দিনের খবর পত্রিকা শেষ পাতা

এটিএম শামসুজ্জামানের চিরবিদায়

নিজস্ব প্রতিবেদক: বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ও টেলিভিশনের প্রবীণ অভিনেতা, চিত্রনাট্যকার এটিএম শামসুজ্জামান মারা গেছেন (ইন্নালিল্লাহি … রাজিউন)। ১৯৬০-এর দশক থেকে চার শতাধিক চলচ্চিত্রের খল ও কমেডি চরিত্রকে অমর করে যাওয়া এ অভিনেতার বয়স হয়েছিল ৮০ বছর। গতকাল সকালে সূত্রাপুরের বাসায় এটিএম শামসুজ্জামানের মৃত্যু হয় বলে তার ছোট ভাই সালেহ জামান জানান।
এটিএম শামসুজ্জামান দীর্ঘদিন ধরেই বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় ভুগছিলেন। শ্বাসকষ্টের সমস্যা নিয়ে গত বুধবারও তাকে হাসপাতালে যেতে হয়েছিল। শুক্রবার বিকালে সেখান থেকে বাসায় ফিরেছিলেন তিনি। সকালে পরিবারের সদস্যরা নাস্তার জন্য ডাকতে গিয়ে বুঝতে পারেন, তার ঘুম আর ভাঙবে না।
সালেহ জামান জানান, জোহরের পর জানাজা শেষে তার ভাইকে জুরাইন কবরস্থানে তার বড় ছেলে কামরুজ্জামান কবীরের পাশে সমাহিত করা হবে। দীর্ঘ ছয় দশকের ক্যারিয়ারে অভিনয়ের জোরেই নিজের নামটিকে একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে পেরেছিলেন এটিএম শামসুজ্জামান। তবে তিনি ছিলেন একাধারে পরিচালক, চিত্রনাট্যকার, সংলাপকার ও গল্পকার। তার লেখা চিত্রনাট্যের সংখ্যা শতাধিক। অভিনয়ের জন্য আজীবন সম্মাননার পাশাপাশি পাঁচবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পাওয়া এটিএম শামসুজ্জামান ২০১৫ সালে একুশে পদকে ভ‚ষিত হন।
তার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ এক বিবৃতিতে বলেছেন, এটিএম শামসুজ্জামানের মৃত্যু দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। বাংলাদেশে অসাম্প্রদায়িক চেতনার বিকাশে তার অবদান মানুষ শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে। প্রয়াতের রুহের মাগফিরাত কামনা করে তার শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান রাষ্ট্রপতি।
এদিকে অভিনেতা এটিএম শামসুজ্জামানের মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। শোক বার্তায় তিনি বলেন, জনপ্রিয় এই শিল্পী তার অসাধারণ অভিনয়ের মধ্য দিয়ে দেশবাসীর হƒদয়ে বেঁচে থাকবেন। মরহুমের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন এবং তার শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান তিনি।
এদিকে গতকাল বাদ আসর রাজধানীর পুরান ঢাকার জুরাইন কবরস্থানে তাকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়। এর আগে সূত্রাপুর জামে মসজিদে এ কিংবদন্তির দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজার আগে সূত্রাপুর কমিউনিটি সেন্টারে তার মরদেহ রাখা হয়।
এটিএম শামসুজ্জামানের জš§ ১৯৪১ সালের ১০ সেপ্টেম্বর নোয়াখালীর দৌলতপুরে নানাবাড়িতে; বেড়ে উঠেছেন পুরান ঢাকায় দেবেন্দ্রনাথ দাস লেইনে। ঢাকার পগোজ স্কুলে তার বন্ধু ছিলেন বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের আরেক জনপ্রিয় অভিনেতা প্রবীর মিত্র। ঢাকা কলেজিয়েট স্কুল, রাজশাহীর লোকনাথ হাইস্কুল ঘুরে ময়মনসিংহ সিটি কলেজিয়েট হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিক শেষে এটিএম শামসুজ্জামান ভর্তি হয়েছিলেন তখনকার জগন্নাথ কলেজে।
বাবা নুরুজ্জামান ছিলেন নামকরা আইনজীবী। তিনি চাইতেন ছেলেও তার মতো আইন পেশায় আসুক। কিন্তু শেষে এটিএম শামসুজ্জামান চেয়েছিলেন লেখক হতে। সাংবাদিক রণেশ দাশগুপ্তকে লেখালেখিতে গুরু মানতেন, দৈনিক সংবাদে নিয়মিত তার লেখাও বের হতো।
১৯৬১ সালে উদয়ন চৌধুরীর বিষকন্যা সিনেমায় সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজের সুযোগ মিলে যায়। পরে নারায়ণ ঘোষ মিতার জলছবি সিনেমার জন্য লেখেন চিত্রনাট্য। সেই সিনেমাতেই অভিষেক ঘটে নায়ক ফারুকের।
সিনেমার পর্দায় এটিএম শামসুজ্জামানের অভিনেতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ ঘটে ১৯৬৫ সালের দিকে। শুরুর দিকে মূলত কমেডি চরিত্রেই তাকে দেখা যেত। ১৯৭৬ সালে আমজাদ হোসেনের নয়নমণিতে খল চরিত্রে অভিনয় করে তিনি বোদ্ধাদের নজর কাড়েন। এরপর আর পেছনে তাকাতে হয়নি। লাঠিয়াল, অশিক্ষিত, গোলাপী এখন ট্রেনে, পদ্মা মেঘনা যমুনা, স্বপ্নের নায়ক সিনেমার শামসুজ্জামান যেমন খল চরিত্রে ফ্রেমবন্দি হয়ে হয়েছেন, রামের সুমতি, ম্যাডাম ফুলি, যাদুর বাঁশি, চুড়িওয়ালায় তার কমেডি চরিত্রের কথাও মনে রেখেছেন ঢাকাই চলচ্চিত্রের দর্শকরা।
ওরা ১১ জন, সেøাগান, সংগ্রাম, সূর্য দীঘল বাড়ি, ছুটির ঘণ্টা, রামের সুমতি, রাজল²ী শ্রীকান্ত, পদ্মা মেঘনা যমুনা এবং গেরিলার মতো সিনেমাতেও এটিএম শামসুজ্জামান অভিনয় করেছেন নানা ভ‚মিকায়।
অভিনয়ের জন্য এটিএম শামসুজ্জামানের প্রথম পুরস্কার ছিল বাচসাস পুরস্কার। পরে ১৯৮৭ সালে কাজী হায়াতের দায়ী কে সিনেমার জন্য শ্রেষ্ঠ অভিনেতার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান তিনি।
এরপর ১৯৯৯ সালের ম্যাডাম ফুলি, ২০০১ সালের চুড়িওয়ালা, ২০০৯ সালের মন বসে না পড়ার টেবিলে সিনেমায় অভিনয়ের জন্য শ্রেষ্ঠ কৌতুক অভিনেতা জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান তিনি।
২০১২ সালের চোরাবালি সিনেমার জন্য পান পার্শ্বচরিত্রে শ্রেষ্ঠ অভিনেতার জাতীয় পুরস্কার। আর ২০১৭ সালে ৪২তম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে তাকে আজীবন সম্মাননায় ভ‚ষিত করা হয়। চলচ্চিত্রে ব্যস্ত হয়ে যাওয়ার আগে ও পরে টেলিভিশনেও বহু নাটকে দেখা গেছে তাকে। ভবের হাট, রঙের মানুষ, ঘর কুটুম, বউ চুরি ও শতবর্ষে দাদাজান তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য। ২০১৫ সালে যখন একুশে পদক দেয়া হলো, প্রথমে নিতে চাননি এই অভিনেতা। পরে প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে তিনি সেই সম্মাননা নেন।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..