দিনের খবর মত-বিশ্লেষণ

ওজোন স্তর সুরক্ষার ৩৫ বছর

. একেএম রফিক আহাম্মদ: আজ ১৬ সেপ্টেম্বর বিশ্ব ওজোন দিবস। বায়ুমণ্ডলের ওজোন স্তরের গুরুত্ব ও ওজোন স্তর সুরক্ষায় জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ১৯৯৪ সালের ১৯ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুসারে ১৯৯৫ সাল থেকে আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিবছর এ দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। এ বছর জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচি (ইউএন এনভায়রনমেন্ট) দিবসটির প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করেছে ‘zone for Life: ৩৫ Years of zone Layer Protection বা ‘প্রাণ বাঁচাতে ওজোন: ওজোন স্তর সুরক্ষার ৩৫ বছর’।

মানুষ ও জীবজগতের অস্তিত্ব রক্ষায় ওজোন স্তরের অবদান অপরিসীম। কিন্তু মানুষের দৈনন্দিন বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের কারণে ওজোন স্তর দিন দিন ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে। ক্ষয়িষ্ণু ওজোন স্তরের মধ্যে দিয়ে সূর্যের ক্ষতিকর অতিবেগুনি রশ্মি অতি সহজেই পৃথিবীতে প্রবেশ করে মানবস্বাস্থ্য, জীবজগৎ, উদ্ভিদজগৎ ও অণুজীবের মারাত্মক ক্ষতির কারণ হয়। মাত্রাতিরিক্ত অতিবেগুনি রশ্মির প্রভাবে মানুষের ত্বকে ক্যানসার, চোখে ছানি, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাসসহ স্বাস্থ্য ঝুঁকি বেড়ে যায়। ওজোন স্তর ক্ষয়ের কারণে বিভিন্ন জীব ও উদ্ভিদের ক্ষতির মাধ্যমে পৃথিবীর প্রাণমণ্ডল হুমকির সম্মুখীন হতে পারে। এছাড়া ওজোন স্তর ক্ষয়ের পরোক্ষ প্রভাবে জলবায়ু পরিবর্তন, বন্যা, খরা ও মরুময়তাসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রকোপ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।

১৯৭৪ সালে শেরউড রোল্যান্ড ও মারিও মলিনা ন্যাচার জার্নালে তাদের সুবিখ্যাত গবেষণা ফলাফল প্রকাশ করে জানান যে, ক্লোরোফ্লোরো কার্বন বা সিএফসি বায়ুমণ্ডলের ওজোন স্তরের ক্ষতি সাধন করে। ১৯৭৭ সালে ইউনাইটেড ন্যাশন এনভায়রনমেন্ট প্রোগ্রামের (ইউএনইএপি) গভর্নিং কাউন্সিলে ওজোন স্তরের বিষয়ে ব্যাপক গবেষণা কার্যক্রমের জন্য একটি কর্মপরিকল্পনা গৃহীত হয়। এরপর ১৯৮৫ সালে ব্রিটিশ অ্যান্টার্কটিক সার্ভের বিজ্ঞানীরা অ্যান্টার্কটিকায় ওজোন হোলের সন্ধান পান। ফলে ওজোন স্তর রক্ষায় জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচির (ইউএনইপি) উদ্যোগ ১৯৮৫ সালের ২২ মার্চ ভিয়েনায় একটি আন্তর্জাতিক সভায় ওজোন স্তর রক্ষায় একটি কনভেশন গৃহীত হয়, যা ‘ভিয়েনা কনভেনশন’ নামে পরিচিত। এই কনভেনশনের উদ্দেশ্য ছিল ওজোন স্তরবিষয়ক গবেষণা, ওজোন স্তর মনিটরিং ও তথ্য আদান-প্রদান। কিন্তু ভিয়েনা কনভেনশনের আইনগত বাধ্যবাধকতা না থাকায় ভিয়েনা কনভেনশনের ধারাবাহিকতায় ওজোন স্তর রক্ষায় ১৯৮৭ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর কানাডার ‘মন্ট্রিল প্রটোকল’ গৃহীত হয়। ওই দিনই ৪৬টি রাষ্ট্র মন্ট্রিল প্রটোকলে স্বাক্ষর করে এবং বর্তমানে জাতিসংঘের সব সদস্য রাষ্ট্র এই প্রটোকল স্বাক্ষর করেছে। মন্ট্রিল প্রটোকল গৃহীত হওয়ার ফলে সিএফসি ও হ্যালনগুলোর ব্যবহার বন্ধের লক্ষ্যে এগুলোর ব্যবহার কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। পরবর্তীকালে বিভিন্ন সংশোধনী ও সমন্বয়ের মাধ্যমে প্রটোকলটি সময়পোযোগী করে তোলা হয়। এই প্রটোকলটি প্রথমে ওজোন স্তর ক্ষয়কারী আটটি দ্রব্যের উৎপাদন ও ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে গৃহীত হয়। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সময়ে প্রয়োজনীয় সংশোধন ও সংযোজনের মাধ্যমে বর্তমানে মন্ট্রিল প্রটোকল ওজোন স্তর সুরক্ষায় যুগান্তকারী অবদান রেখে যাচ্ছে। এই প্রটোকলের আওতায় বর্তমানে প্রায় ১০০টির মতো ওজোন স্তর ক্ষয়কারী দ্রব্যের উৎপাদন ও ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। এরই মধ্যে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ওজোন স্তর ক্ষয়কারী দ্রব্যের ব্যবহার ও উৎপাদন সম্পূর্ণভাবে রোধ করা সম্ভব হয়েছে।

ওজোন স্তর রক্ষায় গৃহীত মন্ট্রিল প্রটোকলের সর্বশেষ সংশোধনী কিগালি সংশোধনী (কিগালি অ্যামেন্ডমেন্ট) নামে পরিচিত। ২০১৬ সালের ১৫ অক্টোবর রুয়ান্ডার রাজধানী কিগালিতে অনুষ্ঠিত মন্ট্রিল প্রটোকলের ২৮তম পার্টি সভায় এই সংশোধনী গৃহীত হয়। বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় এই সংশোধনীকে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে অভিহিত করা হয়। এই সংশোধনীতে অধিক বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ক্ষমতাসম্পন্ন হাইড্রোফ্লোরোকার্বনের (এইচএফসি) ব্যবহার পর্যায়ক্রমে কমিয়ে আনার (ফেজ-ডাউন) সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

প্রায় সব ওজোন স্তর ক্ষয়কারী দ্রব্যই অধিক ক্ষমতাসম্পন্ন গ্রিনহাউস গ্যাস হিসেবে চিহ্নিত। মন্ট্রিল প্রটোকল বাস্তবায়নের মাধ্যমে ক্লোরোফ্লোরোকার্বনসহ (সিএফসি) অন্যান্য প্রধান ওজোন স্তর ক্ষয়কারী দ্রব্যের ব্যবহার শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা হয়। এতে পৃথিবী থেকে প্রায় ১৩৫ মিলিয়ন টন কার্বন-ডাই-অক্সাইডের সমপরিমাণ গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ হ্রাস করা সম্ভবপর হয়েছে। এইচএফসি হলো মানবসৃষ্ট পদার্থ যা ওজোন স্তর ক্ষয়কারী দ্রব্যের বিকল্প হিসেবে আনা হয়। এই এইচএফসিগুলো সাধারণ রেফ্রিজারেশন ও এয়ারকন্ডিশনিং সিস্টেমে ব্যবহƒত হয়। তবে আশার কথা, গ্রিনহাউস গ্যাস হিসেবে চিহ্নিত এইচএফসি’র বিকল্প প্রযুক্তির প্রসার দ্রুত বাড়ছে।

মন্ট্রিল প্রটোকল এরই মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে। এ প্রটোকল বাস্তবায়নের মাধ্যমে এরই মধ্যে ১০ গিগাটন কার্বন-ডাই-অক্সাইডের সমপরিমাণ গ্রিনহাউস গ্যাস বায়ুমণ্ডলে নিঃসরণ এড়ানো সম্ভব হয়েছে, যা কিয়োটো প্রটোকলের প্রথম কমিটমেন্ট পিরিয়ডের প্রায় পাঁচগুণ। উল্লেখ্য, কিগলি সংশোধনী বাস্তবায়িত হলে এ শতাব্দীর শেষে দশমিক পাঁচ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি এড়ানো সম্ভব হবে, যা প্যারিস চুক্তিতে দুই ডিগ্রি সেলসিয়াসের অধিক তাপমাত্রা না বাড়ানোর যে প্রতিশ্রুতি রয়েছে, তা বাস্তবায়নে অনেকাংশে সহায়ক হবে বলে ধারণা করা হয়। বর্তমান সময়ে ওজোন স্তর ক্ষয়কারী রাসায়নিক দ্রব্যগুলোর পরিবর্তে এমন সব বিকল্প বিবেচনা করা হচ্ছে, যা ওজোন স্তর ক্ষয় করবে না এবং বিদ্যুৎসাশ্রয়ী হবে।

কিগালি সংশোধনীকে বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার জন্য সর্বশেষ প্রচেষ্টা হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। কিগালি সংশোধনীতে ১৮ প্রকার এইচএফসি নিয়ন্ত্রণ করার কথা রয়েছে। কিন্তু সব ধরনের এইচএফসি ব্যবহারের বিকল্প এখনও পর্যাপ্ত না থাকায় কিগালি সংশোধনীতে এইচএফসি সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করার পরিবর্তে শুধু হ্রাস করার কথা বলা হয়েছে। কিগালি সংশোধনী সফলতার সঙ্গে কার্যকর হলে ২০৫০ সালের মধ্যে ৭০ মিলিয়ন টন কার্বন-ডাই-অক্সাইডের সমপরিমাণ এইচএফসি নিঃসরণ হ্রাস সম্ভব হবে।

বাংলাদেশ সরকার ১৯৯০ সালের ২ আগস্ট মন্ট্রিল প্রটোকলে অনুস্বাক্ষর করে এবং পরবর্তীকালে লন্ডন, কোপেনহেগেন, মন্ট্রিল ও বেইজিং সংশোধনীগুলোয় অনুস্বাক্ষর করে। ২০১৬ সালে হাইড্রোফ্লোরোকার্বন বা এইচএফসির ব্যবহার হ্রাসের লক্ষ্যে রুয়ান্ডার রাজধানী কিগালিতে এ প্রটোকলের ‘কিগালি সংশোধনী’ গৃহীত হয়। সরকার কিগালি সংশোধনীর গুরুত্ব অনুধাবন করে এ বছরের ৮ জুন কিগালি সংশোধনীতে অনুস্বাক্ষর করেছে।

১৯৯৩ সালে ওজোন স্তর ক্ষয়কারী দ্রব্যের ওপর পরিচালিত জরিপের ভিত্তিতে ১৯৯৪ সালে কান্ট্রি প্রোগ্রাম প্রণয়ন করা হয় এবং ২০০৫ সালে ওই কান্ট্রি প্রোগ্রাম হালনাগাদ করা হয়। মন্ট্রিল সংশোধনী অনুযায়ী ২০০৯ ও ২০১০ সালে এইচসিএফসির গড় ব্যবহার ভিত্তি নির্ধারণ করা হয়। ২০১১ সালে পরিবেশ অধিদপ্তর কর্তৃক এইচসিএফসি ফেজ আউট ম্যানেজমেন্ট প্ল্যান (এইচপিএমপি) প্রণয়ন করা হয়, যা মন্ট্রিল প্রটোকল মাল্টিলেটারেল ফান্ডের ৬৫তম নির্বাহী কমিটির সভায় অনুমোদন লাভ করে। উল্লেখ্য, ওজোন স্তর ক্ষয়কারী দ্রব্যের আমদানি ও ব্যবহার পর্যায়ক্রমে কমিয়ে আনার লক্ষ্যে ‘ওজোন স্তর ক্ষয়কারী দ্রব্য (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা, ২০০৪’ জারি করা হয় এবং ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে বিধিমালাটি সংশোধিত হয়। ফলে বিধিমালায় এইচএফসির আমদানি, রপ্তানি ও ব্যবহারের বিষয়টি পুনর্নির্ধারিত হয় এবং ওষুধশিল্পে সিএফসির ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়। ২০১০ সালের ১ জানুয়ারি থেকে সিএফসি, কার্বন টেট্রাক্লোরাইড ও মিথাইলক্লোরোফরম সম্পূর্ণভাবে ফেজ আউট হয়। এছাড়া ২০১২ সালের ৩১ ডিসেম্বর ওষুধশিল্প থেকে সিএফসি ও রেফ্রিজারেটর ফোম তৈরিতে ফোম ব্লোয়িং এজেন্ট হিসেবে ব্যবহƒত এইচসিএফসি-১৪১বি-এর ব্যবহার সম্পূর্ণ বন্ধ করা হয়।

২০১৭ সালে এইচসিএফসি ফেজ আউট ম্যানেজমেন্ট প্ল্যানের (এইচপিএমপি) লক্ষ্যে দেশব্যাপী এইচসিএফসি ও এর বিকল্প ব্যবহারের বিষয়ে জরিপ পরিচালনা করা হয়। ২০১৮ সালে মন্ট্রিল প্রটোকল মান্টিলেটারেল ফান্ডের ৮১তম নির্বাহী কমিটির সভায় এইচপিএমপি স্টেজ-২ অনুমোদিত হয়। ফলে ২০১৫ সাল পর্যন্ত এইচসিএফসির ব্যবহার ৬৭ দশমিক পাঁচ শতাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। এছাড়া কিগালি সংশোধনী অনুস্বাক্ষরিত হওয়ায় এইচএফসির ব্যবহার কমিয়ে আনার লক্ষ্যে কাজ শুরু হচ্ছে এবং এইচপিএমপি স্টেজ-২ বাস্তবায়নের মাধ্যমে প্রায় এক দশমিক সাত মিলিয়ন টন কার্বন-ডাই-অক্সাইডের সমতুল্য গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ এড়ানো সম্ভব হবে।

সরকার-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে সহায়তার লক্ষ্যে ১৯৯৮ সালে সর্বপ্রথম এসিআই লি. উৎপাদিত অ্যারোসল (কীটনাশক) থেকে সিএফসির ব্যবহার রোধ করার লক্ষ্যে আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা প্রদান করা হয়। এতে বাংলাদেশে সিএফসির ব্যবহার প্রায় ৫০ শতাংশ হ্রাস পায়। পরে ২০০৭ সালে বাংলাদেশের তিনটি ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যাল, স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যাল ও একমি ল্যাবরেটরিজকে কারিগরি ও আর্থিক সহায়তার মাধ্যমে তাদের উৎপাদিত মিটার্ড ডোজ ইনহেলারে সিএফসির পরিবর্তে এইচএফসি ব্যবহার প্রক্রিয়ায় সহায়তা প্রদান করে। বেক্সিমকো ও স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসের উৎপাদিত ইনহেলার যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফডিএ) অনুমোদন লাভ করে এবং অস্ট্রেলিয়াসহ অন্যান্য দেশে রপ্তানি হচ্ছে।

২০১১ সালে পরিবেশ অধিদপ্তর কর্তৃক ওয়ালটন হাইটেক ইন্ডাস্ট্রিজকে রেফ্রিজারেটরে ব্যবহƒত থার্মাল ফোম উৎপাদনে এইচসিএফসির পরিবর্তে ন্যাচারাল রেফ্রিজারেন্ট ব্যবহারের মাধ্যমে পরিবেশবান্ধব ও বিদ্যুৎসাশ্রয়ী রেফ্রিজারেটর তৈরিতে আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা প্রদান করা হয়। সরকার মন্ট্রিল প্রটোকল বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বিভিন্ন সময়ে শুধু রেফ্রিজারেশন ও এয়ারকন্ডিশনিং উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানকেই সহায়তা প্রদান করেনি, বরং ওজোন স্তর ক্ষয়কারী দ্রব্যের প্রান্তিক ব্যবহারকারী তথা রেফ্রিজারেশন সেক্টরে নিয়োজিত টেকনিশিয়ানদের সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন সময়ে প্রশিক্ষণ কর্মসূচি ও যন্ত্রপাতি বিতরণ করে আসছে। পরিবেশ অধিদপ্তর কর্তৃক এ পর্যন্ত সমগ্র বাংলাদেশে প্রায় ১০ হাজার টেকনিশিয়ানকে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে। এছাড়া ওডিএস চোরাচালান রোধে কাস্টমস কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে।

সরকার এইচএফসি ব্যবহার রোধকল্পে মন্ট্রিল প্রটোকলের কিগালি সংশোধনী বাস্তবায়ন শুরু করেছে। এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক সহায়তায় ইউএনডিপি’র মাধ্যমে একটি ডেমনেস্ট্রেশন প্রকল্প বাস্তবায়ন ও পরে মন্ট্রিল প্রটোকল মাল্টিলেটারেল ফান্ডের সহায়তায় ওয়ালটনের রেফ্রিজারেটর উৎপাদনে এইচএফসির ব্যবহার সম্পূর্ণভাবে রোধ করে পরিবেশসম্মত রেফ্রিজারেটর ও প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে উৎপাদন প্রক্রিয়া রূপান্তর করা হয়। একই সঙ্গে এইচএফসি-ভিত্তিক কমপ্রেসর উৎপাদন প্রক্রিয়াও পরিবেশবান্ধব ও বিদ্যুৎসাশ্রয়ী করা হয়েছে। বিদ্যুৎসাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহারের কারণে ওয়ালটন কর্তৃক উৎপাদিত রেফ্রিজারেটরের কমপ্রেসর বর্তমানে ইউরোপের বাজারে রপ্তানি করা হচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের ব্র্যান্ডিংয়ে সহায়তা করছে। ২০১৯ সালে প্রকল্পটি সমাপ্ত হওয়ায় রেফ্রিজারেটর উৎপাদনে বছরে প্রায় তিন লাখ টন কার্বন-ডাই-অক্সাইডের সমতুল্য গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ এড়ানো সম্ভব হয়েছে। এছাড়া কিগালি কুলিং ইফিশিয়েন্সি প্রোগ্রামের মাধ্যমে ওডিএসের বিকল্প ব্যবহার-সংক্রান্ত জরিপ, ন্যাশনাল কুলিং প্ল্যান প্রণয়ন, বিদ্যমান বিধিমালার প্রয়োজনীয় সংশোধন, রেফ্রিজারেশন-এয়ারকন্ডিশনিং সার্ভিস সেক্টরের নিডস অ্যাসেসমেন্ট, কিগালি সংশোধনী বাস্তবায়ন কৌশল প্রণয়ন প্রভৃতি কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে।

মন্ট্রিল প্রটোকল স্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশ এই প্রটোকল বাস্তবায়নে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে পরিবেশ অধিদপ্তর ১৯৯৬ সাল থেকে বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে ওজোন স্তর ক্ষয়কারী দ্রব্যের ব্যবহার হ্রাসে কার্যকর ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। পরিবেশ সংরক্ষণ ও উন্নয়ন এবং জলবায়ু পরিবর্তন অভিযোজন ও প্রশমনে বর্তমান সরকার বদ্ধপরিকর। সরকারের গৃহীত পদক্ষেপগুলো মন্ট্রিল প্রটোকল বাস্তবায়নে বৈশ্বিক সাফল্যের অংশীদার। বাংলাদেশ এই সাফল্যের অংশীদার হিসেবে জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচি দ্বারা ২০১২ ও ২০১৭ সালে বিশেষভাবে প্রশংসিত ও পুরস্কৃত হয়েছে। তাছাড়া ওজোন স্তর ক্ষয়কারী দ্রব্য চোরাচালান রোধে কার্যকর ভূমিকার জন্য ২০১৯ সালে সরকার জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচি দ্বারা বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়েছে। মন্ট্রিল প্রটোকল বাস্তবায়নের ফলে ধীরে ধীরে সূর্যালোক পৃথিবীর প্রাণিকুলের জন্য নিরাপদ হচ্ছে। বিজ্ঞানীদের অভিমত, এই ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৫০ সালের মধ্যে ওজোন স্তর তার পূর্বাবস্থায় ফিরে আসবে।

পিআইডি নিবন্ধ

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..