ওষুধ ও রসায়ন খাতে কমছে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ

মো. আসাদুজ্জামান নূর: প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ কমছে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ওষুধ ও রসায়ন খাতের কোম্পানিগুলোয়। এর বিপরীতে বাড়ছে ব্যক্তি বিনিয়োগ। বিগত দুই মাসের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এ সময়ের মধ্যে ১৫টি কোম্পানির প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ হ্রাস পেয়েছে। এর বিপরীতে সাধারণ বিনিয়োগ বেড়েছে বেশিরভাগ কোম্পানিতে।
পুঁজিবাজার-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশের প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা অনেকটাই ব্যক্তি বিনিয়োগকারীদের মতো আচরণ করেন। দীর্ঘ মেয়াদে বিনিয়োগের চেয়ে শেয়ার কেনাবেচার মধ্যে থাকেন তারা। মুনাফা তুলে নেয়ার প্রবণতা কাজ করে বেশি। ফলে কাক্সিক্ষত মুনাফা তুলে নেয়ায় কমছে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ। অন্যদিকে, ক্রমবর্ধমান ওষুধ খাতের সম্ভাবনার কথা মাথা রেখে বিনিয়োগে আগ্রহী হচ্ছেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। এ কারণে বেড়েছে ক্ষুদ্র বিনিয়োগ।
গত সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) তালিকাভুক্ত ওষুধ ও রসায়ন খাতের ৩২টি কোম্পানির মধ্যে গত সেপ্টেম্বরের তুলনায় অক্টোবরে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ কমেছে ১৫টি কোম্পানির। এর বিপরীতে বেড়েছে সাধারণ বিনিয়োগ। কোম্পানিগুলো হলোÑএসিআই লিমিটেড, অ্যাকটিভ ফাইন কেমিক্যালস, এমবি ফার্মাসিউটিক্যালস, বিকন ফার্মাসিউটিক্যালস, সেন্ট্রাল ফার্মাসিউটিক্যালস, ফার কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ, গ্লোবাল হেভি কেমিক্যালস, ইন্দো-বাংলা ফার্মাসিউটিক্যালস, লিবরা ইনফিউশন, ওরিয়ন ইনফিউশন, ফার্মা এইডস, রেনাটা লিমিটেড, সালভো কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ, সিলভা ফার্মা ও ওয়াটা কেমিক্যাল লিমিটেড।
সংশ্লিষ্টদের মতে, কোনো কোম্পানির উদ্যোক্তা পরিচালক ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের শেয়ার হোল্ডিংস বেশি থাকলে বিনিয়োগ করে স্বস্তিতে থাকেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। তারা ধরেই নেন, যেহেতু উদ্যোক্তাদের হাতে ভালো শেয়ার হোল্ডিংস ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ রয়েছে, সেহেতু কোম্পানিটি ভালো করবে এবং সেখান থেকে মুনাফার প্রত্যাশা রাখেন তারা। তবে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ কমলে কিছুটা আস্থাসংকট বিরাজ করে তাদের মধ্যে।
এ ব্যাপারে এক বিনিয়োগকারী মাসুম বলেন, কোনো কোম্পানির বেশিরভাগ শেয়ার যদি মালিকদের হাতে থাকে এবং সেখানে প্রাতিষ্ঠানিক ও বিদেশি বিনিয়োগ বেশি থাকে তাহলে বোঝা যায় যে, সেই শেয়ারটি ভালো। কোম্পানিটি ভালো ব্যবসা করবে। আমরা সাধারণ বিনিয়োগকারী তখন ভরসা পাই ও সেই অনুযায়ী বিনিয়োগ করি। তবে মালিকপক্ষের হাতে যদি শেয়ার কম থাকে ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা যদি বিনিয়োগ তুলে নেন তখন কিন্তু একটু ভীতি কাজ করে।
তবে সামান্য পরিমাণে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ হ্রাস পাওয়াকে স্বাভাবিক বলছেন পুঁজিবাজার বিশ্লেষকরা। এ বিষয়ে পুঁজিবাজার বিশ্লেষক অধ্যাপক আবু আহমদ বলেন, মার্চেন্ট ব্যাংক, অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি, মিউচুয়াল ফান্ডÑএগুলো হলো আমাদের দেশের প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী। তারাও ব্যক্তি বিনিয়োগকারীদের মতো আচরণ করে। যে যেভাবে পারে মার্কেট রিড করে। তাদের নিজস্ব পারসেপশন থেকে বিনিয়োগ করে। যখন মনে করে মুনাফা তোলা প্রয়োজন তখন বিক্রি করে দেয়।
প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ কমা বা বাড়ার বিষয়টি স্বাভাবিক বলে মনে করেন এই পুঁজিবাজার বিশ্লেষক। তিনি বলেন, মার্কেটে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বেশি থাকলে ভালো। তবে কিছুটা কমে গেলেও আস্থা হারানোর কিছু নেই। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা মুনাফা তুলেছেন, আবার যখন মনে হবে ইনভেস্ট করার প্রয়োজন, তারা বিনিয়োগে ফিরবেন।
জানা যায়, কোম্পানিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ কমেছে ওরিয়ন ইনফিউশনের। সেপ্টেম্বরে কোম্পানিটিতে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ ছিল ১৫ দশমিক ৩২ শতাংশ, যা অক্টোবরে ৫ দশমিক ৮৬ শতাংশ কমে ৯ দশমিক ৪৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। একই সময় বিদেশি বিনিয়োগ শূন্য দশমিক ৭৮ শতাংশ থেকে শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে শূন্য দশমিক ২৮ শতাংশে। আলোচ্য সময়ে সাধারণ বিনিয়োগ ৪৩ দশমিক ২৯ শতাংশ থেকে ৬ দশমিক ৩৬ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৯ দশমিক ৬৫ শতাংশে।
এসিআই লিমিটেডের সেপ্টেম্বরে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ ছিল ৪১ দশমিক ৯০ শতাংশ, যা অক্টোবরে শূন্য দশমিক ০৫ শতাংশ কমে ৪১ দশমিক ৮৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। আলোচ্য সময়ে সাধারণ বিনিয়োগ ২২ দশমিক ৮২ শতাংশ থেকে শূন্য দশমিক ০৫ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২২ দশমিক ৮৭ শতাংশে।
অ্যাকটিভ ফাইন কেমিক্যালসের সেপ্টেম্বর মাসে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ ছিল ৩১ দশমিক ১০ শতাংশ, যা অক্টোবরে ১ দশমিক ৮৭ শতাংশ কমে ২৯ দশমিক ২৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। একই সময় সাধারণ বিনিয়োগ ৫৩ দশমিক ৭৫ শতাংশ থেকে ১ দশমিক ৮৭ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৫ দশমিক ৬২ শতাংশে।
এমবি ফার্মার সেপ্টেম্বরে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ ছিল ৬ দশমিক ২৯ শতাংশ, যা অক্টোবরে শূন্য দশমিক ০৬ শতাংশ কমে ৬ দশমিক ২৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। একই সময় সাধারণ বিনিয়োগ ১৮ দশমিক ৪৬ শতাংশ থেকে শূন্য দশমিক ০৬ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৮ দশমিক ৫২ শতাংশে।
বিকন ফার্মার সেপ্টেম্বরে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ ছিল ৩৪ দশমিক ১৫ শতাংশ, যা অক্টোবরে শূন্য দশমিক ১৪ শতাংশ কমে ৩৪ দশমিক ০১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। আলোচ্য সময়ে সাধারণ বিনিয়োগ ৩৫ দশমিক ৮৫ শতাংশ থেকে শূন্য দশমিক ১৪ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৫ দশমিক ৯৯ শতাংশে।
সেন্ট্রাল ফার্মার সেপ্টেম্বরে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ ছিল ১২ দশমিক ৯২ শতাংশ, যা অক্টোবরে শূন্য দশমিক ৮৪ শতাংশ কমে ১২ দশমিক ০৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। একই সময় সাধারণ বিনিয়োগ ৬১ দশমিক ১৯ শতাংশ থেকে শূন্য ৮৪ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬২ দশমিক ০৩ শতাংশে।
ফার কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজের সেপ্টেম্বরে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ ছিল ১৪ দশমিক ৮০ শতাংশ, যা অক্টোবরে ১ দশমিক ১১ শতাংশ কমে ১৩ দশমিক ৬৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। একই সময় সাধারণ বিনিয়োগ ৫৪ দশমিক ৯৬ শতাংশ থেকে ১ দশমিক ১১ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৬ দশমিক ০৭ শতাংশে।
গ্লোবাল হেভি কেমিক্যালসের সেপ্টেম্বরে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ ছিল ১৯ দশমিক ০৭ শতাংশ, যা অক্টোবরে শূন্য দশমিক ২৭ শতাংশ কমে ১৮ দশমিক ৮০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। আলোচ্য সময়ে সাধারণ বিনিয়োগ ১১ দশমিক ৯০ শতাংশ থেকে অক্টোবরে শূন্য ২৭ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২ দশমিক ১৭ শতাংশে।
ইন্দো-বাংলা ফার্মার সেপ্টেম্বরে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ ছিল ১৪ দশমিক ৬৫ শতাংশ, যা অক্টোবরে ১ দশমিক ৪২ শতাংশ কমে ১৩ দশমিক ২৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এতে বিদেশি বিনিয়োগ ছিল। অক্টোবরে এসে বিদেশি বিনিয়োগ দাঁড়ায় শূন্য দশমিক ০১ শতাংশে। আলোচ্য সময়ে সাধারণ বিনিয়োগ ৪১ দশমিক ৫৩ শতাংশ থেকে অক্টোবরে ১ দশমিক ৪১ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪২ দশমিক ৯৪ শতাংশে।
লিবরা ইনফিউশনের সেপ্টেম্বরে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ ছিল ৮ দশমিক ০৯ শতাংশ, যা অক্টোবরে শূন্য দশমিক ২৬ শতাংশ কমে ৭ দশমিক ৮৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। আলোচ্য সময়ে সাধারণ বিনিয়োগ ৫৭ দশমিক ৪৮ শতাংশ থেকে শূন্য দশমিক ২৬ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৭ দশমিক ৭৪ শতাংশে।
ফার্মা এইডসের সেপ্টেম্বরে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ ছিল ১৩ দশমিক ৩৭ শতাংশ, যা অক্টোবরে ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশ কমে ৯ দশমিক ৮৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। আলোচ্য সময়ে সাধারণ বিনিয়োগ ৬২ দশমিক ৪১ শতাংশ থেকে ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৫ দশমিক ৯০ শতাংশে।
রেনাটা লিমিটেডের সেপ্টেম্বরে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ ছিল ১৯ দশমিক ৪৯ শতাংশ, যা অক্টোবরে শূন্য দশমিক ০১ শতাংশ কমে ১৯ দশমিক ৪৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। একই সময় সাধারণ বিনিয়োগ ৬ দশমিক ৫৬ শতাংশ থেকে অক্টোবরে শূন্য দশমিক ০১ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ দশমিক ৫৭ শতাংশে।
সালভো কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজের সেপ্টেম্বরে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ ছিল ৫ দশমিক ০৬ শতাংশ, যা অক্টোবরে শূন্য দশমিক ৯৯ শতাংশ কমে ৪ দশমিক ০৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। আলোচ্য সময়ে সাধারণ বিনিয়োগ ৭২ দশমিক ৫৩ শতাংশ থেকে অক্টোবরে শূন্য দশমিক ৯৯ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৩ দশমিক ৫২ শতাংশে।
সিলভা ফার্মার সেপ্টেম্বরে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ ছিল ১৮ দশমিক ৯৭ শতাংশ, যা অক্টোবরে ৫ দশমিক ০৯ শতাংশ কমে ১৩ দশমিক ৮৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। একই সময় সাধারণ বিনিয়োগ ২৮ দশমিক ৬৩ শতাংশ থেকে অক্টোবরে ৫ দশমিক ০৯ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৩ দশমিক ৭২ শতাংশে।
এছাড়া ওয়াটা কেমিক্যাল লিমিটেডের সেপ্টেম্বরে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ ছিল ৩৮ শতাংশ, যা অক্টোবরে শূন্য দশমিক ৮১ শতাংশ কমে ৩৭ দশমিক ১৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। আলোচ্য সময়ে সাধারণ বিনিয়োগ ২৫ দশমিক ৫৯ শতাংশ থেকে অক্টোবরে শূন্য দশমিক ৮১ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৬ দশমিক ৪০ শতাংশে।


সর্বশেষ..