মত-বিশ্লেষণ

ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থান দিবস

কাজী সালমা সুলতানা: আজ ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থান দিবস। ১৯৬৯ সালের এই দিনে গণআন্দোলনের মুখে পাকিস্তানের স্বৈরশাসক ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খানের পতন হয়। ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়ন ও ডাকসুর নেতৃত্বে গঠিত ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ১১ দফার ভিত্তিতে ১ জানুয়ারি থেকে ছাত্র আন্দোলন নতুন মাত্রা লাভ করে। ২০ জানুয়ারি সান্ধ্য আইন ভঙ্গ করে ছাত্ররা মিছিল বের করলে পুলিশের গুলিতে শহীদ হন আসাদ। এর প্রতিবাদে পুরো ঢাকায় ছাত্রছাত্রীদের মিছিল পুলিশের লাঠিচার্জ সব যানবাহন বন্ধ হয়ে যায়। সেদিনের ছাত্রনেতা তোফায়েল আহমেদের নেতৃত্বে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সভায় নেতারা ঘোষণা করেন ১১ দফা আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন থামবে না। পশ্চিম পাকিস্তানের সর্বত্র ছাত্র বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। ২১ জানুয়ারি সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ডাকে স্বতঃস্ফূর্ত হরতাল পালিত হয়। এদিনও পুলিশের গুলিতে ১৫ জন ছাত্রীসহ ৫০ জন ছাত্র আহত হয়।  এদিন দুপুরে লক্ষাধিক লোকের সমাবেশে শহীদ আসাদের গায়েবি জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজা শেষে লক্ষাধিক মানুষের মিছিল থেকে দাবি ওঠেÑপূর্ববাংলার স্বায়ত্তশাসন দিতে হবেÑ১১ দফা মানতে হবে। ১১ দফা সর্বজনীন দাবি হিসেবে রূপলাভ করে। ২২ জানুয়ারি থেকে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ তিন দিনব্যাপী কর্মসূচি প্রথম দিনে ঢাকায় অর্ধদিবস হরতাল পালিত হয়; এদিন প্রায় তিন মাইল দীর্ঘ কালো পতাকা মিছিল বের করা হয়। ২৩ জানুয়ারি ঢাকার বুকে স্মরণাতীত কালের বৃহত্তম সমাবেশ থেকে ২৪ জানুয়ারি হরতাল সফল করার আহ্বানের সঙ্গে ছয় দফা, ১১ দফা বাস্তবায়নের দাবি জানানো হয়। সেই সমাবেশে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ চলতে থাকে, দুপুরে লাখ লাখ লোকের সমাবেশ শেষে মিছিল শুরু হয়। সমাবেশ থেকে বঙ্গভবন আক্রমণের উদ্যোগ নিলে মিছিলকে কৌশলে নিয়ে যাওয়া হয় ইকবাল হলের দিকে। সেদিন মর্নিং নিউজ, দৈনিক পাকিস্তান, পয়গাম পত্রিকা অফিস পুড়িয়ে দেওয়া হয়। ২৪ মার্চ মিছিল বের হলে পুলিশ আবারও গুলি চালালে শহীদ হন নবকুমার ইনস্টিটিউশনের দশম শ্রেণির ছাত্র মতিউর রহমানসহ মকবুল, রুস্তম ও আলমগীর। এই হত্যার খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষ রাজপথে নেমে আসে। নিহত কিশোর মতিউরের পকেট থেকে বের করা হলো একটি চিরকুট, যেখানে লেখা ছিলÑ‘মা আমি মিছিলে যাচ্ছি, যদি ফিরে না আসি তাহলে মনে করো, তোমার মতিউর বাংলার মানুষের জন্য, শেখ মুজিবের জন্য জীবন দিয়ে গেল, ইতি মতিউর রহমান।’”

 বাংলাদেশ রাষ্ট্র গঠন ও স্বাধীনতা যুদ্ধে ইতিহাসের মাইলফলক হিসেবে বিবেচনা করা হয় এই গণআন্দোলনকে। সেদিন আগরতলা মামলার সাক্ষী, তৎকালীন মন্ত্রী, এমনকি বিচারপতির বাড়িতেও মানুষ আগুন লাগিয়ে দেয় বিক্ষুব্ধ জনতা। ছাত্রদের এ মিছিলে শ্রমিক-কর্মচারীসহ সর্বস্তরের মানুষ অংশগ্রহণ করে। এ আন্দোলনের জেরেই আগরতলা মামলা প্রত্যাহারের ঘোষণা আসে এবং ২২ ফেব্রুয়ারি শেখ মুজিবসহ মামলার অভিযুক্তদের  সবাইকে মুক্তি দেওয়া হয়। আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ফেব্রুয়ারি মাসের শুরুতেই আইয়ুব খান ঘোষণা করেন, তিনি আর প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচন করবেন না। তিনি পদত্যাগ করেন এবং ঢাকা সেনানিবাসের বন্দিদশা থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মুক্তি পান।

গণমাধ্যমকর্মী

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন
ট্যাগ »

সর্বশেষ..