প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

এয়ারক্র্যাফট রক্ষণাবেক্ষণ : ত্রুটিপূর্ণ নীতিমালার বলি অ্যাভলন এভিয়েশন

পলাশ শরিফ: বিতর্কিত নীতিমালার শর্ত পূরণে ব্যর্থতার অভিযোগে এয়ারক্র্যাফট রক্ষণাবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান অ্যাভলন এভিয়েশনের অনুমোদন নবায়ন আটকে রেখেছে বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)। প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিমানবন্দরে প্রবেশের অনুমতি না দিতে মৌখিকভাবে কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে দরপত্র ছাড়াই অন্য দুটি প্রতিষ্ঠানকে এয়ারক্র্যাফট রক্ষণাবেক্ষণের অনুমতি দিতেই সুকৌশলে অ্যাভলনের কার্যক্রম বন্ধের চেষ্টা করা হচ্ছে বলেও তথ্য মিলেছে।

তথ্যানুসন্ধানে মিলেছে, ২০১৪ সালে এয়ারক্র্যাফট রক্ষণাবেক্ষণ প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন এবং রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামত বিষয়ে নতুন নীতিমালা তৈরি করেছে বেবিচক। ওই নীতিমালায় এয়ারক্র্যাফট রক্ষণাবেক্ষণের অনুমোদন পেতে ৪০ কোটি টাকা পরিশোধিত মূলধন, নিরাপত্তা তহবিলসহ  সাতটি শর্ত দেওয়া হয়েছে। তবে ওই নীতিমালা ‘ত্রুটিপূর্ণ, অসামঞ্জস্যপূর্ণ ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন নয়’ বলে মনে করছে এয়ারক্র্যাফট রক্ষণাবেক্ষণকারী একমাত্র প্রতিষ্ঠান অ্যাভলন এভিয়েশন। নীতিমালার ত্রুটির দিক ও বিশ্বের কয়েকটি দেশের একই ধরনের নীতিমালার তথ্য তুলে ধরে তা সংশোধনের জন্য ২০১৫ সালে মার্চে বেবিচককে লিখিতভাবে প্রস্তাব দিয়েছে অ্যাভলন এভিয়েশন। ওই প্রস্তাব আমলে নিয়ে তা সংশোধন প্রক্রিয়াও শুরু করেছে বেবিচক। তবে শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত নীতিমালা সংশোধন প্রক্রিয়া  শেষ হয়নি। আর কবে নাগাদ শেষ হবেÑসে সম্পর্কে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি।

একাধিক সূত্র জানিয়েছে, বিসমিল্লাহ এভিয়েশনসহ দেশীয় দুটি প্রতিষ্ঠানকে এয়ারক্র্যাফট রক্ষণাবেক্ষণ কাজের অনুমোদন দিতেই সামঞ্জস্যহীন ও বিতর্কিত ওই নীতিমালা তৈরি করা হয়েছে। আর সে নীতিমালার দোহাই দিয়ে অ্যাভলন এভিয়েশনকে বন্ধের ঝুঁকিতে ফেলা হয়েছে। অন্যদিকে দরপত্র ছাড়াই ওই দুই প্রতিষ্ঠানকে অনুমোদন দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। এর অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির অনুকূলে ‘বিমানবন্দরে প্রবেশ পাস’ আটকে রাখা হয়েছে বলেও দাবি করা হচ্ছে।

এসব বিষয়ে বক্তব্য জানতে বেবিচকের চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল এহসানুল গণি চৌধুরীর সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি। খুদেবার্তা পাঠিয়েও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। পরে সংস্থাটির এইআইডি বিভাগের উপ-পরিচালক আবু সাঈদ শেয়ার বিজকে বলেন, ‘নীতিমালা সংশোধন প্রক্রিয়া চলছে। তবে কবে শেষ হবে বলা মুশকিল। আর যে পর্যন্ত সংশোধন প্রক্রিয়া শেষ না হয় সে পর্যন্ত নীতিমালার বিদ্যমান ধারাই বলবৎ থাকবে। নীতিমালায় যা আছে সে অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানকে বাড়তি সুবিধা দিতে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে কি না তা আমার জানা নেই। এফএসআর বিভাগের পরিচালক বিদেশ থেকে ফিরলে তার সঙ্গে কথা বলতে পারেন।’

এদিকে সংশোধন প্রক্রিয়া চলাকালে সে বিতর্কিত নীতিমালার পরিশোধিত মূলধন ও নিরাপত্তা দোহাই দিয়ে অ্যাভলন এভিয়েশনের অনুমোদন আটকে দিয়েছে বেবিচক। ২০১৬ সালের ১৩ নভেম্বর সংস্থাটির পক্ষ থেকে অ্যাভলন এভিয়েশনকে পাঠানো চিঠিতে সংস্থাটির ফ্লাইট সেফটি অ্যান্ড রেগুলেশন্স (এফএসআর) বিভাগের উদ্ধৃতি দিয়ে এয়ারক্র্যাফট রক্ষণাবেক্ষণ প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন এবং রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতবিষয়ক নীতিমালা মেনে চলার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। ওই নীতিমালা অনুসরণ করা না হলে জায়গা ইজারা নবায়ন বিবেচনায় নেওয়া হবে না আর হালনাগাদ অনুমতিপত্র না থাকলে ২০১৬ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যেই প্রতিষ্ঠানটিকে ইজারা নেওয়ার জায়গা থেকে যাবতীয় স্থাপনা অপসারণ করতে হবে বলে সতর্ক করেছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ওই চিঠির ব্যাখ্যা দিয়ে বেবিচকের কাছে চিঠি পাঠিয়েছে অ্যাভলন এভিয়েশন। নতুন ওই নীতিমালা ত্রুটিপূর্ণ, অসামঞ্জস্যপূর্ণ ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন নয়। ওই নীতিমালা নিয়ে বেবিচকের এফএসআর বিভাগের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। নীতিমালাটি সংশোধন প্রক্রিয়া চলছে বলে জানিয়েছে উল্লেখ করে নীতিমালা সংশোধন ও নতুন করে দরপত্র প্রক্রিয়ার আগ পর্যন্ত অ্যাভলনের ইজারা নবায়নের অনুরোধ জানানো হয়েছে। তবে ওই চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে নতুন কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি।

বেবিচকের নীতিমালা অ্যাভলনের কার্যক্রম বন্ধের ঝুঁকি সম্পর্কে আলাপকালে প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান এম মনজুরুল করিম রনি শেয়ার বিজকে বলেন, বেবিচকের নীতিমালা ত্রুটিপূর্ণ, আন্তর্জাতিক মানসম্পন্নও নয়। বিশ্বের কোথাও এয়ারক্র্যাফট রক্ষণাবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠানকে এতো বেশি মূলধন ও নিরাপত্তা তহবিলের শর্ত দেওয়া হয় না। আমরা বিষয়গুলো বেবিচককে জানিয়েছে। তবে এখনও লিখিতভাবে কিছু জানানো হয়নি। আমরা এ বিষয়ে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়ার চিন্তা করছি। কারণ ইজারা নবায়ন না হলে এমিরেটস, তার্কিস ও শ্রীলঙ্কান এয়ারলাইনসসহ আমাদের সঙ্গে চুক্তি করা অন্য এয়ারলাইনসগুলো বিপাকে পড়বে। এ নিয়ে অ্যাভলনের সঙ্গে এয়ারলাইনসগুলোর আইনি জটিলতা তৈরি হবে।

উল্লেখ্য, ২০০৯ সাল থেকে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এয়ারক্রাফট রক্ষণাবেক্ষণের কাজ করছে অ্যাভলন এভিয়েশন। আগে থাই এয়ারওয়েজসহ বিদেশি দুটি প্রতিষ্ঠান ওই কাজ করতো। পরবর্তী সময় বেবিচকের অনুমোদন নিয়ে কাজ শুরু করে অ্যাভলন। নতুন নীতিমালার বিতর্কিত শর্ত ও জমির ইজারা নবায়ন না হওয়ায় প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম এখন বন্ধের পথে।