প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

এক বছরে ব্যাংকের বাইরে নগদ অর্থ বেড়েছে ২৭ শতাংশ

রোহান রাজিব: মানুষের হাতে নগদ অর্থ ধরে রাখার প্রবণতা দিন দিন বেড়ে চলেছে। গত এক বছরে ব্যাংক খাতের বাইরে মুদ্রার প্রবাহ বেড়েছে ২৭ দশমিক ২৭ শতাংশ। মানুষের হাতে মুদ্রার প্রভাব বেড়ে যাওয়ার ফলে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোয় তারল্য সংকট দেখা দিয়েছে। এ জন্য উদ্বৃত্ত তারল্য কমেছে ব্যাংক খাতের। এর বাইরে নগদ অর্থ বেড়ে যাচ্ছে। মূলত অনেকে অবৈধভাবে অর্জিত অর্থ ব্যাংকে রাখতে সাহস পাচ্ছেন না। কেউ কেউ নিজেদের কাছে টাকা ধরে রাখছে, যা দেশের অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর বলে মন্তব্য করেছেন ব্যাংকার ও অর্থনীতিবিদরা।

ব্যাংকার ও অর্থনীতিবিদরা বলেন, কভিড মহামারির সময় থেকে নগদ অর্থ হাতে রাখার প্রবণতা বেড়েছিল। কারণ মানুষ আতঙ্কে হাতের কাছে প্রয়োজনীয় অর্থ রেখেছে। তবে মহামারি চলে গেলেও নগদ অর্থ ঘরে রাখার প্রবণতা থেকে বের হতে পারেননি বেশির ভাগ মানুষ। কভিড-পরবর্তী সময়ে নতুন করে যুক্ত হয়েছে কয়েকটি ব্যাংকের সাম্প্রতিক আর্থিক কেলেঙ্কারি ও তারল্য সংকটের ঘটনা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন গণমাধ্যমে এ সংক্রান্ত নেতিবাচক খবর মানুষের মনে ব্যাংকের প্রতি অনাস্থা তৈরি করে। ফলে তারা ব্যাপক হারে ব্যাংক থেকে টাকা তুলে ঘরে জমা রাখেন বা অন্য কোথাও বিনিয়োগ করেছেন। তাই সার্বিকভাবে আগের তুলনায় মানুষের হাতে নগদ অর্থের পরিমাণ বেশি বেড়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২২ সাল শেষে ব্যাংক খাতের বাইরে বা মানুষের হাতে নগদ অর্থের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে দুই লাখ ৬৮ হাজার ১৮১ কোটি টাকায়, যা ২০২১ সাল শেষে ছিল দুই লাখ ১০ হাজার ৭২৩ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে মানুষের হাতে নগদ অর্থের পরিমাণ বেড়েছে ৫৭ হাজার ৪৫৮ কোটি টাকা বা ২৭ দশমিক ২৭ শতাংশ। ২০২২ সালের নভেম্বরের তুলনায় ডিসেম্বরে বেড়েছে ৬ দশমিক শূন্য দশমিক এক শতাংশ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি ও ব্যাংক খাতের নেতিবাচক খবরের কারণে মানুষের হাতে নগদ অর্থ বেড়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির ফলে মানুষের জিনিসপত্র কিনতে আগের চেয়ে বেশি টাকা লাগছে। তাই মানুষ বেশি টাকা হাতে রাখছেন। এছাড়া সম্প্রতি কিছু ব্যাংকের অনিয়মের খবর প্রকাশিত হওয়ার কারণে ব্যাংক খাতের ওপর আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে। ফলে মানুষ টাকা তুলে নিজেদের কাছে রাখছেন। এজন্য ব্যাংকিং খাতের বাইরে নগদ অর্থ প্রভাব বেড়েছে। এটা অর্থনীতির জন্য শুভ নয়। ব্যাংকের বাইরে নগদ অর্থ বাড়লে অর্থনীতিতে ক্ষতি হয়।

ব্যাংকিং সেবা অতীতের তুলনায় বেশি আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর হয়েছে। তার পরও দেশের অপ্রাতিষ্ঠানিক অর্থনীতির আকার কমিয়ে আনা সম্ভব হয়নি। ব্যাংকের বাইরে থাকা নগদ অর্থের পরিমাণ অনেক বেড়ে যাচ্ছে। অর্থনীতির নগদনির্ভরতা কমিয়ে আনা সম্ভব হলে হুন্ডিসহ অবৈধ অর্থ লেনদেন অনেক কঠিন হতো। অর্থের উৎস ও গন্তব্য সম্পর্কে জানা যেত। কিন্তু নগদ প্রবাহ কমানো সম্ভব না হওয়ায় সেটি সম্ভব হচ্ছে না। অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে হলে নগদনির্ভরতা কমাতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য মতে, ২০১৯ সাল শেষে ব্যাংক খাতের বাইরে নগদ অর্থ ছিল এক লাখ ৫৬ হাজার ৫৮৩ কোটি টাকা, যা ২০২০ সাল শেষে বেড়ে হয়েছে এক লাখ ৮৭ হাজার ৪৬২ কোটি টাকা। অর্থাৎ ২০১৯ সালের তুলনায় ২০২০ সালে নগদ অর্থের প্রবৃদ্ধি বেড়েছে ১৯ দশমিক ৭২ শতাংশ। আর ২০২০ সালের তুলনায় ২০২১ সালে এ বৃদ্ধির হার ছিল ১২ দশমিক ৪০ শতাংশ। ২০২১ সাল শেষে ব্যাংক খাতের বাইরে মানুষের হাত নগদ অর্থ ছিল দুই লাখ ১০ হাজার ৭২৩ কোটি টাকা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মো. হাবিবুর রহমান শেয়ার বিজেক বলেন, মানুষের ক্যাশ হোল্ডিংয়ের চাহিদা বাড়লে ব্যাংক খাতের বাইরে নগদ অর্থ বেড়ে যায়। সম্প্রতি মূল্যস্ফীতি অনেক বেড়েছে। তাই মানুষের বাড়তি খরচ হচ্ছে। বাড়তি খরচ মেটাতেই টাকা হাতে রাখছে। তবে এ টাকা ঘুরে ফিরে ব্যাংকেই যায়।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যে দেখা যায়, ব্যাংক খাতে ২০২২ সালে আমানতের প্রবৃদ্ধিও কমেছে। গত বছর আমানতের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৫ দশমিক ৬৬ শতাংশ। আর ঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল ৮ দশমিক এক শতাংশ। ফলে যে আমানত জমা হচ্ছে, তার চেয়ে বেশি ঋণ যাচ্ছে। ২০২১ সাল শেষে আমানতের প্রবৃদ্ধি ছিল ৯ দশমিক ২১ শতাংশ। আর ২০২০ সালে এ প্রবৃদ্ধি ছিল ১৩ দশমিক ৫ শতাংশ। এদিকে আমানতের প্রবৃদ্ধি কম হওয়ায় ব্যাংকগুলোয় তারল্য সংকট দেখা দিয়েছে। সংকটের ফলে উদ্বৃত্ত তারল্যে হাত দিয়েছে। এ জন্য গত এক বছরে উদ্বৃত্ত তারল্য কমেছে ৬৫ হাজার ৭৭৮ কোটি টাকা।

এ বিষয়ে অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান আনিস এ খান শেয়ার বিজকে বলেন, জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধির কারণে গ্রাম-গঞ্জের মানুষ যা উপার্জন করছেন, তা নিজেদের কাছে রাখছেন তাদের খরচ মেটাতে। ফলে ব্যাংকে টাকা আসছে না। এছাড়া ব্যাংক খাতের কিছু অনিয়ম-দুর্নীতির সংবাদের জন্য সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। এজন্য অনেকে ব্যাংক থেকে টাকা তুলে ঘরে রেখেছেন। ফলে ব্যাংক খাতের বাইরে মানুষের হাতে নগদ অর্থ বেড়েছে।

তিনি আরও বলেন, হুন্ডির জন্যও মানুষের হাতে নগদ অর্থ বাড়ে। কারণ হুন্ডিতে যেসব লেনদেন হয়, তা হাতে হাতেই হয়। তবে মানুষের হাতে নগদ অর্থ বেড়ে যাওয়া অর্থনীতির জন্য বড় ক্ষতি। ব্যাংকে টাকা রাখার প্রবণতা বাড়াতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন ডিজিটাল ব্যাংকিং। ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের অগ্রগতি আরও বাড়াতে হবে।