মত-বিশ্লেষণ

ঐক্যবদ্ধ না থাকলে বঞ্চনার খেলা চলবেই

তৌহিদুল ইসলাম চঞ্চল: সম্প্রতি পরিচিত একজনের সঙ্গে দেখা হলো। ঢাকা রফতানিকরণ অঞ্চলের (ডিইপিজেড) একটি কারখানায় চাকরি করেন। কুশল বিনিময়ের পর জানলাম চাকরি নেই তার। দায়িত্ববান হিসেবেই জানতাম তাকে। জানলাম, তাকে চাককরিচ্যুত করেছে মালিকপক্ষ।
এমন কর্মীকে চাকরিচ্যুত করার কারণ খুঁজে পাচ্ছিলাম না। অবশ্য আমাদের দেশে চাকরিচ্যুত করতে কারণ লাগে না। কর্মীদের চাকরি কেবলই কর্তৃপক্ষের ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপরই নির্ভরশীল।
সিয়াম (মূল নাম নয়) জানালেন, তাকে আগাম নোটিস ছাড়া চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। মানবসম্পদ বিভাগ থেকে ডেকে বলা হলো, ‘আমরা আর আপনাকে রাখতে পারছি না। কীজন্য, তা জিজ্ঞেস করবেন না। আপনার পাওনাদি ঠিকমতো পেতে হলে আমরা যে কাগজপত্র দিচ্ছি, সেগুলো সই করে দেন।’ সিয়ামের আর কোনো উপায় ছিল না। তাই অন্তত পাওনা টাকা পেতে কোনো তর্ক-বিতর্কে না গিয়ে কাগজে সই করে দিলেন। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘হিসাবনিকাশ সব ঠিক আছে কি না, বুঝিয়ে দিয়েছে?’ তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ।’ ভাবলাম, যাক বেচারা অন্তত তার পাওনা ঠিকমতো পেয়েছে। এরপর আমি চিন্তা করতে বসলাম, কেন তাকে কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়া এভাবে চাকুরিচ্যুত করা হলো! চিন্তা করতে করতে শুধু একটি বিষয়ই সামনে এলো, তা হলো তিনি ১০ বছরের বেশি সময় ধরে সেই কোম্পানিতে কাজ করেছেন। দিনে দিনে তার বেসিক বেড়ে যাচ্ছিল, আর তাই সে কোম্পানির চোখে বড় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এই বেচারা এই বয়সে যে কাজটি করতেন, যে বেতন পেতেন, সে ধরনের কোনো কিছু খুঁজে পাবেন কি না, সেক্ষেত্রে আমি সন্দিহান। অর্থ দাঁড়াল কোনো কর্মী তার যৌবনে আপনাকে তার সর্বোচ্চ পারফরম্যান্স দিলেন। আর যৌবন পার হলে তার যখন এফিসিয়েন্সি কমে গেল, তাকে আপনি পরিত্যাগ করলেন! কিংবা খরচ বাঁচাতে আপনি ১৫-২০ বছর ধরে চাকরিরত ভালো কর্মীর ফিতে কেটে দিলেন! বাহ, আপনি কত সুবিবেচক! শুনতে পেরেছি ওই কারখানায় শুধু সিয়ামই নন, আরও অনেককে একই কৌশলে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
এ তো গেল ইপিজেড, যেখানকার কারখানার কর্মীরা এখনও চাকরি অবসানকালে কিছু সুবিধা পেয়ে থাকেন; কিন্তু যদি চিন্তা করি অন্যান্য কোম্পানির কথা, যা ইপিজেডের আওতাধীন নয়, সেখানে শ্রমিকের সংজ্ঞা নিয়ে যেমন হরহামেশা যুক্তিতর্ক চলে, তেমনি শ্রমিক-কর্মচারীদের অধিকার প্রতিনিয়ত খর্ব হচ্ছে। মাতৃত্বকালীন সুবিধা থেকে শুরু করে চাকরির অবসানজনিত সুবিধাসহ অনেক কিছুতেই চলছে বঞ্চিত করার এক মহাযজ্ঞ। উদাহারণ দেওয়া যাক:
ক. অনেক কোম্পানি শ্রমিকদের মাতৃত্বকালীন বেনিফিটের এক কিস্তি দিয়ে দ্বিতীয় কিস্তি দেয় না। কিছু ক্ষেত্রে একটি কিস্তিও দেয় না। স্টাফরা (যাদের আজও শ্রমিক বলে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি) অনেক জায়গায় এই ছুটিটাও পুরো পায় না।
খ. কোনো শ্রমিক পাঁচ বছরের অধিক কাজ করলে তাকে বিভিন্নভাবে বের করে দেওয়ার পাঁয়তারা চলে। এক্ষেত্রে এমনকি তাদের বেতন বাড়ানোর লোভ দেখিয়ে আবার যোগদান করতে বলা হয়। কিছু জায়গায় সে তার প্রাপ্য পাওনাটুকুও পায় না। নোটিস পিরিয়ডের তোয়াক্কা না করে স্টাফদের হুট করে বের করে দেওয়া হয়।
এইচআর বিভাগের চলতে থাকা এই অসাধু কার্যকলাপের বীজ বপন করেছিল কিছু অসাধু ক্ষমতালোভী মানবসম্পদ বা প্রশাসন বিভাগের হোমরাচোমরা ধরনের কর্মকর্তারা, যারা কিনা মালিকদের শিখিয়ে গেছে এসব না হলেও বা না দিলেও চলে। এর ফলে বহু শ্রমজীবী মানুষ তাদের অধিকার থেকে আজ বঞ্চিত হচ্ছে। তবে সচেতন কিছু শ্রমিক নিজের অধিকার আদায়ে লেবার কোর্টসহ বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের শরণাপন্ন হয়, যেক্ষেত্রে তাদের প্রাপ্ত অর্থের একটি অংশ খরচ করতে হয়।
নিয়োগকর্তা বা কারখানা মালিকদের কুপরামর্শ দেন কতিপয় ব্যক্তিত্বহীন কর্মকর্তা। তারা নিয়োগকর্তার কাছে ভালো সাজতে এমন কিছু কাজ করেন, যা কেবল নৈতিকতা নয়, শ্রম আইনেরও পরিপন্থি। তারা শ্রমিকদের বিনা পারিশ্রমিকে অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা কাজ করিয়ে নেন, ঈদ বোনাস দিতে গড়িমসি করেন, এক মাসের নোটিস কিংবা বিনা নোটিসে চাকরিচ্যুত করেন শ্রমিকদের। এভাবে চলে আসছে অনেক দিন থেকে। কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার দায়িত্ব যে কর্মকর্তার (কমপ্লায়েন্স অফিসার), তাকেও কোণঠাসা করে রাখেন তারা। তবে এমন দৃষ্টান্ত অনেক যারা এ ধরনের অমানবিক পদ্ধতির প্রণেতা, তারাও একসময় একই পদ্ধতিতে বিতাড়িত ও প্রতারিত হয়েছেন।
চলতে থাকা এসব ঘটনার শিকার ফ্যাক্টরির সুপারভাইজার থেকে শুরু করে উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তারা চোখ বুজে, মুখ বুজে সব মেনে নিয়ে অন্যত্র কাজ খোঁজার দিকে মনোযোগ দিয়েছে এবং দিচ্ছে। কারণ তারা জানে তাদের অধিকার রক্ষার জন্য বা তাদের পক্ষ নেওয়ার জন্য কোথাও কেউ নেই! কারণ তারা জানে কোনো সংগঠন কিংবা কোনো ব্যক্তি এসবের বিরুদ্ধে সোচ্চার কখনও হবে না। ঠিক ফ্যাক্টরিতে, যেমন এইচআর ম্যানেজারের চাকরি গেলে প্রোডাকশন ম্যানেজার মুচকি হাসে, কিংবা প্রোডাকশন ম্যানেজারের সঙ্গে এমন হলে এইচআর ম্যনেজার খুশি হয়, ঠিক তেমনি একটি সংগঠন এগিয়ে এলে অন্য সংগঠনগুলো তাদের ভুল ধরতে কিংবা বিরুদ্ধাচরণ করার ক্ষেত্রে একটুও চিন্তা করবে না। তারা জানে যে, অনেক রং-বেরঙের সংগঠন রয়েছে বিভিন্ন পেশাজীবীদের (টেক্সটাইল, এইচআর, কমপ্লায়েন্স প্রভৃতি), কিন্তু কারও সঙ্গে কারও যোগাযোগ কিংবা হƒদ্যতা নেই। আর থাকলেও তা নেহায়েত লোকদেখানো। আর তাই তো কিছু জায়গায় স্টাফকে কোনো মালিক মেরেছে, এটা শুনে অনেকে প্রশ্ন করেÑ‘কোন বিভাগের স্টাফ!’ পারলে বোধহয় এও জিজ্ঞেস করবেÑপদবি কী ছিল, বেতন কত পেত, বাড়ি কোন বিভাগে, কোন জেলা, বংশ কী, রক্তের গ্রুপ কী! এসব প্রশ্ন করবে একটা ছুতোর খোঁজে, যেন বলতে পারেÑ‘না ভাই, তার বাড়ি তো চট্টগ্রাম। চট্টগ্রামের সংগঠনকে বলেন ব্যবস্থা নিতে!’
স্বপ্ন দেখি কবে আমরা ভেদাভেদ ভুলে একত্র হব, যেখানে উল্লেখ করা হবে না কোনো নির্দিষ্ট বিভাগের নাম, লক্ষ্য থাকবে শুধু সবার অধিকার নিশ্চিত করা। একটা পোশাক খাতসহ যেকোনো খাতে লাখো সংগঠন থাকুক ক্ষতি নেই, মতপার্থক্যসহ অন্যান্য সমস্যা থাকতেই পারে। কিন্তু সবার অধিকার নিশ্চিত করতে এসব সংগঠনের মধ্যে যত দিন ঐক্য না হবে, তত দিন এই বঞ্চনার খেলা চলবেই।

মানবসম্পদ প্রশিক্ষক

সর্বশেষ..