প্রচ্ছদ শেষ পাতা

এলাচের দাম কেজিতে বেড়েছে হাজার টাকা

সিন্ডিকেটের কারসাজি

সাইদ সবুজ, চট্টগ্রাম: এলাচের বাজার নিয়ে ফের কারসাজি শুরু হয়েছে। নভেম্বরের শুরু থেকে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছে খাতুনগঞ্জের একটি সিন্ডিকেট। কদিনের ব্যবধানে তারা কেজিতে হাজার টাকা পর্যন্ত দাম বাড়িয়েছে। অক্টোবরে দুই হাজার ১৫০ টাকা দিয়ে বাজার শুরু হলেও নভেম্বরের মাঝামাঝিতে মসলাটির দাম তিন হাজার টাকা ছাড়িয়ে যায়। যদিও শুল্কসহ প্রকৃত আমদানি মূল্য ৮৫৭ টাকার বেশি নয়। কিন্তু সারা দেশের মসলার বাজার খাতুনগঞ্জ থেকে নিয়ন্ত্রণ হওয়ায় ডিও (সিøপ/টোকেন) ব্যবসার মাধ্যমে দাম বৃদ্ধি করছে অবৈধ সিন্ডিকেট।

যদিও খাতুনগঞ্জ মসলা বাজারের সিন্ডিকেট সদস্যরা বলছে, দুবাই ও ভারতে এলাচের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। আর গুয়াতেমালা থেকে বাংলাদেশসহ এশিয়ার অনেক দেশ এলাচ আমদানি করে। কিন্তু বর্তমানে গুয়াতেমালা বাংলাদেশে এলাচ রফতানি করছে না। তাই বাজারে এলাচের সংকট দেখা দিয়েছে, এতে দাম বৃদ্ধি পেয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রকৃতপক্ষে এলাচ আমদানি স্বাভাবিক আছে, দামও বৃদ্ধি পায়নি। গত ১ জুলাই থেকে ২৩ নভেম্বর পর্যন্ত চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে বাংলাদেশে ১১ লাখ ৯২ হাজার ৯৬০ কেজি এলাচ আমদানি হয়েছে, যার দাম ১০২ কোটি ২৮ লাখ ৬০ হাজার ৫৭ টাকা। এতে প্রতি কেজি এলাচের দাম পড়ে শুল্কসহ ৮৫৭ টাকা করে। ২৪ আমদানিকারক ৮৩ চালানের মাধ্যমে এই এলাচ আমদানি করে। এর মধ্যে দু-তিনজন ছাড়া সবাই খাতুনগঞ্জের আমদানিকারক।

এসব আমদানিকারকের মধ্যে সর্বোচ্চ এলাচ আমদানি করে খাতুনগঞ্জ হক মার্কেটের আবু মোহাম্মদ অ্যান্ড কোম্পানি। এ আমদানিকারক প্রতি কেজি ৮৫৭ টাকা ৫০ পয়সা করে তিন লাখ ৭২ হাজার কেজি এলাচ আমদানি করে গত চার মাসে, যার আমদানি মূল্য ৩১ কোটি ৯০ লাখ ১২ হাজার ২৪১ টাকা। তারপর সর্বোচ্চ এলাচ আমদানি করে বাংলাদেশ হোলসেলার স্পাইসি মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি অমর কান্তি দাসের দুই প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে এবি দাস অ্যান্ড ট্রেডিং কোম্পানির নামে এক লাখ ২৮ হাজার ৯০০ কেজি এলাচ আমদানি করে অমর কান্তি, যার আমদানি মূল্য ১১ কোটি পাঁচ লাখ ৪১ হাজার ৫৪৮ টাকা। এতে প্রতি কেজি এলাচের দাম পড়ে ৮৫৭ টাকা ৫০ পয়সা। একই সঙ্গে বিআর ট্রেডিংয়ের মাধ্যমে এক লাখ ৬৯ হাজার ৮০০ কেজি এলাচ আমদানি করে অমর, যার আমদানি মূল্য ১৪ কোটি ৫৬ লাখ ২৫ হাজার ৮২১ টাকা। এতে প্রতি কেজি এলাচের দাম ৮৫৭ টাকা ৬০ পয়সা। এছাড়া ইলিয়াস মার্কেটের মেসার্স এমকে এন্টারপ্রাইজ চাক্তাইয়ের মিতা স্টোরস, খাতুনগঞ্জের মেসার্স ট্রেড লিংক এজেন্সি, চাক্তাইয়ের প্যারাগন এন্টারপ্রাইজ, রাজাখালীর আজাদ ফুড অ্যান্ড কনজুমার প্রোডাক্ট, আসদগঞ্জের মজুমদার ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল, ১৬/বি কাজেম আলী রোডের সাউদার্ন ট্রেডিং ও খাতুনগঞ্জের এসএম এন্টারপ্রাইজ, খাতুনগঞ্জের মিলন অ্যান্ড ব্রাদার্সসহ আরও কজন আমদানিকারক ৮৪৮ টাকা থেকে ৮৬০ টাকার মধ্যে এলাচ আমদানি করে গত চার মাসে।

অপরদিকে গত অর্থবছরে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে দেশে এলাচ আমদানি হয় ৪৩ লাখ ৯৬ হাজার ৬১৪ কেজি; যার প্রতি কেজির আমদানি মূল্য ছিল ৮৫৩ টাকা। আর ৫৮ আমদানিকারক এ এলাচ আমদানি করে। এর মধ্যে ৪৭ জনই খাতুনগঞ্জের আমদানিকারক। আর সারা দেশ মিলে বাদবাকি ১১ জন। আবার দেখা যায়, পুরো আমদানির ৬০ শতাংশের বেশি এলাচ আমদানি করে মাত্র ১১ জন মিলে। এর মধ্যে ঢাকার একজন ছাড়া বাকি ১০ জনই চট্টগ্রামের।

এ ১০ জনের মধ্যে সর্বোচ্চ এলাচ আমদানিকারক ছিল অমর কান্তির দুই প্রতিষ্ঠান। ওই দুই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ৯ লাখ ৬৭ হাজার ৫৬০ কেজি এলাচ আমদানি করেছিল। এর মধ্যে বিআর ট্রেডিংয়ের মাধ্যমে পাঁচ লাখ ১৭ হাজার ৩৬০ কেজি, যার প্রতি কেজি ৮৫১ টাকা করে। আর এবি দাস অ্যান্ড ট্রেডিং কোম্পানির মাধ্যমে চার লাখ ৫০ হাজার ২০০ কেজি, যার প্রতি কেজি ৮৫৪ টাকা করে। এরপর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ এলাচ আমদানি করেছিল আবু মোহাম্মদ অ্যান্ড কোম্পানি। এ প্রতিষ্ঠান প্রতি কেজি ৮৫৪ টাকা দরে আট লাখ ১৯ হাজার ৫৮০ কেজি এলাচ আমদানি করেছিল। এরপর রয়েছে মেসার্স এমকে এন্টারপ্রাইজ দুই লাখ পাঁচ হাজার ৩০০ কেজি, মিতা স্টোরস এক লাখ ৮৮ হাজার ৪৪০ কেজি, ঢাকার প্রতিষ্ঠান হেদায়েত অ্যান্ড ব্রাদার্স এক লাখ ৬৪ হাজার ৪০০ কেজি আমদানি করে। এছাড়া খাতুনগঞ্জের মেসার্স ট্রেড লিংক এজেন্সি, চাক্তাইয়ের প্যারাগন এন্টারপ্রাইজ, রাজাখালীর আজাদ ফুড অ্যান্ড কনজুমার প্রোডাক্ট, আসদগঞ্জের মজুমদার ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল, ১৬/বি কাজেম আলী রোডের সাউদার্ন ট্রেডিং ও খাতুনগঞ্জের এসএম এন্টারপ্রাইজ ১০০ মেট্রিক টনের ওপরে এলাচ আমদানি করেছিল।

কিন্তু খাতুনগঞ্জ পাইকারি বাজারে গিয়ে আমদানি মূল্যের সঙ্গে কোনো সামঞ্জস্য পাওয়া যায়নি। দেখা যায়, আমদানি মূল্যের কয়েকগুণ বেশি দামে পাইকারি বাজারে এলাচ বিক্রি হচ্ছে। অথচ গত দেড় বছরের আমদানি মূল্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ৮৬০ টাকার ওপরে বাংলাদেশে কোনো এলাচ আমদানি হয়নি। এই সিন্ডিকেট ঈদুল আজহার আগেও কারসাজি করে দাম বাড়িয়েছিল। কিন্তু সরকারি সংস্থা বাজার মনিটরিং করলে দাম কমে। তারপর দুই মাস কিছুটা স্থিতিশীল থাকার পর নভেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে ফের এলাচের দাম বাড়তে শুরু করে। যেখানে অক্টোবরে এলাচের বাজার শুরু হয়েছিল দুই হাজার ১৫০ টাকা কেজি হিসাবে, যা নভেম্বরের শেষ সপ্তাতে তিন হাজারের ওপরে উঠে যায়। তবে গত দুদিন কিছুটা নিম্নমুখী হয়ে দুই হাজার ৭৫০ থেকে দুই হাজার ৯০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে।

খাতুনগঞ্জের একাধিক পাইকারি ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কয়েকজন আমদানিকারক ও কিছু পাইকারি ব্যবসায়ী মিলে ১০-১৫ জনের একটি সিন্ডিকেট এলাচের বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। তারা ডিও ব্যবসার মাধ্যমে বাজারে দাম বৃদ্ধি করছে।

খাতুনগঞ্জের এক পাইকারি ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘এই সিন্ডিকেটে রয়েছে নবী মার্কেটের বিআর ট্রেডিংয়ের অমর কান্তি দাস, আবু মোহাম্মদ অ্যান্ড কোম্পানি, এজাজ মার্কেটের মেসার্স নিপুতি মজুমদারের রণি মজুমদার, এশিয়া ট্রেডিং, এজাজ অ্যান্ড সন্স, মিলন অ্যান্ড ব্রাদার্স, স্বাধীন এন্টারপ্রাইজ, অরবিটের ছালাম, ফেরদৌস ট্রেডিং, জাহেদ অ্যান্ড ব্রাদার্স, মেসার্স টিএন ট্রেডিংয়ের মোহাম্মদ আলী, আলম ব্রাদার্স, এনএস করপোরেশন, আলতাফ ব্রাদার্স, এশিয়া ট্রেডিং, মোহাম্মদিয়া করপোরেশন, ইলিয়াস মার্কেটের গুলিস্তান, সিমরান এন্টারপ্রাইজের জাহাঙ্গীর আলম, নায়েম ট্রেডিং, ন্যাশনাল ট্রেডিং, মদিনা ট্রেডিংয়ের হারুন, আবদুর রউফ নামে আরও একজন রয়েছেন। এসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান মিলে সিন্ডিকেট তৈরি করছে।’

অন্য এক পাইকারি ব্যবসায়ী বলেন, ‘সিøপ বিক্রি একটি অবৈধ ব্যবসা। সিøপ বিক্রির নামে জুয়া অহরহ চলে খাতুনগঞ্জে। আর এই ডিও ব্যবসায় গত ২০ বছরে অনেক ব্যবসায়ী দেউলিয়া হয়ে গেছেন। বেশ কিছুদিন যাবৎ ব্যবসায়ীদের চরম আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। সরকারের উচিত, জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে এই দুষ্টচক্রের হোতাদের আইনের আওতায় এনে আসল ব্যবসায়ীদের সহজভাবে ব্যবসা করার পরিবেশ সৃষ্টি করা।’ এ বিষয়ে বাংলাদেশ হোলসেলার স্পাইসি মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি অমর কান্তি দাস শেয়ার বিজকে বলেন, ‘ভারতে প্রতি কেজি এলাচ বিক্রি হচ্ছে সাড়ে তিন হাজার টাকার ওপরে। আর বর্তমানে গুয়াতেমালা থেকে সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না, অক্টোবর থেকে আমদানি বন্ধ। তবে ডিও ব্যবসার কারণে দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। ছয় মাস আগেও এলাচের বাজারে ডিও ব্যবসা ছিল না। কারা এর সঙ্গে জড়িত, তা খুঁজে বের করুন।’

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..