সম্পাদকীয়

এলডিসি-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রস্তুতি নিন

স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণ আমাদের জন্য বড় আনন্দের। কেননা নিজেদের চেষ্টায় এগিয়ে যাব আমরা, অন্যের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে হবে না। গত শুক্রবার জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট (সিডিপি) এলডিসি থেকে উত্তরণের এই সুপারিশ করেছে। এজন্য অবশ্য কিছু শর্ত পূরণ করতে হবে। ২০১৮ ও ২০২১ সালের ত্রিবার্ষিক মূল্যায়নে ওই শর্তগুলো পূরণ করতে পেরেছি আমরা। এ ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকলে ২০২৬ সালে এলডিসি থেকে পুরোপুরি বের হয়ে যাবে বাংলাদেশ।

এলডিসি থেকে বের হলে আমাদের কিছু বাণিজ্য ও অন্যান্য সুবিধা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হবে। কেননা উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হলে সহায়তা-সাহায্য ছাড় পাওয়ার ও নেয়ার নৈতিক যুক্তি থাকে না। তখন ওই সুবিধাগুলো পায় স্বল্পোন্নত দেশগুলো। তাই আমাদের বুঝতে হবে, উন্নতিও করছি আবার সাহায্যও চাইছি; এটি প্রত্যাশিত নয়।

উন্নয়নশীল দেশ হলে আমাদের কী চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে, সেটি আমরা জানি বলে তা মোকাবিলা করা সহজতর হবে। সবচেয়ে বড় প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হবে রপ্তানি খাত। এত দিন আমরা বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) আওতায় শুল্কমুক্ত বাণিজ্যসুবিধা পেয়েছিলাম। নিয়ম অনুযায়ী, ২০২৬ সালে এসব সুবিধা বন্ধ হয়ে যাবে। যদিও ইইউতে জিএসপির আওতায় এ শুল্কমুক্ত সুবিধা থাকবে ২০২৭ সাল পর্যন্ত।

এলডিসি থেকে উত্তরণে কিছু বাণিজ্য ও অন্য সুবিধাগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হবে। তখন বিশ্ববাজারে বাংলাদেশি পণ্যে নিয়মিত হারে শুল্ক বসবে। ডব্লিউটিওর সাম্প্রতিক তথ্য হলো, বাড়তি শুল্কের কারণে রপ্তানি বছরে ৫৩৭ কোটি ডলার বা সাড়ে ৪৫ হাজার কোটি টাকা কমতে পারে। এলডিসি থেকে বের ওষুধশিল্প বড় ধরনের চ্যালেঞ্জে পড়বে। তখন মেধাস্বত্ব বিধি আরও কড়াকড়ি হবে। এত দিন আমাদের ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আবিষ্কারক প্রতিষ্ঠানকে মেধাস্বত্বের জন্য অর্থ দিতে হতো না। এখন মেধাস্বত্বের (পেটেন্ট) ওপর অর্থ দিতে হবে। ফলে ওষুধের দাম বেড়ে যেতে পারে।

এলডিসি থেকে উত্তরণ মানে দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বেড়েছে। অতএব সহযোগী সাহায্য সংস্থাগুলোর কাছ থেকে সহজ শর্তের ঋণ পাওয়া যাবে না। এখন ভর্তুকি ও নগদ সহায়তা দেয়া বন্ধ করাসহ রেমিট্যান্স আনায় নগদ সহায়তা দেয়ায় আপত্তি উঠতে পারে। খরচও বাড়বে এলডিসি থেকে বের হলে। জাতিসংঘে চাঁদার পরিমাণ বাড়বে। জাতিসংঘের বিভিন্ন সভায় যোগ দিতে সৌজন্য টিকিট পাওয়া যাবে না, কিনতে হবে। কমে যাবে আন্তর্জাতিক সংস্থা ও উন্নত দেশগুলোর দেয়া শিক্ষার্থীদের নানা ধরনের বৃত্তি।

এতসব চ্যালেঞ্জ আমাদের মোকাবিলা করতে হবে, তা আমরা আগে থেকেই জানি। ফলে বিনিয়োগ আকর্ষণে বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নত করতে হবে। অবকাঠামো ও মানবসম্পদ খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। রপ্তানিপণ্যে বৈচিত্র্য আনতে হবে, নতুন বাজার খুঁজতে হবে। বিভিন্ন দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তি করা গেলে বেশিসংখ্যক পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়া যাবে। বাণিজ্য প্রতিযোগিতা সক্ষমতার ওপর যে বিরূপ প্রভাব পড়বে, তা মোকাবিলায় এখন থেকেই প্রস্তুতি নিতে হবে।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..