প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

এভাবে মিল্ক ভিটা দুধের দাম বাড়ার কারণ কী?

সম্প্রতি প্যাকেটজাত দুধ মিল্ক ভিটার দাম লিটারপ্রতি তিন টাকা বাড়িয়ে ৬৫ টাকা করেছে বাংলাদেশ দুগ্ধ উৎপাদনকারী সমবায় সমিতি। ২০০৯ সাল থেকে মিল্ক ভিটা কর্তৃপক্ষ তাদের উৎপাদিত দুধের দাম এই নিয়ে সাতবার বাড়িয়েছে। দাম বাড়ানোর মাত্রা বেশ চমকপ্রদই বলা যায়। দুধের প্যাকেট যত ছোট হবে, লিটারপ্রতি ভোক্তাদেরও বেশি হারে দাম গুনতে হবে। যেমন, এক লিটারের প্যাকেট ৬৫ টাকায় বিক্রি হলে আধা লিটারের জন্য দাম

গুনতে হচ্ছে ৩৫ টাকা। আবার বাজার ঘুরে দেখা যায়, মিল্ক ভিটা তেমন একটা পাওয়া যায় না নির্দিষ্ট কিছু দোকান ছাড়া।

প্রশ্ন হলো, মিল্ক ভিটা কর্তৃপক্ষের এই উপর্যুপরি দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত কতটা যুক্তিযুক্ত? প্রতিষ্ঠানটির একজন কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে জানান, খামারি পর্যায়ে তাদের বেশি দাম দিতে হয়। সেই বেশি দামের পরিমাণটাই বা কত হতে পারে? সম্প্রতি গণমাধ্যমে তাদের পক্ষ থেকে

জানানো হয়েছে, খামারি পর্যায়ে মিল্ক ভিটা কর্তৃপক্ষ প্রতি লিটার দুধ কিনছে ৫২ টাকায়। সেখানে ভোক্তা পর্যায়ে ৬৫ টাকায় উন্নীত হওয়ার কী কোনো সঠিক যুক্তি আছে?

দেশে বেসরকারি খাতে আড়ং ব্র্যান্ড সম্ভবত প্রথম বাজারে আসে। কয়েক বছর আগেও বাংলাদেশ দুগ্ধ উৎপাদনকারী সমবায় সমিতিই ছিল দেশে প্যাকেটজাত দুধ উৎপাদনকারী একমাত্র প্রতিষ্ঠান। আড়ং দুধ মিল্কভিটার চেয়ে লিটারে দুই টাকা কম হওয়া সত্ত্বেও ক্রেতাদের প্রথম পছন্দ ছিল মিল্কভিটা। ক্রমেই আড়ংয়ের বাজার বাড়তে শুরু করে। শোনা যায়, বেসরকারি খাতের ডেইরি কোম্পানিগুলো মিল্কভিটাকে দুধের দাম বাড়াতে বিভিন্নভাবে প্ররোচিত করে। কারণ মিল্ক ভিটা দাম না বাড়ালে অন্য কোম্পানিগুলো দাম বাড়াতে পারছিল না। যেহেতু এর আগে বাজার নিয়ন্ত্রণ করতো মিল্কভিটা। আস্তে আস্তে মিল্কভিটায় আর দশটা সরকারি প্রতিষ্ঠানের মতো ব্যবস্থাপনা দুর্বলতা প্রকাশ পায়। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে মিল্ক ভাটার বাজারকে আয়ত্তে নিতে সক্ষম হয় আড়ং। এখন আড়ং নেতৃত্বের ভূমিকায় রয়েছে; তাকে আর মিল্কভিটার দিকে তাকিয়ে থাকতে হয় না। এখন সবার আগে দাম বাড়ায় আড়ং, অন্যরা তাকে অনুসরণ করে। এর আগেরবারও প্রথম দাম বাড়ায় আড়ং।

ইদানীং বেসরকারি পর্যায়েও বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান প্যাকেটজাত দুধ উৎপাদন করছে। এটি ভোক্তাদের জন্য স্বস্তিকর হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ের দুগ্ধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো পণ্যের মানোন্নয়নে সচেষ্ট না থেকে দাম বাড়ানোর প্রতিযোগিতায় মেতেছে। কয়েক দিন আগে আড়ং দাম বাড়ানোর পর এখন মিল্ক ভিটাও বাড়ালো। এরপর একই যুক্তিতে বেসরকারি অন্যান্য প্রতিষ্ঠান দাম বাড়াবে। ভোক্তারা কোথায় যাবে? যেকোনো ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানই পণ্য বিক্রির ক্ষেত্রে উৎপাদন ব্যয় ও লাভের বিষয়টি দেখবে। মিল্ক ভিটা কর্তৃপক্ষ দাম বাড়ানোর পক্ষে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির দোহাই দিয়ে থাকে। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটিতে ব্যাপক অনিয়ম ও অপচয় হচ্ছে বলে গণমাধ্যমে খবর ছাপা হয়েছে। তদুপরি প্রতিষ্ঠানটি খামারিদের স্বার্থ দেখে, সে সুনামও নেই; বরং দুধের দাম পরিশোধ নিয়ে খামারিদের প্রচুর অভিযোগ রয়েছে। এর প্রতিকারে আন্দোলনও করেছেন তারা। খামারিদের কাছ থেকে মিল্ক ভিটা কর্তৃপক্ষ যে দামে দুধ কেনে, এর প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যয় তার অর্ধেকের বেশি হওয়া উচিত নয়। প্রতিষ্ঠানটির দুর্নীতি ও অপচয় কমানো গেলে ভোক্তাদের ওপর বাড়তি দামের বোঝা কমানো যেত।

বাংলাদেশ দুগ্ধ উৎপাদনকারী সমবায় সমিতি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল অধিকাংশ মানুষের পুষ্টি চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি বিদেশি গুঁড়া দুধের ওপর নির্ভরশীলতা কমানোর লক্ষ্যে। কিন্তু মিল্ক ভিটা কর্তৃপক্ষ সেদিকে নজর না দিয়ে ভোক্তাদের পকেট কাটতেই যেন ব্যস্ত। আর ক্রেতা হিসেবে যারা দুর্বল, তাদের ওপরই খ গটি বেশি চেপে বসেছে। এর অবসান চাই। যেখানে সরকারের দায়িত্ব বাজার স্থিতিশীল রাখতে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর নিবিড় তদারকি, সেখানে সরকারি প্রতিষ্ঠান দফায় দফায় দাম বাড়িয়ে ভোক্তাদের ধৈর্যের পরীক্ষা নিতে পারে না। তাই মিল্ক ভিটার দুধের বর্ধিত দাম কমিয়ে যুক্তিসংগত পর্যায়ে আনা হোক, এটাই দাবি।

 

জাওয়াদ জহির খান জীম

খিলগাঁও, ঢাকা