প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

এখনও ধাক্কা সামলাতে পারেনি বেসিক ব্যাংক

জয়নাল আবেদিন: অনিয়ম-দুর্নীতির ধাক্কা এখনও সামলাতে পারেনি রাষ্ট্রায়ত্ত বেসিক ব্যাংক। ২০১৩ সালের পর এখন পর্যন্ত ব্যাংকটি লোকসানের বৃত্তে ঘুরপাক খাচ্ছে। ২০০৮ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত বেপরোয়া লুটপাটের কারণে ব্যাংকটির আজ এ দুর্দশা বলে মত বিশ্লেষকদের। লোকসানের এ ধারা কতদিন অব্যাহত থাকবে, তা এখনও অজানা। ২০১২ সালে জালিয়াতি করার মাধ্যমে বেসিক ব্যাংকের সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করার ঘটনা ধরা পড়ে। এর পর থেকে সবল ব্যাংকটি দুর্বল হতে থাকে। সে দুর্বলতা এখনও ব্যাংকটি কাটিয়ে উঠতে পারেনি। দুর্বলতা কাটাতে বেসিক ব্যাংককে সরকারের কাছ থেকে তিন হাজার ৩৯০ কোটি টাকা দেয়া হয়। তাতেও দুর্বলতা কাটেনি। তবে এখন মূলধন জোগান বন্ধ করে দিয়েছে সরকার।

এ পর্যায়ে যারা জালিয়াতি করে ঋণ নিয়েছে এবং ব্যাংকের কাছে তাদের বন্ধকি সম্পদ রয়েছে, সেগুলোকে শনাক্ত করা হয়েছে। এসব সম্পদ ব্যাংক নিলাম করে বিক্রি করে টাকা আদায় করবে। এতে ঋণের টাকা আদায় না হলে গ্রাহকের অন্য সম্পদ বিক্রি করে টাকা আদায়ের পদক্ষেপ নেয়া হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক বেসিক ব্যাংকের এ প্রক্রিয়াকে সমর্থন করেছে। প্রচলিত অর্থঋণ আদালত আইন অনুযায়ী কোনো গ্রাহক মন্দ মানে ঋণখেলাপি হলে শুধু নোটিস দিয়ে ও পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের মাধ্যমে কোনো মামলা ছাড়াই বন্ধকি সম্পদ বিক্রি করতে পারে। এতে ঋণের টাকা আদায় না হলে গ্রাহকের অন্যসব সম্পদ নিলাম করার জন্য মামলা করতে পারে। বেসিক ব্যাংক এখন এসব প্রক্রিয়ার দিকে যাচ্ছে।

আর্থিক কেলেঙ্কারি ও দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে ২০২১ সালে নিট লোকসানের সম্মুখীন হয়েছে ৯টি ব্যাংক। এ ৯টি ব্যাংক হলো-জনতা ব্যাংক, পদ্মা ব্যাংক, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক, বেসিক ব্যাংক, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক, আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক, বেঙ্গল কমার্শিয়াল ব্যাংক এবং পাকিস্তানের হাবিব ব্যাংক। এর মধ্যে রয়েছে চারটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক। ব্যাংকগুলোর নিট লোকসানের জন্য উচ্চ খেলাপি ঋণ, দুর্নীতি, তহবিল আত্মসাৎকারীদের দায়মুক্তির সংস্কৃতি এবং ঋণ মঞ্জুরিতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপকে দায়ী বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সাল শেষে বেসিক ব্যাংকের মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ সাত হাজার ৮৪৯ কোটি টাকা, যা বিতরণকৃত মোট ঋণের ৫৫ শতাংশ। অন্যদিকে ২০২১ সালে ব্যাংকটির লোকসানের পরিমাণ ছিল ৩৯০ কোটি টাকা, ২০২০ সালে ৩৬৬ কোটি টাকা, ২০১৯ সালে ১১৮ কোটি টাকা এবং ২০১৮ সালে ১২০ কোটি টাকা।

এ বিষয়ে বেসিক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আনিসুর রহমান বলেন, খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধারের গতি না বাড়ালে নিট লোকসান আরও অনেক বাড়ত। আমরা লোকসান কমাতে সর্বাত্মক চেষ্টা করছি। বিশেষ করে খেলাপি ঋণ আদায়ে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিচ্ছি আমরা। বিশেষ সুবিধায় দুই শতাংশ ডাউন পেমেন্টে যার ঋণ পুনঃতফসিল করা হয়েছিল, সেগুলো আবার খেলাপি হয়ে যাচ্ছে। তাই খেলাপির ওপর আবার চাপ সৃষ্টি হয়েছে। তবে ব্যাংকটির ঘুরে দাঁড়ানোর বিষয়ে আমি আশাবাদী।

তিনি বলেন, ‘চলতি বছরের প্রথম চার মাসে (জানুয়ারি-এপ্রিল) বেসিক ব্যাংকের লোকসানের পরিমাণ কমে ৫ কোটি টাকাতে নেমে এসেছে। কিন্তু আগের বছরের একই সময়ে এই লোকসানের পরিমাণ ছিল ১৮৪ কোটি টাকা। সুতরাং ধীরে ধীরে আমরা মুনাফার দিকে এগোচ্ছি।’

অনিয়মের মাধ্যমে এই ব্যাংক থেকে অন্তত চার হাজার ৫০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার ঘটনায় সাবেক চেয়ারম্যান শেখ আবদুল হাই বাচ্চুসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও বোর্ড সদস্যদের জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। ২০০৯ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত বেসিক ব্যাংকের গুলশান, দিলকুশা ও শান্তিনগর শাখা থেকে মোট সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকার ঋণ অনিয়মের মাধ্যমে বিতরণের অভিযোগ ওঠার পরপরই অনুসন্ধানে নামে দুদক। ঋণপত্র যাচাই না করে জামানত ছাড়া, জাল দলিলে ভুয়া ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে ঋণদানসহ নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে বিধিবহির্ভূতভাবে ঋণ অনুমোদনের অভিযোগ ওঠে ব্যাংকটির তৎকালীন পরিচালনা পর্ষদের বিরুদ্ধে।

ব্যাংকের ঋণগ্রহীতাদের মধ্যে কয়েকজন এলসি খুলে ঋণের টাকা বিদেশে পাচার করেছেন। এমন পাঁচ-ছয়জন আছেন বিদেশে। তারা দেশে আসছেন না, ঋণও শোধ করছেন না। তাদের টাকা আদায়ে বিকল্প পথে এগোনো হচ্ছে। বিএফআইইউর মাধ্যমে তাদের ব্যাপারে অনুসন্ধান করা হচ্ছে।

এদিকে আমানত বাড়াতে নতুন বছরে নানা উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। চালু করা হয়েছে নতুন ও ব্যতিক্রমী সঞ্চয় প্রকল্প। এর মধ্যে আছে বেসিক ব্যাংক স্কুল ব্যাংকিং হিসাব, তৈরি পোশাক ও চামড়াশিল্পে কর্মীদের সঞ্চয়ী হিসাব, কৃষক সঞ্চয়ী হিসাব, তৃণমূল সঞ্চয়ী হিসাব, গাড়ির চালক ও ড্রাইভারদের জন্য চলন্তিকা সঞ্চয়ী হিসাব, মুক্তিযোদ্ধা সঞ্চয়ী হিসাব এবং পথশিশুদের জন্য পথপুষ্প সঞ্চয়ী হিসাব।

প্রায় পাঁচ বছর অনুসন্ধান শেষে এ ঘটনায় ২০১৫ সালের ২১, ২২ ও ২৩ সেপ্টেম্বর তিন দিনে টানা ৫৬টি মামলা হয়। রাজধানীর মতিঝিল, পল্টন ও গুলশান থানায় এসব মামলায় আসামি করা হয় ১২০ জনকে। এর মধ্যে ঋণগ্রহীতা ৮২ জন, ব্যাংকার ২৭ জন ও ভূমি জরিপকারী ১১ জন। অনিয়মের মাধ্যমে দুই হাজার ৬৫ কোটি টাকা ঋণ দেয়া হয় বলে মামলায় অভিযোগ করা হয়। এর মধ্যে রাজধানীর গুলশান শাখা থেকে এক হাজার ৩০০ কোটি টাকা, শান্তিনগর শাখা থেকে ৩৮৭ কোটি টাকা, প্রধান শাখা থেকে প্রায় ২৪৮ কোটি টাকা এবং দিলকুশা শাখা থেকে ১৩০ কোটি টাকা ঋণ দেয়া হয়। অভিযোগের বাকি অংশের অনুসন্ধান এখনও চলমান। এছাড়া বেসিক ব্যাংক-সংক্রান্ত বিষয়ে আরও পৃথক চারটি মামলা করে দুদক। এখনও চলছে সেসব মামলা।