প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

এমারেল্ড অয়েল: এমডির শেয়ার বিক্রি বন্ধে ব্যাংক এশিয়ার চিঠি

নিয়াজ মাহমুদ: পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির পরেই ঋণখেলাপি হয়ে পড়েছে খাদ্য ও আনুষঙ্গিক খাতের এমারেল্ড অয়েল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড। সম্পদের চেয়ে ঋণ বেশি দাঁড়িয়েছে ২০১৪ সালে তালিকাভুক্ত এ কোম্পানিটির। দায় পরিশোধ করার পর শেয়ারহোল্ডারদের ইক্যুইটিতে বড় ধরনের ঘাটতি থাকবে। উচ্চ আর্থিক লিভারেজের (ঋণজনিত ঝুঁকি) কারণে প্রতিষ্ঠানটি বড় ধরনের সংকটে পড়েছে। আর বিষয়টি উপলব্ধি করতে পেরে কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালকের (এমডি) হাতে থাকা ১১ কোটি ছয় লাখেরও বেশি শেয়ার বিক্রি বা স্থানান্তর বন্ধ রাখতে নিয়ন্ত্রক সংস্থাসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে আবেদন করেছে ব্যাংক এশিয়া কর্তৃপক্ষ।

জানা গেছে, বেসরকারি খাতের ব্যাংক এশিয়ার বসুন্ধরা শাখায় এমারেল্ড অয়েলের ২২ কোটি ৩২ লাখ টাকা ঋণখেলাপি, যার অ্যাকাউন্ট নম্বর ০২৩৩৩০০১২৪০। ঋণের সর্বশেষ কিস্তি পরিশোধের সময় ছিল গত বছরের ৫ এপ্রিল। গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ঋণের সুদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে তিন কোটি ১৮ লাখ ২৮ হাজার। আর সীমার অতিরিক্ত ঋণ (এক্সেস ওভার লিমিট) দেখানো হয়েছে দুই কোটি ৩২ লাখ ৬৯ হাজার টাকা। এছাড়া বেসিক ব্যাংকের দিলকুশা শাখা থেকে ৬১ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। এরপর কোনো কিস্তিই পরিশোধ করেনি। ফলে সুদ আসল মিলিয়ে বেসিক ব্যাংকের পাওনা দাঁড়িয়েছে ৭৪ কোটি টাকা। এছাড়া কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের কাছে কোম্পানির ঋণ রয়েছে।

জানা যায়, ঋণখেলাপি হওয়ার কারণে কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ হাসিবুল গনি গালিবের হাতে থাকা ১১ কোটি ছয় লাখ ২০ হাজার শেয়ার বিক্রি বা স্থানান্তর করতে সংশ্লিষ্ট পাঁচটি প্রতিষ্ঠানে চিঠি দিয়েছে ব্যাংক এশিয়ার উপব্যবস্থাপনা পরিচালক হুমায়রা আজম। একই চিঠি নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি), ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই), চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই), সিডিবিএল ও লংকাবাংলা সিকিউরিটিজকে দেওয়া হয়েছে। এ সিকিউরিটিজ হাউজে এমারেল্ড ওয়েলের এমডির বিও হিসাব নং-১২০৪২৪০০৫২৯২১৮৫৪।

১১ ডিসেম্বর পাঠানো ব্যাংক এশিয়ার চিঠিতে এমারেল্ড অয়েলের এমডির বিষয়ে যাবতীয় তথ্যের পাশাপাশি পরিচালকদেরও নাম উল্লেখ করে বলা হয়, ঋণ পরিশোধে তিন দফা সময় বাড়ানো হলেও কোম্পানিটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ব্যর্থ হয়। ব্যাংক এশিয়া আইনিভাবে ঋণ আদায় করারও ব্যবস্থা নিচ্ছে; একই সঙ্গে শেয়ার বিক্রি বা স্থানান্তর করতে অনুরোধ জানানো হয় ওই চিঠিতে।

এদিকে ঋণ জালিয়াতির দায়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) করা মামলায় গত ২৮ মার্চ কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালককে সৈয়দ হাসিবুল গনি গালিবকে গ্রেফতার করে গুলশান থানা পুলিশ। বর্তমানে তিনি জামিনে আছে দাবি করছেন কোম্পানি সচিব মেহেরুন্নেছা রোজি। তবে এ বিষয়ে তিনি আর কিছু বলতে রাজি হননি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কোম্পানির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এ প্রসঙ্গে শেয়ার বিজকে বলেন, মূলত বছরের শুরু থেকেই শেরপুরের কারখানার উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। সম্প্রতি ডিএসইতে উৎপাদন চালুর ঘোষণা দিলেও পুরোপুরি চালু হয়নি। বিভিন্ন রাইস মিল থেকে কুঁড়া সংগ্রহ করে এ কোম্পানিটি তেল তৈরি করে বাজারজাত করে। বর্ষা মৌসুমে তেল পাওয়া যায় না। এ কারণে উৎপাদন বন্ধ রাখা হয়েছে। উৎপাদন বন্ধ, তাই ঋণ পরিশোধ করা যাচ্ছে না বলে জানান ওই কর্মকর্তা।

কোম্পানির কারখানা শেরপুরে। স্পন্দন রাইস অয়েল উৎপাদনকারী এ কোম্পানির অফিস রাজধানীর বিজয়নগরের স্কাইভিউ টাওয়ারে। সপ্তম ও দশম দুই ফ্লোর ভাড়া নিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করছে প্রতিষ্ঠানটি। দীর্ঘদিন উৎপাদন বন্ধ থাকা এ প্রতিষ্ঠান গত সপ্তাহে উৎপাদন চালু করেছে বলে ডিএসইর ওয়েবসাইটে জানায়। আর এ ঘোষণার পরে শেয়ারদর বাড়তে থাকে।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের ওয়েবসাইটে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটির মোট সম্পদের পরিমাণ ৮০ কোটি টাকার কিছু বেশি। আর এ পর্যন্ত খোঁজ পাওয়া ঋণের পরিমাণ প্রায় ৯৭ কোটি টাকা। এর অর্থ হচ্ছে পুরো কোম্পানি বিক্রি করে দিলেও ব্যাংকের দেনা থাকবে আরও ১৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে বেসিক ব্যাংকের ঋণ ৭৪ কোটি টাকা এবং ব্যাংক এশিয়ায় ২৩ কোটি টাকা। অন্যদিকে প্রতিষ্ঠানটি ঋণের টাকা পরিশোধ না করে বিনিয়োগকারীদের জন্য লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে।

দায় পরিশোধ করার পর শেয়ারহোল্ডারদের ইক্যুইটি ১৭ কোটি টাকা ঘাটতি থাকবে। এর অর্থ হলো উচ্চ আর্থিক লিভারেজের (ঋণজনিত ঝুঁকি) কারণে ভবিষ্যতে প্রতিষ্ঠানটি বড় ধরনের সংকটে পড়তে পারে। এমনকি দেউলিয়াও হয়ে যেতে পারে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।

এদিকে ঋণখেলাপি থাকার পরও জুন ২০১৫ অর্থবছর শেষে কোম্পানিটি ২০ শতাংশ লভ্যাংশ ঘোষণা করে। এর মধ্যে ১০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ এবং ১০ শতাংশ বোনাস শেয়ার। গত বছরের ২৮ অক্টোবর এ লভ্যাংশ ঘোষণা করা হয়। এরপরের অর্থবছর জুন ২০১৬ সমাপ্ত অর্থবছরে পরিচালনা পর্ষদ শেয়ারহোল্ডারদের জন্য ১০ শতাংশ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে। এর পুরোটাই স্টক।  এ সময়ে কোম্পানির শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) হয়েছে তিন টাকা ৩১ পয়সা। কোম্পানির বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) অনুষ্ঠিত হবে ৩১ ডিসেম্বর। এর জন্য রেকর্ড ডেট ছিল ১৮ ডিসেম্বর।

২০১৪ সালে আইপিওতে আসার আগে এমারেল্ড অয়েলের পরিশোধ মূলধন ছিল ২৭ কোটি টাকা। এরপর আইপিওর মাধ্যমে শেয়ারবাজার থেকে ২০ কোটি টাকা নেয়। ফলে মূলধন দাঁড়ায় ৪৭ কোটি টাকা। পরবর্তী সময় দুই দফা বোনাস শেয়ার দেওয়ার পর বতর্মানে প্রতিষ্ঠানটির পরিশোধিত মূলধন ৫৪ কোটি ২৯ লাখ টাকা।

‘এ’ ক্যাটাগরির এ কোম্পানির মোট শেয়ারের উদ্যোক্তাদের কাছে রয়েছে ৩০ দশমিক ৪৫ শতাংশ শেয়ার। ২১ জন উদ্যোক্তার মধ্যে কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক হাসিবুল গনি গালিব ও তার স্ত্রী ফারহানা গালিব এমির কাছে রয়েছে সিংহভাগ শেয়ার। এছাড়া অন্যান্য উদ্যোক্তারাও প্রায় একই পরিবারের সদস্য। এ হিসেবে পরিবারতান্ত্রিক কোম্পানিই এটি। কোম্পানিটির ১৩ দশমিক ৫২ শতাংশ শেয়ার প্রাতিষ্ঠানিক ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে রয়েছে ৫৬ দশমিক ৩ শতাংশ শেয়ার।