প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

এক হাজার বড় গ্রাহকের ২৫% খেলাপি: বিআইবিএম

নিজস্ব প্রতিবেদক: পুনঃতফসিল, পুনর্গঠন ও রাইট-অফারের সুযোগ যদি না থাকতো, তাহলে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের খেলাপি ঋণের চিত্র আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতো। কারণ বাংলাদেশের ১ হাজার শীর্ষ গ্রহীতার ২৫ শতাংশই ঋণখেলাপি।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম) আয়োজিত ব্যাংকিং কনফারেন্সের মূল বক্তব্যে এ তথ্য উঠে এসেছে।

গতকাল রোববার প্রধান অতিথি হিসেবে ব্যাংকিং কনফারেন্স ২০১৬-এর উদ্বোধন করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবীর। প্রথম দিনে ব্যাংকিং খাতের সার্বিক পরিস্থিতির ওপর ১২টি গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়। এছাড়া মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিআইবিএমের মহাপরিচালক তৌফিক আহমেদ চৌধুরী। এতে ব্যাংকিং খাতের ঋণ পরিস্থিতি, ব্যবসায়ে সেবা, আইসিটি, আইসিসি, এইচআর ও ইসলামিক ফাইন্যান্স নিয়ে আলোচনা করা হয়।

মূল প্রবন্ধে বলা হয়, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে রাইট-অফ, পুনঃতফসিল ও পুনর্গঠন সুবিধা যদি না দেওয়া হতো, তাহলে এটি আরও খারাপ অবস্থানে চলে যেত, যে পরিস্থিতিকে ‘শকিং সিনারিও’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ১ হাজার শীর্ষ গ্রহীতার মধ্যে ২৫ শতাংশই এখন খেলাপি ঋণে পরিণত হয়েছে। গত পাঁচ বছরে বড় অংকের ঋণের প্রায় ৩৮ শতাংশ রাইট-অফ করা হয়েছে।

মূল প্রবন্ধে আরও বলা হয়, ব্যাংকগুলোর আইসিটিতে দৃশ্যত কোনো পরিবর্তন আসেনি। দক্ষতা উন্নয়ন, ব্যবসার পরিকল্পনা, আইটি অডিট কোনো জায়গাতেই পরিবর্তন আসেনি। এখনও ১২ শতাংশ ব্যাংক অবকাঠামো উন্নয়নের ক্যাটাগরি-১-এর ধারেকাছেও নেই। আইটি খাতের ব্যাংকগুলোর মোট বাজেটের মাত্র ৩ শতাংশ ব্যয় করা হয় দক্ষতা উন্নয়নে। এছাড়া ব্যাংকগুলোর মানবসম্পদ বিভাগের (এইচআরডি) সমালোচনা করে বলা হয়, একটি ব্যাংকের সার্বিক বিষয়ে অডিটের ব্যবস্থা থাকলেও এখনও ৮০ শতাংশ ব্যাংক তাদের এইচআরডি বিভাগের ওপর কোনো  প্র্যাকটিসটিই তাদের নেই।

খেলাপি ঋণের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক ইয়াসিন আলী বলেন, ‘বর্তমানে ব্যাংকগুলো নির্দিষ্ট কিছু গ্রাহকের পেছন পেছন ঘুরছে। কোনো কোনো গ্রুপের হাতে এখন ১৫-২০ হাজার কোটি টাকা রয়েছে, যারা কোনো কারণে সমস্যায় পড়লে সার্বিকভাবে ৫-৬টি ব্যাংক একেবারে ধসে পড়বে।’

খেলাপি ঋণের মামলার বিচার দ্রুত শেষ করা ও ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের তালিকা প্রকাশের ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, এতে করে ঋণখেলাপিরা সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন হবেন। এ ধরনের পদক্ষেপ না নিলে এটা বড় ধরনের কালচারে পরিণত হয়ে যাবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

এদিকে ‘বাংলাদেশে নতুন বাণিজ্যিক ব্যাংকের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে কি না’ এমন একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, গবেষণায় অংশ নেওয়া শতকরা ৮৮ ভাগই দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে নতুন বাণিজ্যিক ব্যাংক খোলার বিষয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করেছেন। বিভিন্ন ব্যাংকে কর্মরত রয়েছেন এদের মধ্য থেকে ৭৫ ভাগ এবং গ্রাহকদের ভেতর থেকে ৯২ ভাগ মনে করেন যে, বাংলাদেশে নতুন একটি ব্যাংক খোলার চেয়ে শাখার সংখ্যা বাড়ানোই ভালো। এর কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে বর্তমানে নতুন একটি ব্যাংক খোলার পরিস্থিতি নেই। কারণ যারা বর্তমানে কার্যক্রম পরিচালনা করছে, তারা তাদের শতভাগ সক্ষমতা কাজে লাগাতে পারছে না। এর জন্য দিন দিন ব্যাংকগুলোতে তারল্যের পরিমাণ বেড়েই চলেছে। সবমিলিয়ে কিছু ব্যাংক বেঁচে থাকার জন্য নিয়মিত যুদ্ধ করছে।

এদিকে ‘গ্রাহকের সেবার মান’ নিয়ে অপর একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, কাস্টমার ঋণ নেওয়ার সময় তাদের যে সুদহার ধার্য করা হয়, দুই মাস পর সেটা বেড়ে যায়। ছয় মাস পর তা আবার বেড়ে যায়। যার কোনোটাই গ্রাহক জানতে পারে না। যখন তার কিস্তি শেষ দিয়ে আসে, তখন ব্যাংক জানায় গ্রাহকের কাছ থেকে সে আরও বেশি টাকা পাবে। কিন্তু কী কারণে পাবে, তা বলে না। ফলে দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। পরে কেউ বাংলাদেশ ব্যাংকে অভিযোগ করলে সেটা নির্দেশ দিয়ে ঠিকঠাক করানো হয়। এছাড়া বিভিন্ন গোপন চার্জে গ্রাহকরা নানা ধরনের ভোগান্তির শিকার হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে। কিছু কিছু ব্যাংক চেক এক গ্যারান্টিতেও ঋণ বিতরণ কমর, যার কড়া সমালোচনা করা হয়েছে এতে।

এসব বিষয়ে ব্যাংক এশিয়ার প্রেসিডেন্ট ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আরফান আলী বলেন, ‘নতুন করে শাখা বাড়ানো যেতে পারে, কোনো অসুবিধা নেই; কিন্তু এখন মনে হয় নতুন ব্যাংক বাড়ানোর মতো পরিস্থিতি বাংলাদেশে নেই। কারণ নতুন কিছু ব্যাংক কাজ করছে। যাদের অনেকের অবস্থা কিছুদিন পর আপনারাই দেখতে পাবেন। কারণ এগুলো পুরোনো ব্যাংকগুলোর মতো নির্দিষ্ট কিছু গ্রাহকের পেছনেই ঘুরঘুর করছে। অর্থাৎ নতুন ব্যাংক পুরোনো নীতি। গতানুগতিক ব্যাংকগুলোর মতো তারাও শুধু উচ্চ প্রফিট টার্গেট নিয়েই ঘুরে বেড়াচ্ছে। বাংলাদেশের ব্যাংকগুলো একটি ‘ডেঞ্জারাস গেম’ খেলে যাচ্ছে। যার ফলে ব্যাংকিং খাতের ঋণের প্রায় ৭০ শতাংশই ঢাকা ও চট্টগ্রামের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে বলেও জানান তিনি। আর ‘গ্রাহক হয়রানি’র বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা শুধু পয়সার দিকেই নজর দিই; কিন্তু যার কাছ থেকে পয়সা আসে, তাদের দেখার সময় আমাদের নেই।’