Print Date & Time : 31 October 2020 Saturday 6:57 pm

ওসি প্রদীপ ও লিয়াকতসহ তিন পুলিশ ৭ দিনের রিমান্ডে

প্রকাশ: August 6, 2020 সময়- 11:53 pm

শেয়ার বিজ ডেস্ক: সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খানকে গুলি করে হত্যা মামলায় টেকনাফ থানার ওসি প্রদীপ কুমার দাশ, বাহারছড়া তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ পরিদর্শক লিয়াকত আলীসহ তিন আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে সাত দিনের জন্য র‌্যাব হেফাজতে পাঠিয়েছেন আদালত। কক্সবাজারের জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম আদালতের বিচারক মো. হেলাল উদ্দিন গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে র‌্যাবের ১০ দিনের রিমান্ড আবেদনের শুনানি করে সাত দিন মঞ্জুর করেন। খবর: বিডিনিউজ।

প্রদীপ ও লিয়াকতের সঙ্গে রিমান্ডে পাঠানো হয়েছে এসআই দুলাল রক্ষিতকে। এ মামলায় আত্মসমর্পণ করা বাকি চার আসামি কনস্টেবল সাফানুর করিম, কামাল হোসেন, আবদুল্লাহ আল মামুন এবং এএসআই লিটন মিয়াকে দুদিন জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দিয়েছেন বিচারক।

মামলার বাকি দুই আসামি এসআই টুটুল ও কনস্টেবল মো. মোস্তফা এখনও পলাতক। আদালত তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির আদেশ দিয়েছেন।

এর আগে বিকালে, সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান হত্যা মামলায় কক্সবাজারের টেকনাফ থানা পুলিশের ওসি প্রদীপ কুমার দাশসহ সাত আসামিকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিয়েছেন আদালত। জামিন আবেদন নাকচ করে গতকাল বৃহস্পতিবার বিকালে তাদের কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন কক্সবাজারের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক মো. হেলাল উদ্দিন।

আসামীরা হলেন টেকনাফ থানা পুলিশের ওসি (সাবেক) প্রদীপ কুমার দাশ, পরিদর্শক লিয়াকত আলী, এসআই দুলাল রক্ষিত, কনস্টেবল সাফানুর করিম, কামাল হোসেন, আব্দুল্লাহ আল মামুন এবং এএসআই লিটন মিয়া।

বিকাল সাড়ে ৫টায় প্রদীপ কুমার দাশসহ সাত পুলিশ সদস্য সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে আত্মসমর্পণ করেন। একই সঙ্গে জামিনের আবেদন করেন তারা। সাত পুলিশ সদস্যের পক্ষে জামিনের আবেদন করা হলেও তা নামঞ্জুর করে তাদের কক্সবাজার কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন বিচারক। মামলার বাকি দুই আসামি গতকাল আদালতে আত্মসমর্পণ করেননি। তারা হলেন এসআই টুটুল ও কনস্টেবল মো. মোস্তফা।

কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পিপি ফরিদুল আলম বলেন, আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিনের আবেদন করেন ওসি প্রদীপ কুমার দাশসহ সাত আসামি। শুনানি শেষে জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে তাদের কক্সবাজার কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন বিচারক। মামলার বাকি দুই আসামি পলাতক থাকায় আদালতে আত্মসমর্পণ করেননি।

এর আগে প্রদীপকে নিয়ে চট্টগ্রাম থেকে বিকাল ৫টায় কক্সবাজার আদালতে পৌঁছায় পুলিশ। এর আগেই বিকাল পৌনে ৪টায় পুলিশ পরিদর্শক লিয়াকতসহ মামলার সাত আসামিকে আদালতে নেওয়া হয়। আসামিদের আদালতে হাজির করার আগে পুরো এলাকায় নেওয়া হয় ব্যাপক নিরাপত্তা। সাংবাদিকদের পাশাপাশি আদালত প্রাঙ্গণে ভিড় করেন বিপুলসংখ্যক উৎসুক জনতা।

গত বুধবার রাত ১০টায় টেকনাফ থানায় আদালতের নির্দেশে মেজর সিনহার বোনের করা হত্যা মামলাটি নথিভুক্ত হয়। ওই দিন বেলা সাড়ে ১১টায় সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-৩ টেকনাফের বিচারক তামান্না ফারহার আদালতে অভিযোগ দায়ের করেন সিনহার বড় বোন শারমিন শাহরিয়া ফেরদৌস। পরে আদালত সেটি টেকনাফ থানাকে মামলা হিসেবে নথিভুক্ত করার নির্দেশ দেন।

টেকনাফের শামলাপুর চেকপোস্টে পুলিশের গুলিতে অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহার মৃত্যুর ঘটনায় তার বোন শারমিন শাহরিয়া ফেরদৌস যে হত্যা মামলা দায়ের করেছেন, তাতে লিয়াকতকে এক নম্বর এবং প্রদীপকে দুই নম্বর আসামি করা হয়েছে।

শারমিন বুধবার সকালে টেকনাফের বিচারিক হাকিম আদালতে মোট ৯ জনকে আসামি করে ওই মামলা করার পর বিকালে টেকনাফ থানা থেকে ওসি প্রদীপ কুমার দাশকে প্রত্যাহার করা হয়। পরিদর্শক লিয়াকত আলিসহ ২০ পুলিশ সদস্যকে প্রত্যাহার করে পুলিশ লাইনসে পাঠানো হয় দুদিন আগেই।

জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম তামান্না ফারাহ বুধবার হত্যা মামলাটি আমলে নিয়ে টেকনাফ থানাকে অভিযোগটি এজাহার হিসেবে গ্রহণের নির্দেশ দেন। পাশাপাশি মামলার তদন্তভার দেন র‌্যাবকে। বুধবার রাত সাড়ে ১০টায় টেকনাফ থানায় মামলাটি নথিভুক্ত করা হয় বলে কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এবিএম মাসুদ হোসেন জানান।

কী ঘটেছিল সেদিন

দুই বছর আগে সেনাবাহিনী থেকে স্বেচ্ছায় অবসরে যাওয়া সিনহা মো. রাশেদ খান ‘লেটস গো’ নামে একটি ভ্রমণবিষয়ক ডকুমেন্টারি বানানোর জন্য প্রায় এক মাস ধরে কক্সবাজারের হিমছড়ি এলাকায় ছিলেন। আরও তিন সঙ্গীকে নিয়ে তিনি উঠেছিলেন নীলিমা রিসোর্টে। গত ৩১ জুলাই রাতে কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভের বাহারছড়া ইউনিয়নের শামলাপুর চেকপোস্টে পুলিশের গুলিতে তিনি নিহত হন।

ঘটনাস্থল থেকে অস্ত্র ও মাদক উদ্ধারের কথা জানিয়ে সে সময় পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়, সিনহা তার পরিচয় দিয়ে ‘তল্লাশিতে বাধা দেন’। পরে ‘পিস্তল বের করলে’ চেক পোস্টে দায়িত্বরত পুলিশ তাকে গুলি করে। এই ঘটনায় পুলিশ মামলাও করে। তবে পুলিশের এই ভাষ্য নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিলে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে সেনাবাহিনী, পুলিশ ও প্রশাসনের প্রতিনিধি নিয়ে একটি উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।

এদিকে সিনহাকে হত্যা করা হয়েছে বলে দাবি করে বুধবারই কক্সবাজারের আদালতে মামলা করেন তার বোন শারমিন। এজাহারে তিনি অভিযোগ করেন, ওসি প্রদীপের ফোনে পাওয়া নির্দেশে বাহারছড়া পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের এসআই লিয়াকত আলি গুলি করেছিলেন সিনহাকে।

এ মামলার আসামিদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় ‘ইচ্ছাকৃত নরহত্যা’, ২০১ ধারায় আলামত নষ্ট ও মিথ্যা সাক্ষ্য তৈরি এবং ৩৪ ধারায় পরস্পর ‘সাধারণ অভিপ্রায়ে’ অপরাধ সংঘটনের অভিযোগ আনা হয়েছে। এর মধ্যে ৩০২ ধারার সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড।

ঘটনার সময় সিনহার সঙ্গে থাকা সাহেদুল ইসলাম সিফাতকে (২১) মামলার প্রধান সাক্ষী করা হয়েছে। ঘটনার দিনই তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। মাদক ও অস্ত্র আইনের মামলায় তাকেও আসামি করা হয়।

সিনহা নিহতের ঘটনায় জড়িত সব পুলিশ সদস্যকে গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়ে গত বুধবার ঢাকায় সংবাদ সম্মেলন করে সশস্ত্র বাহিনীর সাবেক কর্মকর্তাদের সমিতি রিটায়ার্ড আর্মড ফোর্সেস অফিসার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন (রাওয়া)। একই দিন সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ এবং পুলিশপ্রধান বেনজীর আহমেদ কক্সবাজারে গিয়ে সেনা ও পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন।

এরপর এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে তারা বলেন, এই ঘটনায় দায়ী হিসেবে যে বা যারা চিহ্নিত হবে, তারাই শাস্তি পাবে। এর দায় বাহিনীর ওপর পড়বে না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও মঙ্গলবার সিনহার মা নাসিমা আখতারকে ফোন করে সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচারের আশ্বাস দেন।