দিনের খবর প্রথম পাতা

এক মাসে মেট্রোরেল প্রকল্পের ২১৯ কর্মী কভিডে আক্রান্ত

নির্মাণকাজ ব্যাহত

ইসমাইল আলী: করোনার দ্বিতীয় ঢেউ বাংলাদেশে শুরু হয় মার্চের শেষ দিকে। এপ্রিলে তা ব্যাপক আকার ধারণ করে। সে সময় দৈনিক কভিড শনাক্ত সাত হাজার অতিক্রম করেছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতে ৫ এপ্রিল থেকে সীমিত আকারে ও ১৪ এপ্রিল থেকে চলাচলের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। তবে করোনার মাঝেও মেট্রোরেলের নির্মাণকাজ অব্যাহত ছিল। এতে এপ্রিলে মেট্রোরেল-সংশ্লিষ্ট ২১৯ জন কভিডে আক্রান্ত হন।

মেট্রোরেলের সর্বশেষ অগ্রগতি প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। তবে সংক্রমণ প্রতিরোধে নানা ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে মেট্রোরেল নির্মাণকারী কর্তৃপক্ষ ঢাকা গণপরিবহন কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল)। এর মধ্যে ২৫ জনের কর্মীদের গ্রুপকে ১০ জনে নামিয়ে আনা। আর মেট্রোরেলের কর্মীদের জন্য নির্মিত ফিল্ড হাসপাতাল দুটিতে শয্যা বৃদ্ধির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

বর্তমানে প্রকল্পটিতে প্রায় সাত হাজার দেশি-বিদেশি কর্মী রয়েছেন। তাই সে অনুপাতে সংক্রমণকে খুব বেশি বলে মনে করছেন প্রকল্প-সংশ্লিষ্টরা। তবে করোনা আক্রান্তের প্রভাবে মেট্রোরেল বাস্তবায়নে গতি কিছুটা কমে গেছে।

সূত্রমতে, গত বছর মার্চে প্রথম দেশে করোনা সংক্রমণ ধরা পরে। এরপর মেট্রোরেলের মাঠ পর্যায়ের কাজ প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। দেশ ত্যাগ করেন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের জাপান ও ইতালির প্রকৌশলীরা। তবে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে গত আগস্টে তারা আবার ফিরতে শুরু করেন। আর গত অক্টোবর পর্যন্ত মেট্রোরেল প্রকল্পে করোনা আক্রান্ত কর্মীর সংখ্যা ছিল ২৯৭ জন।

এর পরের দুই মাসে (নভেম্বর ও ডিসেম্বর) কভিডে আক্রান্ত হন প্রকল্প সংশ্লিষ্ট যথাক্রমে ২৫ ও ১৫ জন। এতে ডিসেম্বর শেষে মেট্রোরেল প্রকল্পের করোনা আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়ায় ৩২১ জন।

চলতি বছর জানুয়ারি মাসে মেট্রোরেলের আরও ২১ কর্মী আক্রান্ত হন। ফেব্রুয়ারিতে না কমে দাঁড়ায় মাত্র দুজন। তবে মার্চে আক্রান্ত বেড়ে যায়। ওই মাসে ৮৭ জন করোনায় আক্রান্ত হন। আর এপ্রিল মাসে রেকর্ড ২১৯ জন করোনা আক্রান্ত হন মেট্রোরেল প্রকল্পে। এতে সব মিলিয়ে এপ্রিল পর্যন্ত করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন ৬৬১ জন। যদিও প্রকল্পটির কেউ করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যাননি।

জানতে চাইলে ডিএমটিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এমএএন ছিদ্দিক শেয়ার বিজকে বলেন, ‘এবারের করোনার ব্যাপকতা বুঝতে বুঝতে কিছু কর্মী আক্রান্ত হয়েছেন। একটি গ্রুপের প্রায় সব কর্মী আক্রান্ত হওয়ার পর দ্রুত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। আগে একটি গ্রুপে ২৫ জন করে কাজ করলেও বর্তমানে তা ১০ জনে নামিয়ে আনা হয়েছে, যাতে বেশি সংখ্যক কর্মী আক্রান্ত না হন। পাশাপাশি আরও কিছু ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।’

তথ্যমতে, করোনা আক্রান্ত মেট্রোরেলের কর্মীদের চিকিৎসার জন্য গাবতলী কনস্ট্রাকশন ইয়ার্ডে ১০ শয্যা ও উত্তরার পঞ্চবটি ইয়ার্ডে ১৪ শয্যার দুটি ফিল্ড হাসপাতাল নির্মাণ করেছে ডিএমটিসিএল। এছাড়া মেট্রোরেলের নির্মাণকাজে নিয়োজিত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের জনবলের নিরাপদ অবস্থানের জন্য নির্মাণস্থলের সন্নিকটে আবাসিক স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রকল্পটির দেশি জনবলকে ভ্যাকসিন দেয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এছাড়া বিদেশি জনবলের জন্য ভ্যাকসিনের ব্যবস্থা করতে ৭ এপ্রিল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেয়া হয়েছে।

এদিকে করোনার প্রভাবে মেট্রোরেলের বাস্তবায়নে গতি কিছুটা কমেছে। এপ্রিল শেষে প্রকল্পটির অগ্রগতি দাঁড়িয়েছে ৫৯ দশমিক ৭৮ শতাংশ। মার্চ শেষে এ হার ছিল ৫৭ দশমিক ৬৮ শতাংশ। অর্থাৎ এক মাসে অগ্রগতি দুই দশমিক ১০ শতাংশ। যদিও এর আগের দুই মাসে প্রকল্পটির কাজ হয় তিন শতাংশেরও বেশি হারে।

তথ্যমতে, উত্তরা-মতিঝিল রুটে নির্মাণাধীন মেট্রোরেলের দৈর্ঘ্য ২০ দশমিক ১০ কিলোমিটার। এর মধ্যে ১৪ দশমিক ৪১ কিলোমিটার ভায়াডাক্ট (উড়ালপথ) স্থাপন সম্পন্ন হয়েছে। আর উত্তরা-আগারগাঁও অংশের অগ্রগতি ৮৪ দশমিক ৭৯ শতাংশ এবং আগারগাঁও থেকে মতিঝিল অংশের অগ্রগতি ৫৯ দশমিক ৭৮ শতাংশ।

এছাড়া মেট্রোরেলের প্রথম সেট (ছয় কোচ) দেশে এসে পৌঁছেছে। বর্তমানে তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা (কমিশনিং) করা হচ্ছে। এরপর ট্রায়াল রান হবে। তবে মেট্রোরেল ঠিক কবে নাগাদ উদ্বোধন করা হবে তা চূড়ান্ত হয়নি। এ প্যাকেজের অগ্রগতি ৪২ দশমিক ৬০ শতাংশ। আর ডিপো ইক্যুইপমেন্ট এবং অন্যান্য ইলেকট্রিক্যাল ও মেকানিক্যাল সিস্টেম স্থাপনের অগ্রগতি ৬৯ দশমিক ২৩ শতাংশ।

এমএএন ছিদ্দিক এ প্রসঙ্গে বলেন, মেট্রোরেলের ট্রেনের ট্রায়াল রান শুরু করতে হলে ন্যূনতম তিনটি স্টেশন প্রস্তুত করে রাখা দরকার। সেখানে এরই মধ্যে পাঁচটি স্টেশন প্রস্তুত। ডিপো এলাকায় ট্রেনগুলো রাখা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্যও পর্যাপ্ত অবকাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে। তবে ট্রেন কবে উদ্বোধন করা হবে তার কোনো সম্ভাব্য তারিখ এখনও চূড়ান্ত করা হয়নি।

তিনি আরও বলেন, মেট্রোরেল কমিশনিংয়ের পর ট্রায়াল রান করা হবে। এরপর উদ্বোধনের তারিখ নির্ধারণ করা হবে। তবে এখনই এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করা সম্ভব নয়।

উল্লেখ্য, মেট্রোরেল প্রকল্পটি অনুমোদন করা হয় ২০১২ সালে। তবে নকশা প্রণয়ন শেষে মূল কাজ শুরু হয় ২০১৬ সালের জুনে। প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ২১ হাজার ৯৮৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১৬ হাজার ৫৯৫ কোটি টাকা দিচ্ছে জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (জাইকা) ও ৫ হাজার ৩৯০ কোটি টাকা বাংলাদেশ সরকারের। তবে প্রাথমিকভাবে উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত নির্মাণের কথা থাকলেও পরবর্তী সময়ে তা কমলাপুর পর্যন্ত সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..