প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

এলএনজি পরিবহনের জাহাজ সংগ্রহে অগ্রগতি নেই

সাইফুল আলম, চট্টগ্রাম: বাংলাদেশ প্রায় চার বছর আগে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি যুগে প্রবেশ করে। প্রতিবছর এলএনজি আমদানির পরিমাণ বাড়ছে। একই সঙ্গে বাড়ছে এলএনজিবাহী বিদেশি জাহাজের আগমন। কিন্তু বাংলাদেশি পতাকাবাহী জাহাজ না থাকায় এ খাতে পরিবহন ব্যয় বাবদ শত শত কোটি টাকা বৈদেশিক মুদ্রা বিদেশে চলে যাচ্ছে। অথচ কয়েক বছর আগে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন (বিএসসি) এলএনজি পরিবহনের জাহাজ সংগ্রহের পরিকল্পনা নিয়েছিল। কিন্তু আন্তঃমন্ত্রণালয়ের অনুমোদন না পাওয়ায় ও অর্থ সংকটের কারণে পিছিয়ে পড়েছে সংস্থাটি।

জ্বালানি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৮ সালের ২৪ এপ্রিল ‘এক্সিলেন্স’ নামে একটি বিশেষায়িত জাহাজ এক লাখ ৩৬ হাজার ঘনমিটার এলএনজি নিয়ে কক্সবাজারের মহেশখালী দ্বীপের মাতারবাড়ী উপকূলে আসে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ এলএনজি যুগে প্রবেশ করে। বর্তমানে দেশের গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে বর্তমানে দৈনিক ১৫৯ কোটি ৩০ লাখ ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন করা হচ্ছে। প্রায় ৩৭০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা থাকলেও এলএনজি ও প্রাকৃতিক গ্যাস মিলিয়ে সরবরাহ করা হচ্ছে গড়ে ২৭০ কোটি ঘনফুট। সে হিসেবে ঘাটতি থেকে যাচ্ছে প্রায় ৮০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের। যদিও দেশে আমদানির বিদ্যমান অবকাঠামোতে প্রতিদিনের হিসেবে সর্বোচ্চ ১০০ কোটি ঘনফুট এলএনজি আমদানি করা সম্ভব। আর বর্তমান সময়েই আমদানি হচ্ছে ৯০ কোটি ঘনফুট।

আগামী বছরগুলোয় দেশের গ্যাসক্ষেত্রগুলোয় উৎপাদন আরও কমলে চাহিদা পূরণে তখন অতিরিক্ত এলএনজি আমদানি করতে হবে। এতে অতিরিক্ত জাহাজ আসবে। যদিও কাতার গ্যাস থেকে ২০১৮ সালের ২৪ এপ্রিল থেকে ২০২১ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত ১১০টি কার্গোর মাধ্যমে ১৫ দশমিক ৩৪ মিলিয়ন ঘনমিটার গ্যাস আমদানি করা হয়। একই সময়ে আরেক প্রতিষ্ঠান ওমান ট্রেডিং (পরে ওকিউটি) ৫৮টি কার্গোর মাধ্যমে আট দশমিক ৪০ মিলিয়ন ঘনমিটার এবং ২০২০ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর থেকে ২০২১ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত স্পট মার্কেট থেকে ১১ কার্গোর মাধ্যমে এক দশমিক ৫৯ মিলিয়ন ঘনমিটার এলএনজি গ্যাস আমদানি করা হয়। অর্থাৎ গত চার বছরের বাংলাদেশে ১৭৯টি জাহাজের মাধ্যমে ২৫ দশমিক ৩৩ মিলিয়ন ঘনমিটার গ্যাস আমদানি করা হয়। 

অন্যদিকে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন (বিএসসি) এমন বাস্তবতা বিবেচনা করে বছর চারেক আগে মোট ছয়টি এলএনজিবাহী জাহাজ কেনার প্রাথমিক প্রকল্প গ্রহণ করে। এর মধ্যে এক লাখ ৪০ হাজার ঘনমিটার মিটার ধারণক্ষমতার দুটি, এক লাখ ৭৪ হাজার ঘনমিটারের দুটি এবং এক লাখ ৮০ হাজার ঘনমিটারের আরও দুটি এলএনজি জাহাজ বহরে সংযুক্ত করার পরিকল্পনা নেয়া হয়। কিন্তু বছরের পর বছর এ পরিকল্পনার কোনো অগ্রগগতি হয় না। অথচ এ খাতে প্রতিবছর কয়েকশ কোটি টাকা ভাড়া বাবদ বিদেশি শিপিং সংস্থাগুলোর কাছে চলে যাচ্ছে। এমনকি বাংলাদেশি এলপিজি খাতের জায়ান্ট কোম্পানি বসুন্ধরা বছরখানেক আগে নিজেদের বহরের দেশের প্রথম কোম্পানি হিসেবে ‘বসুন্ধরা চ্যালেঞ্জারস’ নামে এলপিজি ক্যারিয়ার যুক্ত করে।

বিএসসির কর্মকর্তারা জানান, রামপাল, পায়রা ও মাতারবাড়ীতে তিনটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। এসব প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় কয়লা বিদেশ থেকে আমদানি করা হবে। দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার স্বার্থে কয়লা পরিবহনে নিরবচ্ছিন্ন সাপ্লাই চেইন গড়ে তোলার জন্য ৮০ হাজার টনের দুটি মাদার বাল্ক ক্যারিয়ার ক্রয় প্রকল্প নিয়েছে বিএসসি। এছাড়া বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের আমদানিকৃত সব ক্রুড অয়েল বিএসসির নিজস্ব জাহাজের মাধ্যমে পরিবহনের জন্য এক লাখ থেকে সোয়া এক লাখ টন ধারণক্ষমতার দুটি নতুন মাদার ট্যাংকার ক্রয়-সংক্রান্ত প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। আর বিপিসির সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) উইথ ডাবল পাইপলাইন শীর্ষক প্রকল্প সম্পন্ন হলে আমদানি করা ডিজেল ও জেট ফুয়েল পরিবহনের জন্য দুটি ৮০ হাজার টন ক্ষমতাসম্পন্ন মাদার প্রোডাক্ট অয়েল ট্যাংকার সংগ্রহের জন্য প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। কিন্তু এসব প্রকল্প এখনও মন্ত্রণালয় থেকে অনুমোদন পাওয়া যায়নি।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমোডর সুমন মাহমুদ সাব্বির শেয়ার বিজকে বলেন, বাংলাদেশ এলএনজির যুগে প্রবেশ করেছে। আমরাও এলএনজি জাহাজ সংগ্রহের প্রাথমিক পরিকল্পনা করেছি। এ বিষয়ে আমরা আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা করেছি। মিটিংয়ে একটি কমিটি গঠনও করা হয়। কিন্তু এখনও সেই কমিটির সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়নি। ফলে প্রকল্প বাস্তবায়নে তেমন অগ্রগতি হয়নি। তবে আমাদের বহরে এলএনজি জাহাজ থাকা দরকার। আর বিএসসির মতো গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় প্রতিষ্ঠানে দেশের বর্তমান চাহিদা বিবেচনায় বিভিন্ন ধরন ও সাইজের ৪০-৫০টি জাহাজ থাকা উচিত। কিন্তু বিভিন্ন প্রতিকূল কারণে বিশেষ করে প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান করতে না পারায় প্রয়োজনীয় সংখ্যক জাহাজ করপোরেশনের বহরে সংযোজন করা সম্ভব হয়নি। তবে বর্তমান সরকারের নির্দেশনা ও সক্রিয় সহযোগিতায় এ সংস্থা সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

উল্লেখ্য, ২০২০-২১ অর্থবছরে বিএসসির মোট আয় হয় ৩২২ কোটি ৯৭ লাখ টাকা। এর মধ্যে পরিচালনা খাতে আয় ২৭৪ কোটি ২৭ লাখ টাকা এবং অন্যান্য খাতে আয় ৪৮ কোটি ৭০ লাখ টাকা। পরিচালনা ব্যয় ১৬০ কোটি ২২ লাখ, প্রশাসনিক ও আর্থিক খাতে ব্যয় ৬৭ কোটি পাঁচ লাখ টাকা। মোট ব্যয় ২২৭ কোটি ২৭ লাখ টাকা। নিট মুনাফা ৭২ কোটি দুই লাখ টাকা, যা আগের বছরের চেয়ে ৩০ কোটি ৫৫ লাখ টাকা বেশি। এর আগের বছর কর সমন্বয়ের পর নিট মুনাফা ছিল ৪১ কোটি ৪৭ লাখ টাকা। এবার শেয়ারহোল্ডারদের নিট লাভ থেকে ১২ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দেয়া হয়।