মত-বিশ্লেষণ

এডিস মশা নিধনে বিলম্ব নয়, হারাতে চাই না আর কোনো প্রাণ

কাজী সালমা সুলতানা: গত বৃহস্পতিবার এক অসুস্থ আত্মীয়কে দেখতে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে গিয়েছিলাম। হাসপাতালের দোতলায় উঠতেই গিয়ে দেখি, সেখানে সব বিছানাতেই মশারি টানানো। এদিক-ওদিক তাকিয়েই বুঝতে পারি সেখানে অসংখ্য ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন। রোগীর আধিক্য বলে দিচ্ছে, দেশে যেন মহামারি এসেছে। রোগীর স্বজনদের মধ্যে অসহায়ত্ব, আতঙ্ক যেন চোখেমুখে। সামান্য জ্বরেও আতঙ্কিত মানুষ ছুটে আসছেন হাসপাতালে। এরকম বাস্তবতায় ডেঙ্গুজ্বর এখন সাধারণ কোনো জ্বর নয়।
গত দুই মাসেই ডেঙ্গুর প্রকোপ মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। ইতোমধ্যে এই রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন অন্তঃসত্ত্বা নারী, শিশু, কিশোর, ডাক্তার, শিক্ষার্থী, পুলিশ কর্মকতা, উপসচিবের স্ত্রীসহ দেশের সাধারণ মানুষ থেকে সরকারের নানা পর্যায়ের কর্মকর্তারাও। ডেঙ্গুতে মারা যাওয়া ছেলেকে দাফন করে এসেই হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত মেয়ের পাশে উদ্বেগে দিন কাটাতে হচ্ছে মা-বাবাকে। গত দুদিনে পাঁচজন নারী খেলোয়াড়, সহস্র পুলিশ সদস্য, রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলীসহ অনেকে এই জ্বরে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। রাজধানীর হাসপাতালগুলোয় আক্রান্ত রোগীদের ঠাঁই মিলছে না। আক্রান্ত রোগীর জন্য এখন হাসপাতালের একটা সিট পাওয়াটাই ভাগ্যের ব্যাপার। রোগীর অবস্থার অবনতি হলে সেক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় রক্তের ব্যবস্থা করাটাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
প্রতিদিন গড়ে প্রায় দুই হাজার জন আক্রান্ত হচ্ছেন এই জ্বরে। হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন ও কন্ট্রোল রুমের সংকলন অনুযায়ী, এ বছর সাত হাজার ১৭৯ ডেঙ্গু রোগী বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। সেই হিসাবে এ বছর ২২ জুলাই পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্তের অনুমিত সংখ্যা তিন লাখ ৫৮ হাজার ৯৫০ জন। দেশের প্রায় সব জেলাতেই ছড়িয়ে পড়ছে ডেঙ্গুর প্রকোপ। আশঙ্কা করা হচ্ছে আগামী মাসে বা ভরা মৌসুমে পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটতে পারে। এছাড়া আসন্ন ঈদে ঢাকা শহর ছেড়ে গ্রামমুখী মানুষ হতে ডেঙ্গুজ্বর সারাদেশে ছড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও বেশি।
গত বছর ডেঙ্গুর প্রকোপ আগের বছরগুলো থেকে বেশি থাকলেও এ বছর তা কয়েকগুণ বেড়েছে। হাসপাতালের আলাদা সিট বসিয়ে ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। ব্যাপক সংখ্যক রোগীদের দিন-রাত সেবা দিতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসকরা। অনেক চিকৎসক নিজেরাও আক্রান্ত হচ্ছেন।
ডেঙ্গুজ্বরে শিশু ও বয়স্ক ছাড়াও যারা দ্বিতীয় বা তৃতীয়বার আক্রান্ত হচ্ছেন, তাদের ক্ষেত্রে জীবনের ঝুঁকি অনেক বেশি। এছাড়া এবারের ডেঙ্গুজ্বর আগের থেকে ভিন্ন রকম আকার ধারণ করেছে। ডাকসুর সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও স্বাস্থ্য বিভাগের রোগতত্ত্ব রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাবেক মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মুশতাক হোসেন বলেন, আগের চেয়ে অনেক বেশি মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছেন। সচেতনতার পাশাপাশি ডেঙ্গুর ভাইরাসবাহী এডিস মশা নিধন এবং নির্মূলে তৎপর না হওয়ায় এ মৃত্যু মহামারি আকার ধারণ করছে। যেহেতু ডেঙ্গুজ্বরের প্রধান বাহক এডিস মশা, তাই এ মশা মারতে আগে থেকেই কেন ব্যবস্থা নেওয়া হলো না এমন প্রশ্ন তুলেছেন চিকিৎসকরাও।
এমন এক উদ্বেগময় পরিস্থিতিতে একের পর এক অসঙ্গতিপূর্ণ বক্তব্য দিয়েছেন সবকারের মন্ত্রী এবং মেয়ররা। রাজধানীর দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র বলেছিলেন, সারা দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা নিয়ে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন ‘ছেলেধরার মতো গুজব’। স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কথার সুরও তেমনি ছিল। তার বক্তব্য, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণেই আছে। তাদের দায়িত্বহীন ও অমানবিক কথা সাধারণ মানুষের মনে ক্ষোভের সৃষ্টি করছে। ডেঙ্গুবাহী এডিস মশা নির্মূল ও ধ্বংসের শুনানিতে এক আইনজীবী আদালতকে বলেন, ‘উত্তরে ওষুধ দিলে মশা দক্ষিণে যায়, দক্ষিণে দিলে উত্তরে যায়।’ তার মতে, এ কারণেই মশা নিধন করা সম্ভব হয়নি। এসব অনভিপ্রেত কথায় মনে হয় রোগটা নিয়ে তারা ঠাট্টা করছেন। এদিকে ডেঙ্গুর প্রকোপের কারণে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সবার ঈদের ছুটি বাতিল ঘোষণা হলো, তখন জানা গেল স্বাস্থ্যমন্ত্রী নিজেই বিদেশ সফরে। দেশের মানুষের যখন স্বাস্থ্য সংকটে, তখন স্বাস্থ্যমন্ত্রীর এই বিদেশ সফর ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি করে। ডেঙ্গুজ্বর আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা প্রতিদিন বেড়েই চলেছে । অবস্থা এমনই যে, বলা যায়
দুই সিটি করপোরেশনই মশা নিধনে বা ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়েছে।
নানা সময় নানা কথা বলে ঢাকা দক্ষিণের মেয়র সাঈদ খোকন বিতর্কিত হয়েছেন। তার কথা ও কাজে এখন পর্যন্ত কোনো সমন্বয় পরিলক্ষিত হয়নিই। ঢাকা উত্তরের মেয়র আতিকুল বলেন বলেছেন, ‘ডেঙ্গু আক্রান্ত একটি রোগীর মৃত্যুও কাম্য নয়। আমরা চেষ্টা করছি, ভুল তো হতেই পারে। শিখতে গেলে ভুল হবে, তবে একসময় ঠিক হবে। আমার সততার কোনো অভাব নেই। তবে অভিজ্ঞতার অভাব আছে।’
২০০০ সালে দেশে প্রথম বড় আকারে ডেঙ্গুর প্রকোপ দেখা দেয়। সরকারি হিসাবে ওই বছর পাঁচ হাজার ৫৫১ জন আক্রান্ত হয়েছিলেন আর মারা গিয়েছিলেন ৯৩ জন। এরপর ডেঙ্গুজ্বরে মৃতের সংখ্যা কমতে থাকে। গত বছর ২০১৮ সালে ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় ১০ হাজার ছাড়িয়ে যায়। মারা গিয়েছিলেন ২৬ জন। এ বছর তা আরও বেড়েছে। গত ১০ বছরে দেশে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ৯ গুণ বেড়ে গেছে। শীতকাল আসা পর্যন্ত এভাবেই যদি মানুষ আক্রান্ত হতে থাকে, তবে প্রচুর মানুষ ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হবেন, বাড়বে মৃত্যুর সংখ্যাও ।
ডেঙ্গুজ্বরের কারণ যে এডিস মশা এখন প্রতি বছরের প্রাণঘাতী সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই স্বাভাবিকভাবেই জনমন কিছু প্রশ্ন উঠতেই পারে।
বিশেষজ্ঞসহ সংশ্লিষ্টরা মশক নিধনে যে ওষুধ রাজধানীতে ছিটানো হচ্ছে, তা কার্যকর নয় বলে প্রায় এক বছর আগে গবেষণা প্রতিবেদন দিয়েছিল আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি)। এমনকি চলতি মৌসুমে ডেঙ্গু বিস্তারের বিষয়ে তিন মাস আগে স্বাস্থ্য অধিদফতরের পক্ষ থেকেও দেওয়া হয়েছিল আগাম সতর্কতা। আর এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে ডেঙ্গু ভয়াবহতার সকর্তবার্তা দিয়েছিল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। এমনকি পাঁচ মাস আগে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে বলেছিলেন হাইকোর্ট। উল্টো আইসিডিডিআর,বি’র গবেষণাকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হিসেবে আখ্যায়িত করে ছিটানো ওষুধ কার্যকর বলে দাবি করেছেন তারা। ফলে অকার্যকর ওষুধ দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে মশক নিধন কর্মসূচি।
২০০০ সালের পর থেকে ডেঙ্গু চিকুনগুনিয়ার প্রকোপ পূর্বের বছরের তুলনায় পরের বছর বাড়ছে, তাহলে রোগটির ভয়াবহতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হলো না কেন?
দুই সিটি করপোরেশন তো দৈনিক আবর্জনা পরিষ্কারের কাজটিও যথাযথভাবে করে না। এই লেখা যখন লিখছি তখনও রামপুরা ব্রিজের কাজে বিকাল ৫টায় ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কারের কাজ চলছে। বলা হয় সেখানেও জনবল কম আছে। প্রশ্ন হলো প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ দেওয়া হয় না কেন?
মশা মারার ওষুধ নিয়ে অভিযোগ আছে, যে ওষুধ আমদানি করা হয় তা চুরিও হয়ে যায়। বর্তমানে দ্রুত নতুন ওষুধ আমদানি করার সিদ্ধান্ত নিতে কেন এত সময়ক্ষেপণ করছে সিটি করপোরেশন? যে ওষুধে মশা মরে না, সেই ওষুধ কেন ব্যবহার করছিল সিটি করপোরেশন?
দেশব্যাপী মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হচ্ছে, তেমন প্রতিকূল পরিস্থিতিতে মেয়ররা কেন একের পর এক মন্তব্য করে নিজেদের দায়িত্বহীনতাকে প্রকাশ করছেন। ডেঙ্গু নিধনে পূর্বপ্রস্তুতি না থাকার কারণে যে মূল্যবান জীবনপ্রদীপ নিভে গেল এর দায় কার?
এখন পর্যন্ত ডেঙ্গু মশা নিধনে মেয়র ওয়ার্ড কমিশনার-মেম্বারদের যৌথ পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও শোনা যায়নি। ভোটের আগে তারাই জনগণের কাছে উন্নত নগর জীবনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।
ডেঙ্গুর প্রকোপে অসৎ ব্যবসায়ীরা সুযোগ বুঝে মশারির মূল্য বৃদ্ধি করেছে। রেড়েছে মশার কয়েল থেকে ওডোমাস, অ্যারোসলসহ মশা নিধনে যাবতীয় ওষুধের দাম। ডেঙ্গু পরীক্ষার কিট নিয়েও শুরু হয়েছে অনৈতিক বাণিজ্য। শোনা যাচ্ছে হাসপাতালে ডেঙ্গু পরীক্ষার কিটের সংকট দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতির ভয়াবহতার সুযোগ নিয়ে অসাধু ব্যবসায়ীরা ডেঙ্গু পরীক্ষার কিট দ্বিগুণ মূল্যে বিক্রি করছেন। ১৫০-১৮০ টাকা মূল্যের কিট বাজারে বিক্রি হচ্ছে এখন ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকা। বাজারে কিটের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে সিন্ডিকেট চক্র হাতিয়ে নিচ্ছেন তারা কোটি কোটি টাকা।
২০০০ সালের পর থেকে রোগটির ব্যবস্থাপনার বিষয়ে চিকিৎসকদের অনেক বেশি অভিজ্ঞতা হয়েছে। তারপরও এবার ডেঙ্গুতে মৃত্যের সংখ্যা বাড়ছে। এজন্য ডেঙ্গুবাহিত মশা দমনে সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি উঠেছে। ঢাকা সিটি করপোরেশন ও সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগকেই এ দায়িত্ব নিতে হবে। সিটি করপোরেশনের মশা নিধনের সঠিক ওষুধ আনার ব্যবস্থা নিতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদফতরের রোগনিয়ন্ত্রণ শাখার জাতীয় ম্যালেরিয়া নির্মূল ও এডিসবাহিত রোগনিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি এই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে কাজ করে। তাদের সঙ্গে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন, সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর), আইসিডিডিআর,বি, পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়, রিহ্যাবসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান একসঙ্গে কাজ করার কথা। তবুও এখন পর্যন্ত তার কোনো সুফল জনগণ পায়নি।
ডেঙ্গু রোগের প্রকোপ বৃদ্ধি, একের পর এক মূল্যবান জীবনের মৃত্যু রোধে দেশব্যপী সমন্বিত উদ্যোগের বিকল্প নেই। সরকারি-বেসরকারি সংস্থা, স্বাস্থ্য বিভাগ ও সিটি করপোরেশনের যৌথ ব্যবস্থাপনা ও ডেঙ্গু নিধনের কর্মসূচি বাস্তবায়নে যৌথ মনিটরিং টিমকে দায়িত্ব দিতে হবে। এ কর্মসূচি যত দ্রুত সম্ভব বাস্তবায়িত করতে হবে। অন্যথায় ডেঙ্গু রোগের চরম মূল্য দিতে হবে।

গণমাধ্যমকর্মী
[email protected] gmail.com

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..