প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

এক বছরে সম্পদ বাড়িয়েছে তালিকাভুক্ত ১৮ প্রতিষ্ঠান

নাজমুল ইসলাম ফারুক: পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত বেশ কিছু কোম্পানি ব্যবসা সম্প্রসারণের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। মূলধনি যন্ত্রপাতি, জমি, ফ্লোর স্পেস ও অন্য জিনিসপত্র কেনার মাধ্যমে ১৮টি কোম্পানি জমি ও ফ্লোর গত এক বছরে তাদের সম্পদ বাড়িয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যেসব কোম্পানি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত, সেগুলোর মধ্যে ভালো প্রতিষ্ঠানই ঘোষণা দিয়ে সম্পদ কেনে। তাছাড়া কিছু কোম্পানি ঘোষণা না দিয়ে গোপনে সম্পদ বাড়ায়, যা মূল্য সংবেদনশীল তথ্য। এ তথ্য গোপন করে একটি চক্র শেয়ার বেচাকেনা করে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে হাতিয়ে নেয় অর্থ। তবে এসব তথ্য কোম্পানির পক্ষ থেকে আগে প্রকাশ করলে বিনিয়োগকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয় না।

তারা আরও বলেন, যেসব কোম্পানি সম্পদ বাড়িয়েছে, তা অবশ্যই কোম্পানি সম্প্রসারণ করে মুনাফা অর্জনে সহায়তা করবে। আর এসব কোম্পানির মুনাফার লভ্যাংশও পাবে বিনিয়োগকারীরা, যা পুঁজিবাজারের জন্য ইতিবাচক হবে।

এ সম্পর্কে ‘বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশন’-এর সাবেক সভাপতি এমএ হাফিজ শেয়ার বিজকে বলেন,  ‘যেসব কোম্পানি জমি কিনছে, তারা তাদের কোম্পানি সম্প্রসারণ করছে। এতে প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসা ভালো হবে, যার ফল পাবে বিনিয়োগকারীরা। আর এটা পুরো পুঁজিবাজারেই ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে’ বলে মনে করছেন তিনি।

তথ্যমতে, চলতি বছরের শুরুতে অলিম্পিক ইন্ডাস্ট্রিজ নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও কাঁচপুর ললাটি এলাকায় ২৯ দশমিক ৫০ শতক জমি কিনেছে। এতে খরচ হয়েছে ৭৯ লাখ ৮৫ হাজার টাকা। জুনে একই এলাকায় আরও ১০ দশমিক ৫০ শতক জমি কিনেছে কোম্পানিটি, যার  মূল্য ২৭ লাখ ৯৫ হাজার টাকা। গত আগস্টে আবারও জমি কেনার সিদ্ধান্ত নেয় প্রতিষ্ঠানটি। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ওই এলাকায় ৪৪ শতক জমি কিনবে প্রতিষ্ঠানটি। যার মূল্য তিন কোটি ১৮ লাখ ৫০ হাজার টাকা। একই সঙ্গে পাঁচ দশমিক ৫৯ শতক জমি কেনার কথা রয়েছে, যার মূল্য ৩০ লাখ ৭৫ হাজার টাকা।

এদিকে বছরের শুরুতে ফার কেমিক্যাল লিমিটেডের পর্ষদ নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে ২০০ ডেসিমেল জমি কেনার সিদ্ধান্ত নেয়। পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী কোম্পানিটি প্রথম পর্যায়ে ২৭ শতক জমি কিনেছে। রেজিস্ট্রেশন খরচসহ এ জমি কিনতে কোম্পানির ৪৬ লাখ ৯১ হাজার ১০০ টাকা খরচ হয়েছে। দ্বিতীয় পর্যায়ে ২০ দশমিক ১২ শতক জমি ৩৪ লাখ ৬৫ হাজার টাকায় কেনা হয়েছে। তৃতীয় পর্যায়ে প্রতিষ্ঠানটি ২৬ দশমিক ৬৪ শতক জমি ৪৮ লাখ ৪৭ হাজার ৭০০ টাকায় কিনেছে। চতুর্থ পর্যায়ে ৪০ শতক জমি ৬৮ লাখ ৮৮ হাজার ৪৮০ টাকায় কেনা হয়েছে। সর্বশেষ প্রতিষ্ঠানটি ৩৮ দশমিক ১২ ডেসিমেল জমি কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এতে খরচ হবে ৬৫ লাখ ৬৬ হাজার ৪৩০ টাকা।

শুধু অলিম্পিক ও ফার কেমিক্যাল নয়, ১৮টি কোম্পানি জমি ও ফ্ল্যাট কিনে তাদের সম্পদের পরিমাণ বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে অনেকে বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে। যেসব কোম্পানির সম্পদ বাড়িয়েছে, সেগুলোর মধ্যে আমান ফিড লিমিটেডের পরিচালনা পর্ষদ সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া ফ্যাক্টরির পাশের এলাকায় ১৩৮ ডেসিমেল জমি কিনেছে। আর এতে রেজিস্ট্রেশনসহ খরচ হয়েছে দুই কোটি ২১ লাখ টাকা। প্রতিষ্ঠানটি নভেম্বর মাসে শেষ সপ্তাহে আবারও ৬১ ডেসিমেল জমি কেনার ঘোষণা দিয়েছে। এদিকে ইউনিক হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টস লিমিটেড রাজধানীর উত্তরায় ৯ নম্বর সেক্টরে ৯ কাঠা ৭ ছটাক ৯ বর্গফুট বিল্ডিংসহ জমি ক্রয় করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যার ব্যয় ধরা হয়েছে ৩২ কোটি ৮৭ লাখ টাকা।

চামড়া খাতের এপেক্স ট্যানারি ৫২ লাখ টাকা ব্যয়ে সাভারে ১৫ ডেসিমেল জমি কিনে তাতে স্টাফদের ডরমেটরি নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

এদিকে আইটি খাতের কোম্পানি ইনটেক অনলাইন লিমিটেড ময়মনসিংহ জেলায় বলাদিপাড়া ও ইসলামপুর, কামারিয়া তারাকান্দায় জমি ৩০ একর জমি কিনবে। নিবন্ধন খরচ বাদে এসব জমির মূল্য ধরা হয়েছে দুই কোটি ৪০ লাখ টাকা। ন্যাশনাল ব্যাংক লিমিটেড গত এপ্রিল মাসে কুমিল্লা অফিসের জন্য পাঁচ হাজার ৫০০ বর্গফুটের ফ্লোর, রাজধানীর বসুন্ধরার জগন্নাথপুরে আট হাজার বর্গফুট ফ্লোট এবং চারটি কার পার্কিংয়ের জায়গা ৩২ কোটি ৪০ লাখ টাকায় ক্রয় করেছে, যা বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন নেওয়া হয় বলে জানা গেছে। এছাড়া গুলশানে পাঁচ হাজার ৪৫৭ বর্গফুট, নওয়াবপুর রোডে পাঁচ হাজার ৬০০ বর্গফুট ফ্লোর ক্রয় করে প্রতিষ্ঠানটি। এছাড়া ব্যাংকটি ঢাকায় ৫০টি ফ্ল্যাট  কেনার ঘোষণা দেয়। রাজধানীর ধানমণ্ডির ৮/এ সড়কে অবস্থিত ১৪ তলা ভবনটিতে প্রায় ৭৪ হাজার ৯৭০ বর্গফুট আয়তনের ফ্ল্যাটগুলো কিনতে মোট খরচ প্রায় ৫৫ কোটি ৪৮ লাখ টাকা।

সেন্ট্রাল ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি চট্টগ্রামে দুই হাজার ৫২৯ বর্গফুটের ফ্লোর কিনবে। প্রতি বর্গফুটের মূল্য ১৩ হাজার টাকা। কারপার্কিং স্পেসসহ যার মোট মূল্য দাঁড়ায় তিন কোটি ৩৪ লাখ টাকা।

বিমা খাতের কোম্পানি ইউনাইটেড ইন্স্যুরেন্স পরিচালনা পর্ষদ কার পার্কিংসহ অফিসের জন্য ছয় হাজার ৩৩৩ বর্গফুট জায়গা কিনবে। কোম্পানিটির জায়গা কিনতে প্রতি বর্গফুটে ১৫ হাজার ৪৩৫ টাকা করে খরচ পড়বে। এ হিসাবে কোম্পানিটির ভ্যাট, ট্যাক্স, রেজিস্ট্রেশন ও অন্যান্য খরচসহ মোট ব্যয় হবে ১০ কোটি টাকা। এছাড়া প্রতিষ্ঠানটি কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউয়ের ‘সেল রোজ এন ডেল’ ভবনের জায়গা কিনবে।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের কোম্পানি ডরিন পাওয়ার জেনারেশনস অ্যান্ড সিস্টেমের পরিচালনা পর্ষদ ১৩ ডেসিমেল জমি কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ জমি কিনতে রেজিট্রেশন খরচসহ ৩৮ লাখ ৯৮ হাজার ২০০ টাকা ব্যয় হবে।

বস্ত্র খাতের কোম্পানি স্কয়ার টেক্সটাইল লিমিটেড জমি কিনবে। একই সঙ্গে কোম্পানিটি বিএমআরই প্রকল্পেও কাজ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। জমি কেনার জন্য ২৫ কোটি টাকা অনুমোদন দেয় পর্ষদ। কোম্পানিটি ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য বিএমআরই প্রকল্প ও জমি কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। একই খাতের প্যারামাউন্ট টেক্সটাইলের পরিচালনা পর্ষদ মেশিনারিজ ক্রয় করার জন্য নতুন ব্র্যান্ডের মূলধন মেশিনারিজ ক্রয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কোম্পানিটি পূবালী ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে নতুন মেশিনারিজ কিনবে।  মেশিনটি হবে আফটার প্রিন্টেড ওয়াশিং মেশিন, যা নিট এবং ওভেন ফেব্রিক্সের জন্য সিলিন্ডার ড্রাইয়ার হিসেবে কাজ করবে। এ  মেশিনটি চীনের তৈরি। নতুন মেশিনটি কিনতে ১১ লাখ ৩০ হাজার মার্কিন ডলার ব্যয় করছে প্রতিষ্ঠানটি। এছাড়া বছরের বেশিরভাগ সময় বিভিন্ন মেশিনারিজ ক্রয় করেছে।

গোল্ডেন সন লিমিটেড চট্টগ্রামের আজিমপাড়ার পটিয়ায় কোম্পানির কারখানা পাশে চলতি বছর দুই বার জমি কিনেছে। এরমধ্যে ২৩৩ দশমিক ৫০ শতাংশ  পাঁচ কোটি  ৬২ লাখ ২৬ হাজার ৮০০ টাকায় কিনেছে এবং ১৮৩ দশমিক ৪০ ডেসিমেল জমি চার কোটি ৪১ লাখ ৬২ হাজার ৭২০ টাকায় ক্রয় করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তসরিফা ইন্ডাস্ট্রিজ গাজীপুরের শ্রীপুরে ৮১ দশমিক ৫০ ডেসিমেল জমি এক কোটি তিন লাখ টাকা। পপুলার লাইফ ইন্স্যুরেন্স চলতি বছর একাধিকবার জমি ক্রয় করেছে। ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড বছরের একাধিকবার জমি কিনেছে। এর মধ্যে রাজধানীর শাহআলীতে ৩৮১ দশমিক ৬৬ ডেসিমেল জমি সাত কোটি ২৪ লাখ ৫০ হাজার টাকায় কিনেছে। ব্যাংক এশিয়া, যমুনা ব্যাংক জমি ও অফিস ফ্লোর ক্রয় করেছে।