প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

এডিবির প্রতিবেদন: রাজধানীর যানজটে বছরে ক্ষতি জিডিপির ৩ শতাংশ

 

ইসমাইল আলী: রাজধানীর সড়কগুলোর ১৫ শতাংশ ব্যক্তিগত গাড়ির দখলে। অথচ এগুলো মাত্র ৮ শতাংশ যাত্রী পরিবহন করে। বাকিদের চলাচলের একমাত্র ভরসা গণপরিবহন। যদিও এ ব্যবস্থা আধুনিকায়নে কোনো প্রকল্পই এখনও শুরু হয়নি। মেট্রোরেল ও বাস র‌্যাপিড ট্রানজিটের (বিআরটি) কথা বলা হলেও ১০ বছরে তা আলোর মুখ দেখেনি। এতে ক্রমেই প্রকট আকার ধারণ করছে রাজধানীর যানজট।

ঢাকা শহরে যানজটের মাত্রা কতটা প্রকট আকার ধারণ করেছে তা উঠে এসেছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) কান্ট্রি ডায়াগনস্টিক স্টাডিতে। এতে বলা হয়, বর্তমানে ঢাকায় যানজটে বছরে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৩ শতাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আর্থিক হিসাবে এ ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় ৫২ হাজার কোটি টাকা।

display

যানজটের ক্ষতি পরিমাপে সময় ও জ্বালানি তেলের অপচয়, জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ও শহরমুখী প্রবণতা বৃদ্ধিকে বিবেচনা করেছে এডিবি। এ হিসেবে যানজটে ব্রিটেনে জিডিপির ক্ষতি ১ দশমিক ৫ শতাংশ। ফ্রান্সে এ ক্ষতি জিডিপির ১ দশমিক ৩ শতাংশ, জার্মানিতে দশমিক ৯ ও যুক্তরাষ্ট্রে দশমিক ৬ শতাংশ। আর বাংলাদেশের মধ্যে শুধু ঢাকা শহরে যানজটে ক্ষতি জিডিপির ৩ শতাংশ। যদিও এ ক্ষতিকে বাস্তব অবস্থার চেয়ে অনেক কম বলে মনে করছে এডিবি নিজেই।

যানজটের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও পরিবহন বিশেষজ্ঞ ড. মো. শামছুল হক শেয়ার বিজকে বলেন, ঢাকা শহরের যানজটের মূল কারণ ছোট তথা ব্যক্তিগত গাড়ি। অথচ এগুলোকেই প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। প্রতিদিন রাজধানীতে প্রায় ২০০ গাড়ি নামছে, যার ৯৫ শতাংশই ছোট গাড়ি। আর যানজট নিরসনের নামে একের পর এক ফ্লাইওভার নির্মাণ করে ব্যক্তিগত গাড়িকে আরও প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। এতে যানজট স্থায়ী সমস্যায় রূপ নিচ্ছে। তাই গণপরিবহন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও ব্যক্তিগত গাড়ি নিরুৎসাহিত ছাড়া রাজধানীর যানজট কমার কোনো সম্ভাবনাই নেই।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঢাকার যানজটের জন্য বেশিরভাগের ক্ষেত্রে রিকশাকে দায়ী করা হয়। তবে বাস্তবতা হলো, যানজটের মূল কারণ হলো ব্যক্তিগত গাড়ি। এর বাইরে যানজটের আরও চারটি কারণ রয়েছে। এগুলো হলোÑজনসংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় সব ধরনের যানবাহন বাড়া, একই সড়কে যান্ত্রিক ও অযান্ত্রিক যান চলাচল, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা ও নি¤œমানের পরিকল্পনা।

যানজটের ক্ষতি পরিমাপে এডিবি প্রান্তিক বাহ্যিক ক্ষতি ব্যবহার করেছে। আর এটি পরিমাপে পাঁচটি সূচক ব্যবহার করা হয়েছে। এগুলো হলোÑযানজট, বায়ুদূষণ, সড়ক দুর্ঘটনা, সড়ক ও যানের ক্ষয়ক্ষতি এবং শব্দদূষণ। এর ভিত্তিতে দেখা যায় ব্যক্তিগত গাড়ির প্রান্তিক বাহ্যিক ক্ষতি গণপরিবহনের ১৩ গুণ বেশি। তবে অফপিকের চেয়ে পিক আওয়ারে ক্ষতি বেশি। এক্ষেত্রে যানজটে ব্যক্তিগত গাড়িতে পিক সময়ে ঘণ্টাপ্রতি ক্ষতি ৪৫ টাকা ৯০ পয়সা ও অফপিকে ক্ষতি ২২ টাকা ৩৮ পয়সা। এদিকে বাসে পিক সময়ে ঘণ্টাপ্রতি ক্ষতি ৬০ পয়সা ও অফপিকে ২৯ পয়সা।

জানতে চাইলে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, যানজট নিরসনে সরকার বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। আগামী বছর উত্তরা-মতিঝিল মেট্রোরেলের কাজ শুরু হবে। গাজীপুর থেকে কেরানীগঞ্জ পর্যন্ত বিআরটি নির্মাণ শুরু হবে চলতি বছর। এছাড়া জাপানের সহযোগিতায় কৌশলগত  পরিবহন পরিকল্পনা (এসটিপি) সংশোধন করা হয়েছে। এর আওতায় আরও চারটি মেট্রোরেল ও একটি বিআরটি নির্মাণ করা হবে। পাশাপাশি ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ন্ত্রণে আইন হচ্ছে। এতে দ্রুত যানজট কমানো যাবে।

এদিকে যানজটে রাজধানীর ক্ষতির চিত্র ২০১১ সালে তুলে আনে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ (আইইবি)। তাদের হিসাবে, ২০১১ সালে যানজটে নষ্ট হয় ৩২ লাখ কর্মঘণ্টা। এর আর্থিক মূল্য ছিল প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা। সে বছর পরিবহন খাতের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ছিল দুই হাজার কোটি টাকা। এছাড়া যানজটে আটকে থাকার কারণে পণ্য পরিবহনে ক্ষতি হয় দুই হাজার কোটি, জ্বালানি বাবদ ৫৭৫ কোটি ও পরিবেশগত দুই হাজার ২০০ কোটি টাকা। আর চিকিৎসা ব্যয় বাবদ ক্ষতি হয় ৭৩০ কোটি ও দুর্ঘটনায় ৫০ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে ২০১১ সালে রাজধানীর যানজটে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ছিল ২০ হাজার কোটি টাকা।

প্রায় একই সময়ে রাজধানীর যানজটের অর্থনৈতিক ক্ষতি পরিমাপ করে মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই) ও দ্য চার্টার্ড ইনস্টিটিউট অব লজিস্টিকস অ্যান্ড ট্রান্সপোর্ট। ২০১১ সালের ওই গবেষণায় রাজধানীর যানজটে বাণিজ্যিক ক্ষতির পরিমাণ দেখানো হয় ২১ হাজার কোটি টাকা।

২০১২ সালে ঢাকার যানজট নিয়ে এক সমীক্ষা চালায় ইউএনডিপি। অর্থনৈতিক ক্ষতির পাশাপাশি যানজটের বেশ কিছু কারণও উঠে আসে সমীক্ষায়। এতে বলা হয়, ২০১২ সালে যানজটে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ছিল প্রায় ৩১ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ৩ দশমিক ৩ শতাংশ।

সমীক্ষায় আরও বলা হয়, ঢাকায় নিবন্ধিত গাড়ির সংখ্যা দুই লাখের বেশি। এসব গাড়ি রাজধানীর সড়কগুলোর প্রায় ৭০ শতাংশ জায়গা দখল করে থাকে। মাথাপিছু গাড়ি ব্যবহারও ঢাকায় অনেক কম। প্রতি হাজারজনের জন্য তিনটি গাড়ি। তবু গণপরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়নে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

এদিকে ঢাকার যানজটের ভয়াবহতার তথ্য উঠে এসেছে নামবিওর তথ্য থেকে। বহুজাতিক এ গবেষণা প্রতিষ্ঠানটির গত বছর প্রকাশিত ‘ট্রাফিক ইনডেক্স-২০১৬’তে বলা হয়েছে, বিশ্বের সবচেয়ে যানজটপূর্ণ শহরের তালিকায় তৃতীয় স্থানে রয়েছে ঢাকা, ২০১৫ সালে যা ছিল অষ্টম।

নামবিওর তথ্যমতে, ট্রাফিক ইনডেক্সের শীর্ষ স্থানে রয়েছে ভারতের কলকাতা। শহরটির স্কোর ৩৬৩ দশমিক ১৫। ৩৪২ দশমিক ৫১ স্কোর নিয়ে ভারতের আরেক শহর মুম্বাই রয়েছে দ্বিতীয় স্থানে। আর ৩৩২ দশমিক ৯৭ স্কোর নিয়ে তৃতীয় স্থানে রয়েছে ঢাকা। চতুর্থ স্থানে থাকা কেনিয়ার রাজধানী নাইরোবির স্কোর ৩১১ দশমিক ৭০ ও পঞ্চম স্থানে থাকা ফিলিপাইনের রাজধানী ম্যানিলার স্কোর ৩০৯ দশমিক ৩৭। ষষ্ঠ স্থানে রয়েছে তুরস্কের ইস্তাম্বুল। ভারতের গুরগাঁও ও দিল্লি রয়েছে যথাক্রমে সপ্তম ও অষ্টম স্থানে। মিসরের রাজধানী কায়রো নবম ও ইরানের রাজধানী তেহরান দশম স্থানে রয়েছে। দেশগুলোর স্কোর ৩০০-র নিচে।

নামবিওর তথ্যের সঙ্গে একমত পোষণ করেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) নগর ও অঞ্চল বিভাগের অধ্যাপক ড. সারওয়ার জাহান। তিনি বলেন, ঢাকা শহরের যানজট ক্রমেই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ২০০৪ সালে কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনা (এসটিপি) গ্রহণ করা হলেও কোনো নির্দেশনাই বাস্তবায়ন হয়নি। বরং অপরিকল্পিতভাবে ফ্লাইওভার নির্মাণ করে যানজটকে স্থায়ী রূপ দেওয়া হচ্ছে। গণপরিবহন ব্যবস্থার বিকাশে কয়েক বছর ধরে আলোচনা হলেও কোনো প্রকল্পই বাস্তবায়ন শুরু হয়নি। অবস্থার উন্নতিতে ঢাকায় দ্রুত গণপরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটাতে হবে। তা না হলে কয়েক বছরের মধ্যে ঢাকা হবে বিশ্বের সবচেয়ে যানজটপূর্ণ শহর।