ফিচার

এক মর্মন্তুদ জীবনগাথা ঘানি

বর্তমান কথাসাহিত্যে এক ধরনের খরা চলছে বলা যায়। খরা এ কারণে নয় যে, সাহিত্য রচিত হচ্ছে না। বরং অন্য যে কোনো সময়ের চেয়ে বর্তমানে বই প্রকাশের সংখ্যা অনেক বেশি। জনপ্রিয় সাহিত্যেরও কমতি নেই। অনেক লেখকের লেখা পাঠক পড়ছে হুমড়ি খেয়ে। তবুও যেন খরা কাটছে না! যেসব বই জনপ্রিয় হচ্ছে, তা এক শ্রেণির পাঠককে আকৃষ্ট করতে পারলেও কোথায় যেন ঘাটতি রয়ে যাচ্ছে। একটি সাহিত্য স্বাদ ও মানে যে অনন্যতার দাবি রাখে, সে জায়গাটি যেন শূন্যই থেকে যাচ্ছে। সাহিত্যের যে নন্দন, যে উচ্চতা, যে জীবনবোধ, যে আঙ্গিক একটি সাহিত্যকে কালোত্তীর্ণ করে, সে জায়গাটি যেন অধরা রয়ে যাচ্ছে অধিকাংশ রচনায়। যিনি গল্প বলছেন, তিনি কেবল গল্পই বলছেন। কাহিনি বর্ণিত হচ্ছে কিন্তু সেই বর্ণনায় নান্দনিকতার যে আলোকচ্ছ্বটা, তা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ম্রিয়মান।

আবার কেউ কেউ গল্পের ধার না ধেরে গুচ্ছ শব্দসন্নিবেশে মহৎ সাহিত্য রচনায় উদ্যোগী হচ্ছেন। ইট-পাথরের দেয়ালের মতো শক্ত হচ্ছে সেসব রচনা। এর রস আস্বাদন হয়ে পড়ছে দুরূহ। সাহিত্য শুধু গল্প বা শুধু শব্দের বিচ্ছুরণ নয়। সাহিত্য হলো শব্দ ও গল্পের পরিমিত বুনন, যা ভেতরটা ছুঁয়ে যায় যেমন, একই সঙ্গে শব্দ ও ভাষার লালিত্যে একটি ঘোর তৈরি করে।

রবিউল করিম মৃদুলের উপন্যাস ‘ঘানি’ এ ঘোরের মধ্যে ফেলে দেয় পাঠককে। বর্তমান সাহিত্যধারা যখন সহজ প্রেম ও খেলো জীবনরীতির ওপর ভাসমান ছাউনি নির্মাণে ব্যস্ত, রবিউল করিম তখন অন্তরালে নিবিষ্ট হয়েছেন জীবনের মর্মমূলে আঘাত করতে। গল্পের বিষয়বস্তু নির্বাচন ও পরিমিত, প্রাঞ্জল ভাষাশৈলী তার রচনাকে শক্ত করছে শতবর্ষী বটবৃক্ষের মতো। এর ছায়ায় মেলে প্রচণ্ড দাবদাহের আশ্রয়। মেলে সুশীতল প্রশান্তির পরশ। এর আগে তার ‘জলপাই রঙের কোট’ উপন্যাসে যে অনন্য জীবন রচনা করেছিলেন, ‘ঘানি’ তাকেও ছাড়িয়ে গেছে। চুয়াত্তরের ভয়ংকর দুর্ভিক্ষের প্রেক্ষাপটে রচিত এ বই সমকালের যে কোনো রচনার চেয়ে স্বতন্ত্র। ৭৪ নিয়ে উল্লেখযোগ্য কোনো রচনা বাংলা সাহিত্যে অনুপস্থিত। সে শূন্যতা পূরণ করেছে ঘানি।

গল্পের শুরুটা হয়েছে ভয়াল ৭৪-এর খাঁখাঁ দুর্ভিক্ষের দিনে হাতেম আলী ও তার স্ত্রী হুসনে আরার এক মর্মভেদী পদযাত্রা দিয়ে। মর্মভেদী এ কারণে বলছি যে, প্রথম পরিচ্ছেদে এমন এক কাহিনির অবতারণা মৃদুল করেছেন, এমন এক রূঢ় বাস্তবতাকে হাজির করেছেন পাঠকের সামনে, যা মর্মমূলে আঘাত করে প্রচণ্ডভাবে। এও কী সম্ভব? পেটের ক্ষুধা, ভাগ্যের দুর্বিপাক এতটাই ভয়ংকর হয়? স্বামীর পাহারায় স্ত্রী গিয়ে শরীর দিয়ে আসে পরপুরুষকে? ঘানির শুরুটা হয়েছে এভাবেই।

ছোট্ট ছেলেটিকে কাঁধে নিয়ে হাতেম আলী ভাবলেশহীন জড় মানুষের মতো এগিয়ে চলছে ময়না মণ্ডলের আড়তঘরের দিকে। পেছনে স্ত্রী। আপাতত লাজুক, নরম স্বভাবের হুসনে আরা স্বামীর সঙ্গে চলছে সব লজ্জার আবরণ বিসর্জন দিয়ে নিজের সম্ভ্রম বিকিয়ে দিতে। টিকে থাকার জন্য এ-ছাড়া সামনে আর কোনো পথ নেই! এমনভাবে শুরু হয়েছে প্রথম অধ্যায় যে, কোনো ভূমিকা ছাড়াই এক ধাক্কায় পাঠককে ডুবিয়ে দেবে ভয়ানক দুর্ভিক্ষের করাল গ্রাসের ফেঁপে ওঠা বুদ্বুদের ভেতর। রীতিমতো অসহ্য মনে হবে, মন কিছুতেই মানতে চাইবে না। এ যে অসম্ভব!

প্রথম অধ্যায় শেষে যখন সহ্যসীমার মাপজোখ করতে ব্যস্ত পাঠক, ততক্ষণে মাখনের মতো নরম শব্দমালা নিয়ে হাজির হবে দ্বিতীয় অধ্যায়। কাচের গ্লাসে রাখা পানির মতো স্বচ্ছ কথার বুনন: বাড়ছে একাদশী রাত। একটু একটু করে সমস্ত চরাচরজুড়ে বিছিয়ে দিচ্ছে তার আবছায়া আলোর চাদর। আবছায়া এ কারণে যে, আকাশের বুকজুড়ে সূর্যমুখী ফুলের মতো ফুটে আছে যৌবনের প্রারম্ভে দাঁড়িয়ে থাকা একাদশী চাঁদ। ফিনকি দিয়ে ফুটছে জ্যোৎস্না চারিধারে। রাতের নরম বাতাসে মিশে যাচ্ছে সেই জ্যোৎস্নার সৌরভ। ছড়িয়ে পড়ছে বাঁশবন, বেতঝাড় আর শিমুলের ডালে। দুর্বাঘাসের ডগার ওপর ঝরে পড়ছে থোকা থোকা জোছনাধারা। ঘাঘট নদীর জলের ঢেউয়ের নরম শরীর ছুঁয়ে ছুঁয়ে ছুটে যাচ্ছে উত্তর থেকে দক্ষিণে। অদ্ভুত মোহময়তায় গ্রাস করে নিচ্ছে যেন পৃথিবী।

এ পর্বে হাজির হয় শাহানা। গল্পের কেন্দ্রীয় এক নারী চরিত্র। তার কিশোরী মনে প্রাণোš§ুখ সময় ধরা দেয় বহুরূপ বিচিত্রতা নিয়ে। সামনে আসে জহির। আসেন শাহানার মা মনোয়ারা বেগম। একটু আগে যে বিভীষিকাময় গল্পের পরিচয় পেয়েছে পাঠক, এখানে ঠিক তার বিপরীত। এখানে জীবন সুন্দর। নারী-পুরুষের চিরায়ত প্রেম ও প্রণয়ের প্রারম্ভিকা এ পর্বে। এরপর আবার ৭৪। দৃশ্যপটে এবার নতুন চরিত্র রইস! গভীর রাতে এক জনমানবহীন স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে পেটের ক্ষুধায় কাতর হয়ে গগনবিদারী চিৎকারে রাতের নীরবতা ভেঙে খান খান করে দিচ্ছে যে জাহান পাগলি, তার সন্ধানে আলোবিহীন টর্চ হাতে বেরোয় রইস। তিনটি ভিন্ন অবস্থানে গল্প শুরু হয়ে চতুর্থ অধ্যায় থেকে এগিয়ে যায় দুটি সরলরেখায়।

একদিকে শাহানা ও জহির, অন্যদিকে কাজের সন্ধানে ঘরছাড়া লেদকর্মী রইস। একটু একটু করে পরিণত হয় চরিত্ররা, সময় এগিয়ে যায়। সময়ের পরিক্রমায় সারা দেশের মতো রংপুরের বিস্তৃত অঞ্চলে হানা দেয় ৭১! জনপদে লাগে যুদ্ধের ঢেউ। জীবন থেমে থাকে না। প্রেম আসে, আসে বিরহও। একের পর এক দৃশ্যপট রচিত হয় অনন্যসাধারণ পারদর্শিতায়। গল্প এগিয়ে চলে। গোখরা সাপের মতো বিষাক্ত নিঃশ্বাস নিয়ে হা করে এগিয়ে আসে দুর্ভিক্ষ। এ পর্বে একটু একটু করে যেন শ্বাস বন্ধ হয়ে আসতে চাইবে পাঠকের। এ কী জীবন মানুষের! এ কী দিন কাটিয়েছে বাপ-দাদার প্রজন্ম! এত কষ্ট, এত দারিদ্র্য, এত ক্ষুধা! এত নির্মমতা সময়ের! পেটের ক্ষুধা মেটাতে টাকার বিনিময়ে জন্মদাতা পিতা নিজ কন্যাকে বন্ধক দেন বিত্তশালী মহাজনের হাতে! অনাহারে মৃত শিশুর লাশ দাফন না করে তা বুকে জড়িয়ে রাখতে চান বাবা-মা লাশ দেখিয়ে দুটি পয়সা তুলবে বলে!

এসব আখ্যান ছত্রের পর ছত্র রচনা করেছেন মৃদুল দক্ষ চিত্রকরের মতো। ফুটিয়ে তুলেছেন জীবনের নানা টানাপড়েন, দ্বন্দ্ব-লড়াই। ক্ষুধার বিরুদ্ধে লড়াই করে টিকে থাকার প্রবল লড়াই। একেকটি চরিত্র এমনভাবে তিনি মেলে ধরেছেন, এমনভাবে একেকজনকে আঙ্গিক দিয়েছেন, যেন চরিত্রগুলো তার হাতের পুতুল। তবে সবাই জীবন্ত, যার যার গুণ ও বৈশিষ্ট্যে একে অপরের চেয়ে ভিন্ন।

‘ঘানি’র সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো এর ভাষা। মৃদুলের বর্ণনার রীতি ও ভাষার গাঁথুনি ঝরঝরে। উপমার ব্যবহার, শব্দ নির্বাচন ও অনুভূতির নির্মাণ চিত্তাকর্ষক। মূল গল্প একই কেন্দ্র ধরে আগালেও অনেক ছোট ঘটনার সন্নিবেশ ঘটেছে ঘানিতে; যা একটি রচনা হিসেবে একে করেছে আরও বৈচিত্র্যময়। বহু চরিত্রের সমাবেশ ঘটেছে এখানে। পরিসর বিরাট বিস্তৃত।

রংপুর অঞ্চলের মানুষের জীবন ও প্রকৃতি জীবন্ত হয়ে ধরা দিয়েছে এ উপন্যাসে। স্থানীয়দের বহুমাত্রিক ভাষার ব্যবহার ঘানিকে তুলে এনেছে আরেকটু ওপরে। চাইলে মৃদুল প্রমিত ভাষায় চরিত্রের সংলাপ রচনা করতে পারতেন। বরং এটাই তার জন্য সহজ ছিল। তা না করে তিনি চরিত্রগুলোকে কথা বলিয়েছেন রংপুরের স্থানীয় ভাষায়। ‘ময়না না গয়না মণ্ডল, অর কাছোত গেইলে টেকার অভাব নাই। চাইল চাবু, ডাইল চাবু, সব দিবে। নগদ টেকাও দিবে। ঘণ্টা খানেকেরে তো কাজ! ওইলা কি আর গাওত লাগি থাকবে? আসি পুকুরোত এক ঝাঁপ দিয়া উঠলে কোণ্ঠে চলি যাইবে সব! মরদ মানুষ সৌগগুলায় তো এক!’ আখতারুজ্জামান ইলিয়াস যেমন খোয়াবনামায় কথা বলিয়েছেন বগুড়ার মানুষকে।

ঘানির চরিত্রগুলোর মধ্যে শাহানা, জহির, হুসনে আরা, হাতেম আলী, মঞ্জু মাস্টার, শাহানার মেয়ে রুনু, এমনি বুড়ি, জাহান পাগলিরা প্রধান। প্রতিটি চরিত্র নির্মাণে লেখকের বিশেষ যত্ন লক্ষণীয়। বিশেষ করে হুসনে আরার কথা বলা যায়। সহজ-সাধারণ নরম-সরম এক গৃহবধূ হুসনে আরা। যেভাবে সে সাধারণ থেকে অসাধারণ হয়ে ওঠে ধীরে ধীরে, তা অনন্য। সেদিক বিবেচনায় প্রথম দিকে প্রবল দীপ্তি নিয়ে হাজির হওয়া শাহানাই যেন একটু ম্লান হয়ে আসে দ্বিতীয় পর্বে। মূল আলো শাহানার ওপর থেকে সরে গিয়ে হুসনে আরার ওপর পড়ে। জহিরের চরিত্রের দোদুল্যমান দশা, হাতেম আলীর সরলতা, জাহান পাগলির পৌরাণিক উপস্থিতি ঘানির চরিত্রগুলোকে বিশেষভাবে মহিমান্বিত করে। আরেকজনের কথা বলতে হয়, বিশেষ করে তিনি মঞ্জু মাস্টার। খুব অল্প অংশজুড়ে তার উপস্থিতি, তবে যে উম্মোচন হয় তার জীবনের, তা বহুক্ষণ ধরে পাঠককে ব্যথিত করে রাখে।

সমকালীন বাংলা সাহিত্যে মৃদুল আসছেন শক্ত জায়গা করতে। আগমনের বার্তাটি দিয়েছিলেন তিনি তার উপন্যাস ‘এখানে আকাশ নীল’ দিয়ে। জলপাই রঙের কোট সে জায়গাটিকে পোক্ত করেছে আরও খানিকটা। এবার এলো ঘানি। সমকালের লেখকরা যেখানে প্রেম প্রেম খেলায় ব্যস্ত, মৃদুল তখন বেছে নিয়েছেন ৭৪-এর মতো শক্ত প্রেক্ষাপট। ইতিহাসের প্রতি, ফেলে আসা সময়ের প্রতি রয়েছে যেন তার আলাদা একটি দায়। নানা আঙ্গিকে প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছেন শাসন ও ক্ষমতাযন্ত্রের দিকে। নিঃসন্দেহে বিরাট সাহসী কাজ এটি। মৃদুলের শক্তি তার আনকোরা গল্প ও ভাষার বুনন। ঘানি সে গল্প ও ভাষার বুননের এক অনন্য দলিল।

প্রচ্ছদ এঁকেছেন চারু পিন্টু। ছেপেছে শুদ্ধ প্রকাশ। পাওয়া যাচ্ছে ৭০২ নং স্টলে। দাম ৫৩৫ টাকা।

 রাসেল মাহমুদ

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..