৫৫ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। এর মধ্যে ক্যাপাসিটি চার্জই পরিশোধ করা হয় ১০ হাজার ৮৫২ কোটি ৭৮ লাখ টাকা, যা উৎপাদন ব্যয়ের প্রায় ৫২ দশমিক ৮০ শতাংশ।

এর আগের (২০১৮-১৯) অর্থবছর দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ছিল ১৮ হাজার ৪৫৮ মেগাওয়াট। এর মধ্যে বেসরকারি খাতের সক্ষমতা ছিল পাঁচ হাজার ৭৪১ মেগাওয়াট। বেসরকারি এসব কেন্দ্র থেকে কেনা হয় দুই হাজার ৭১৩ কোটি ৩০ লাখ কিলোওয়াট ঘণ্টা বিদ্যুৎ। এতে ব্যয় হয় ২০ হাজার ৭৮১ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। এর মধ্যে ক্যাপাসিটি চার্জই ছিল আট হাজার ৭২২ কোটি ২৭ লাখ টাকা, যা উৎপাদন ব্যয়ের প্রায় ৪২ শতাংশ। যদিও গত অর্থবছর বেসরকারি খাতের কেন্দ্রগুলোর সক্ষমতার ৬১ শতাংশই অব্যবহৃত ছিল।

একইভাবে ২০১৭-১৮ অর্থবছর দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ছিল ১৪ হাজার ১১৩ মেগাওয়াট। এর মধ্যে বেসরকারি খাতের সক্ষমতা ছিল পাঁচ হাজার ২১৩ মেগাওয়াট। বেসরকারি এসব কেন্দ্র থেকে কেনা হয় দুই হাজার ৫২৩ কোটি ৩৪ লাখ কিলোওয়াট ঘণ্টা বিদ্যুৎ। এতে ব্যয় হয় ১৬ হাজার ৬৯২ কোটি ৩২ লাখ টাকা। এর মধ্যে ক্যাপাসিটি চার্জ ছিল ছয় হাজার ২৪১ কোটি ২৫ লাখ টাকা, যা উৎপাদন ব্যয়ের ৩৭ দশমিক ৩৯ শতাংশ। সে অর্থবছর বেসরকারি খাতের কেন্দ্রগুলোর সক্ষমতার ৪৬ শতাংশ অব্যবহৃত ছিল।

আবার ২০১৬-১৭ অর্থবছরে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ছিল ১৪ হাজার ৯৪ মেগাওয়াট। এর মধ্যে বেসরকারি কেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা ছিল পাঁচ হাজার ৪৫৯ মেগাওয়াট। এ খাত থেকে সে সময় কেনা হয়েছিল দুই হাজার ৪৪৫ কোটি ২৮ লাখ কিলোওয়াট ঘণ্টা বিদ্যুৎ। এতে ব্যয় হয় ১৪ হাজার ৭৩৫ কোটি ২৮ লাখ টাকা। এর মধ্যে ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ পরিশোধ করা হয় পাঁচ হাজার ৭৬৪ কোটি ৯৭ লাখ টাকা, যা উৎপাদন ব্যয়ের ৩৯ দশমিক ১২ শতাংশ। ওই অর্থবছর বেসরকারি খাতের কেন্দ্রগুলোর সক্ষমতার ৪৫ শতাংশ অব্যবহৃত ছিল।

তথ্যমতে, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে বেসরকারি খাতে স্থাপিত বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা পাঁচ হাজার মেগাওয়াট ছাড়ায়। সে সময় এ সক্ষমতা দাঁড়ায় ১৯৪ মেগাওয়াট। সে অর্থবছর এ খাত থেকে দুই হাজার ৪১৩ কোটি ৬৪ লাখ ইউনিট বিদ্যুৎ কেনা হয়। এতে ব্যয় হয়েছিল ১৪ হাজার ১৭ কোটি ১৯ লাখ টাকা। এর মধ্যে ক্যাপাসিটি চার্জ পাঁচ হাজার ৩৭৬ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। মোট ব্যয়ের মধ্যে এর হার ছিল ৩৮ দশমিক ৩৬ শতাংশ।

২০১৪-১৫ অর্থবছরে বেসরকারি খাতে স্থাপিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা ছিল চার হাজার ৪৪৮ মেগাওয়াট। সে অর্থবছর বেসরকারি খাত থেকে বিদ্যুৎ কেনা হয় এক হাজার ৯৫৪ কোটি ৫২ লাখ কিলোওয়াট ঘণ্টা। এতে ব্যয় হয় ১৪ হাজার ৯০৬ কোটি ১১ লাখ টাকা। আর ক্যাপাসিটি চার্জ ছিল চার হাজার ৬৬৪ কোটি ৭০ লাখ টাকা, যা মোট ব্যয়ের ৩১ দশমিক ২৯ শতাংশ।

এদিকে ২০১৩-১৪ অর্থবছরে বেসরকারি খাতে স্থাপিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা চার হাজার মেগাওয়াট ছাড়ায়। সে সময় এ সক্ষমতা ছিল চার হাজার ৯৬ মেগাওয়াট। সে অর্থবছর বেসরকারি খাত থেকে বিদ্যুৎ কেনা হয় এক হাজার ৮৬৩ কোটি ২৫ লাখ কিলোওয়াট ঘণ্টা। এতে ব্যয় হয় ১৪ হাজার ২১৩ কোটি ৭২ লাখ টাকা, যার মধ্যে ক্যাপাসিটি চার্জ ছিল চার হাজার ৭১৪ কোটি ৩৪ লাখ টাকা। মোট ব্যয়ের মধ্যে এ হার ৩৩ দশমিক ১৭ শতাংশ।

একইভাবে ২০১২-১৩ অর্থবছরে বেসরকারি খাতে স্থাপিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা দাঁড়ায় তিন হাজার ৬৮৫ মেগাওয়াট। সে অর্থবছর বেসরকারি খাত থেকে কেনা হয় এক হাজার ৮৬২ কোটি পাঁচ লাখ কিলোওয়াট ঘণ্টা বিদ্যুৎ। এতে ব্যয় হয় ১৪ হাজার ৯০ কোটি ২০ লাখ টাকা। এর মধ্যে ক্যাপাসিটি চার্জ ছিল পাঁচ হাজার ৪৯০ কোটি ৪৫ লাখ টাকা, যা মোট ব্যয়ের ৩৮ দশমিক ৯৭ শতাংশ।

২০১১-১২ অর্থবছরে বেসরকারি খাতে স্থাপিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা ছিল তিন হাজার ৫৮৩ মেগাওয়াট। সে অর্থবছর বেসরকারি খাত থেকে কেনা হয় এক হাজার ৮১৭ কোটি ৪৯ লাখ কিলোওয়াট ঘণ্টা বিদ্যুৎ। এতে ব্যয় হয় ১২ হাজার ৩০৪ কোটি ৩২ লাখ টাকা। এর মধ্যে ক্যাপাসিটি চার্জ ছিল পাঁচ হাজার এক কোটি ২৩ লাখ টাকা, যা মোট ব্যয়ের ৪০ দশমিক ৬৫ শতাংশ।

আর ২০১০-১১ অর্থবছরে বেসরকারি খাতে স্থাপিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা ছিল তিন হাজার ১৬২ মেগাওয়াট। সে অর্থবছর বেসরকারি খাত থেকে কেনা হয় এক হাজার ৪৮৪ কোটি ১৬ লাখ কিলোওয়াট ঘণ্টা বিদ্যুৎ। এতে ব্যয় হয় সাত হাজার ৫৭৭ কোটি ৭৯ লাখ টাকা। এর মধ্যে ক্যাপাসিটি চার্জ ছিল দুই হাজার ৭৮৩ কোটি ৫৬ লাখ টাকা, যা মোট ব্যয়ের ৩৬ দশমিক ৭৩ শতাংশ।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..