প্রচ্ছদ প্রথম পাতা

এমজেএলের ১১০ কোটি টাকার জমি ক্রয়

ইস্টকোস্ট গ্রুপের কারসাজি

শেখ আবু তালেব:১১০ কোটি টাকা মূল্যের জমি কিনেছে পুঁজিবাজারের তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠান এমজেএল বাংলাদেশ লিমিটেড। জমি কেনা শেষ, নামজারি শেষ। জমির দখলও বুঝে পেয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। কিন্তু তারপরও বিনিয়োগকারীদের মূল্য সংবেদনশীল এ তথ্য জানায়নি এমজেএল বাংলাদেশ লিমিটেড। ইস্টকোস্ট গ্রুপের প্রতিষ্ঠানটি ঘটনার সত্যতা শিকার করলেও এর পেছনে বড় ধরনের কারসাজির অভিযোগ তুলেছেন বিনিয়োগকারীরা। তারা মনে করছেন, ঘোষণার আগে পর্ষদ কম দামে শেয়ার কিনে তারপরে বড় ধরনের মুনাফা তুলে নেওয়ার পরিকল্পনা করছে। তা না হলে বনেদি এ কোম্পানি কেন পুঁজিবাজারের নিয়ম লঙ্ঘন করবে?

বিভিন্ন দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের মুড়াপাড়ায় প্রায় ৪০ বিঘা জমি কেনে এমজেএল বাংলাদেশ। প্রায় ১১০ কোটি টাকা দিয়ে এই জমি কিনেছে কোম্পানিটি। জমি কেনার সব প্রক্রিয়া সম্পন্নও হয় সম্প্রতি। কিন্তু দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও তা মূল্য সংবেদনশীল তথ্য হিসেবে প্রকাশ করেনি। সিকিউরিটিজ আইন অনুযায়ী, পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোনো কোম্পানির সম্পদ, উৎপাদন ও বিপণন-সংক্রান্ত যে তথ্য কোম্পানির বার্ষিক আয়ে বিশেষ প্রভাব ফেলবে তা প্রচারের বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

মূল্য সংবেদনশীল হিসেবে বিবেচিত এই তথ্য বিনিয়োগকারীদের জানাতে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই), দুটি জাতীয় পত্রিকা ও অনলাইনে প্রকাশ করতে হবে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনকেও (বিএসইসি) জানাতে হবে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এ-সংক্রান্ত কোনো উদ্যোগই নেয়নি কোম্পানিটির দায়িত্বশীলরা।

রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি খাতের যৌথ মালিকানাধীন কোম্পানি এমজেএল বাংলাদেশ লিমিটেড। রাষ্ট্রায়ত্ত যমুনা অয়েল কোম্পানির সঙ্গে যৌথভাবে এমজেএলের মালিকানায় রয়েছে ইসি সিকিউরিটিজ। ইস্টকোস্ট গ্রুপের সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠান হচ্ছে ইসি সিকিউরিটিজ।

জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের সচিব আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনেম এমজেএল বাংলাদেশ লিমিটেডের চেয়ারম্যান। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি শেয়ার বিজকে জানান, জমি কেনাসংক্রান্ত বিষয়ে কোম্পানির ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরাই সঠিক তথ্য দিতে পারবেন।

এ বিষয়ে এমজেএল বাংলাদেশ লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এম মুকুল হোসাইনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ-সংক্রান্ত কোনো তথ্য দিতে রাজি হননি। পরে ইস্টকোস্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান আজম জে চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

জানা গেছে, গত বছরের ১৮ ফেব্রুয়ারি এমজেএল বাংলাদেশ মূল্য সংবেদনশীল তথ্য হিসেবে ডিএসইকে জমি কেনার তথ্য জানায়। তাতে উল্লেখ করা হয়, নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে ৯৭ কোটি টাকা দরে জমি কেনাসংক্রান্ত প্রস্তাব অনুমোদন করেছে পরিচালনা পর্ষদ। কিন্তু জমি ক্রয়সম্পন্ন করার কয়েক মাস পেরিয়ে গেলেও বিনিয়োগকারী বা নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে এখনও জানায়নি এমজেএল বাংলাদেশ লিমিটেড কর্তৃপক্ষ।

ডিএসইর তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের জুনের পর থেকে কোম্পানির উদ্যোক্তাদের শেয়ার ধারণের হার ৭৭ দশমিক ৫৩ শতাংশেই রয়েছে। কিন্তু সাধারণ বিনিয়োগকারীদের শেয়ার ধারণের হার ১২ দশমিক ১৫ শতাংশ থেকে ৯ দশমিক ৬২ শতাংশে নেমেছে। এছাড়া বিদেশি বিনিয়োগকারীদের শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশ থেকে নেমেছে শূন্য দশমিক ৩২ শতাংশে।

কিন্তু এই সময়ে প্রাতিষ্ঠানিক শেয়ার ধারণকারীদের অংশ বেড়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের শেয়ার ধারণের হার ১৫ দশমিক ৮২ শতাংশ থেকে বেড়ে হয়েছে ১৮ দশমিক ৫৩ শতাংশ। অর্থাৎ শেয়ারদর কমে যাওয়ায় সাধারণ ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বিক্রীত শেয়ার প্রাতিষ্ঠানিকরা কিনেছেন।

জানা গেছে, বর্তমানে কোম্পানিটির শেয়ারদর গত দুই বছরের মধ্যে সর্বনি¤েœ রয়েছে। দুই বছর আগে ১৯৯ টাকা দরের শেয়ারটি গতকাল ৭৭ টাকা ৩০ পয়সায় লেনদেন হয়েছে। কোম্পানিটির শেয়ারদর নি¤œমুখী প্রবণতায় রয়েছে।

শেয়ার কারসাজির আশঙ্কা করে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বিনিয়োগকারী জানান, বড় কোম্পানিগুলো আর্থিকভাবে অনেক শক্তিশালী হয়। কিন্তু তারা বিনিয়োগকারীদের কাছে অনেক তথ্যই লুকিয়ে রাখে। এই প্রতিষ্ঠানও সেটি করার চেষ্টা করছে। এভাবেই বিনিয়োগকারীরা ঠকছেন। বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ দেখভালের দায়িত্ব নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির। কিন্তু তারাও ঠিকমতো দায়িত্ব পালন করছে কি না বলা মুশকিল।

জানা যায়, তুলনামূলক কম দরে শেয়ার ক্রয়ের পরিকল্পনায় রয়েছে কোম্পানির স্বার্থসংশ্লিষ্টরা। এরপরই সুবিধাজনক কোনো সময়ে জমি কেনার তথ্য প্রকাশ করা হবে। কোম্পানির ব্যবসা সম্প্রসারণে এই জমি ব্যবহার করা হবে, যা বছর শেষে কোম্পানির মুনাফা বৃদ্ধি করবে। এমন ঘোষণা দিয়ে শেয়ারদর বৃদ্ধি করা হবে। নিম্ন দরে কেনা শেয়ার উচ্চ দরে বিক্রি করবে কোম্পানির স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান। এভাবেই কোম্পানিটির শেয়ার কারসাজি হতে পারে আশঙ্কা করছেন বিনিয়োগকারীরা।

এ বিষয়ে ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশনের (ডিবিএ) প্রেসিডেন্ট শাকিল রিজভী বলেন, ‘মূল্য সংবেদশনীল তথ্য যথাসময়ে নিয়মমাফিক বিনিয়োগকারীদের জানানো প্রয়োজন। এজন্য নীতিমালাও রয়েছে। কিছু কোম্পানি এ নিয়ম মানছে না। সাম্প্রতিক সময়ে এ প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোকে এই বিষয়ে দেখা উচিত। এটি বাজারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা বৃদ্ধি ও সুশাসনের জন্য প্রয়োজন।’

কোম্পানির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালে কোম্পানিটি ২০৮ কোটি ৪৪ লাখ টাকা মুনাফা করে। ২০১৮ সালে তা দাঁড়ায় ২১১ কোটিতে। বছরটিতে বিনিয়োগকারীদের জন্য ৪৫ শতাংশ নগদ ও পাঁচ শতাংশ বোনাস ঘোষণা লভ্যাংশ দিয়েছে।

এমজেএল বাংলাদেশের বিরুদ্ধে শ্রম আইন লঙ্ঘন করে শ্রমিক-কর্মচারীদের ঠকানোরও অভিযোগ রয়েছে। কোম্পানিটির অডিটকারী প্রতিষ্ঠান ডিএসইকে জানিয়েছে, ৩০ জুন, ২০১৮ সালের সমাপ্ত বছর পর্যন্ত এমজেএল বাংলাদেশ লিমিটেড শ্রম আইন অনুযায়ী, ওয়ার্কার্স প্রফিট পার্টিসিপেশন ফান্ড (ডব্লিউপিপিএফ) গঠন করেনি। নিয়ম অনুযায়ী, কর পূর্ববর্তী মোট মুনাফার পাঁচ শতাংশ এই তহবিলে দেওয়ার কথা। কিন্তু কোম্পানিটি সর্বশেষ বছরে এটি গঠন করেনি।

সর্বশেষ..