প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

এডিবির প্রতিবেদন : এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে বিদ্যুৎবিভ্রাটের শীর্ষে বাংলাদেশ

 

ইসমাইল আলী: গত সাত বছরে দেশের বিদ্যুৎ খাতে যথেষ্ট অগ্রগতি হয়েছে। উৎপাদন সক্ষমতা এ সময় তিনগুণের বেশি বেড়ে ১৫ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিমাণও বেড়েছে প্রায় তিনগুণ। তা সত্ত্বেও কমেনি বিদ্যুৎবিভ্রাট তথা লোডশেডিং। গ্রীষ্ম মৌসুমে নিয়মিতই চলে বিদ্যুতের যাওয়া-আসা। শীতে এ প্রবণতা কমলেও বিদ্যুৎবিভ্রাটে বাংলাদেশ রয়ে গেছে শীর্ষ তালিকাতেই।

এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) ‘মিটিং এশিয়া’স ইনফ্রাসট্রাকচার নিডস’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনটি গতকাল এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে এডিবির সদস্য দেশগুলোতে একযোগে প্রকাশ করা হয়।

এতে বলা হয়, এশিয়ার উন্নয়নশীল দেশগুলোতে মাথাপিছু বিদ্যুৎ উৎপাদন দ্রুত হারে বাড়ছে। ২০০০ থেকে ২০১২ সালে এটি বছরে গড়ে সাত দশমিক ৪০ শতাংশ হারে বেড়েছে। তবে এ হার এখনও অন্যান্য উন্নয়নশীল অর্থনীতিগুলোর চেয়ে কিছুটা পিছিয়ে রয়েছে। এছাড়া দক্ষিণ-পূর্ব ও দক্ষিণ এশিয়া এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের বেশকিছু দেশ এখনও মাথাপিছু বিদ্যুৎ উৎপাদনে আঞ্চলিক গড়ের চেয়ে পিছিয়ে রয়েছে। এজন্য দেশগুলোতে বিদ্যুৎবিভ্রাটের পরিমাণ অনেক বেশি। এতে দেশগুলোর উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। আর হ্রাস পাচ্ছে শিল্প খাতের উৎপাদনশীলতা।

প্রতিবেদনের তথ্যমতে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে উন্নয়নশীল এশিয়ার চেয়ে বেশি বিদ্যুৎবিভ্রাট হয়। এর মধ্যে অন্যতম বাংলাদেশ, নেপাল ও পাকিস্তান। বাংলাদেশে মাসে গড়ে ৬৫ বার বিদ্যুৎবিভ্রাট ঘটে। নেপালে এর সংখ্যা মাসে ৫১ ও পাকিস্তানে ৩১। এছাড়া সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে আফগানিস্তানে ১৮, ভারতে ১৭, শ্রীলঙ্কায় আট ও ভুটানে দুবার বিদ্যুৎবিভ্রাট হয়।

এশিয়ার অন্যান্য দেশের মধ্যে তাজিকিস্তানে মাসে গড়ে সাতবার, উজবেকিস্তানে ছয়, কিরঘিজস্তান ও লাওসে পাঁচবার বিদ্যুৎবিভ্রাট হয়। এছাড়া টঙ্গো, ভানুয়াতু, ফিজি, মঙ্গোলিয়া, জর্জিয়া, থাইল্যান্ডে এ হার আরও কম। মাসে গড়ে এ হার তিন-চার। আর কাজাকস্তান, ভিয়েতনাম, আরমেনিয়া, আজারবাইজান, ইন্দোনেশিয়া ও ভুটানে মাসে গড়ে দু-তিনবার বিদ্যুৎবিভ্রাট ঘটে। চীন ও ফিলিপাইনে এ হার একেবারেই ন্যূনতম। মাসে এক-দুবার বিদ্যুৎবিভ্রাট হয় দেশ দুটিতে।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) চেয়ারম্যান খালেদ মাহমুদ শেয়ার বিজকে বলেন, এডিবির প্রতিবেদনের তথ্য জানা নেই। কারণ দেশে এখন কোনো লোডশেডিং নেই। মাঝে মাঝে বিদ্যুৎবিভ্রাট হলেও তার সংখ্যা অনেক কম। মূলত সঞ্চালন ও বিতরণ লাইনের সামঞ্জস্যতার অভাবে কোথাও কোথাও এ বিভ্রাট দেখা হয়। তবে মাসে গড়ে ৬৫ বার বিদ্যুৎবিভ্রাটের তথ্য সঠিক নয়।

এশীয়-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন দেশে বিদ্যুতের সিস্টেমলস নিয়ে আশঙ্কাজনক তথ্য উঠে এসেছে এডিবির প্রতিবেদনে। এতে বলা হয়, এশিয়ার বিভিন্ন দেশে বিদ্যুৎ বিতরণ ও সঞ্চালন লস অনেক বেশি। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি লস নেপালে, প্রায় ৩০ শতাংশ। আর কম্বোডিয়ায় ২৭, মিয়ানমারে ২৫, কিরগিজস্তানে ২০, ভারতে ১৮, পাকিস্তানে ১৭, তাজিকিস্তান ও মঙ্গোলিয়ায় ১৫ শতাংশ। চীন ও আজারবাইজানে এ হার ১৪ এবং বাংলাদেশে ১৩ শতাংশ।

বিদ্যুৎ খাতের নীতিগবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার সেলের সাবেক মহাপরিচালক বিডি রহমতউল্লাহ বলেন, বিদ্যুৎ খাতে উন্নয়নের কথা বলা হলেও বাস্তবে অর্জন খুব বেশি নয়। কারণ উৎপাদন বাড়লেও তা রেন্টাল-কুইক রেন্টালের ভিত্তিতে। এতে বেড়ে গেছে বিদ্যুতের দাম। আবার রেন্টাল-কুইক রেন্টালের নামে আনা হয়েছে নি¤œমানের যন্ত্রপাতি। এগুলো প্রায়ই বিকল হচ্ছে। ফলে বন্ধ রাখা হচ্ছে বিদ্যুৎকেন্দ্র। এজন্য লোডশেডিং কমেনি। আবার সিস্টেমলসের কারণে প্রচুর বিদ্যুৎ অপচয় হচ্ছে।

বিদ্যুৎ ছাড়াও এশিয়ার বিভিন্ন দেশের সড়ক ও রেল অবকাঠামোর তুলনা উঠে এসেছে প্রতিবেদনটিতে। এতে প্রতি ক্ষেত্রে বাংলাদেশের দুর্বল চিত্র দেখা যায়। এক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়েছে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের তথ্য। এক্ষেত্রে এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে সড়ক অবকাঠামোয় বাংলাদেশের অবস্থান শেষের সারিতে। সাতের মধ্যে বাংলাদেশের স্কোর তিন। এক্ষেত্রে গুণগত মানের দিক থেকে বাংলাদেশের চেয়ে খারাপ সড়ক রয়েছে শুধু নেপাল, মঙ্গোলিয়া ও কিরগিজস্তানে। আর সড়কের ঘনত্বের দিক থেকে ৩৭ দেশের মধ্যে ২৪। এক্ষেত্রে প্রতি এক হাজার বর্গকিলোমিটারের মধ্যে দেশে মহাসড়ক রয়েছে মাত্র ৫০ কিলোমিটার।

রেল অবকাঠামোর ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের অবস্থা খুব বেশি ভালো নয়। এক্ষেত্রে প্রতি এক হাজার বর্গকিলোমিটারের মধ্যে দেশে রেলপথ রয়েছে ২০ কিলোমিটার। তবে এক্ষেত্রে ১২ বছরে প্রবৃদ্ধি মাত্র দশমিক দুই শতাংশ। আর গুণগত মানের দিক থেকে বাংলাদেশের রেলপথ খুবই খারাপ।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও পরিবহন বিশেষজ্ঞ ড. শামছুল হক বলেন, সড়ক বা রেলের উন্নয়নে পাঁচ বছরে বিনিয়োগ হলেও তার গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। সড়ক শুধু প্রশস্ত করলেই চলবে না, তার ব্যবহার সময় কমছে কি না সেটা দেখা জরুরি। ৯০ দশকে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম যেতে প্রায় চার-পাঁচ ঘণ্টা লাগতো। অথচ এখন স্বাভাবিকভাবেই সাত-আট ঘণ্টা লাগছে। অর্থাৎ চার লেন হলেও তার সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। কারণ সড়কের পাশে বাজার, দোকান, স্থাপনা হয়ে যাচ্ছে। এমনকি বিনিয়োগের পরিকল্পিত ব্যবহার নিয়েও নানা প্রশ্ন রয়েছে। কারণ অনেকটা অ্যাডহক ভিত্তিতে বিভিন্ন প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে কী ধরনের প্রকল্প নেওয়া দরকার, তা অনেক ক্ষেত্রেই যাচাই করা হয়নি। ফলে বিনিয়োগের কোনো সুফল আসলে মেলেনি।