প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

‘ককস’ সাহেবের ‘কক্সবাজার’

শরিফুল ইসলাম পলাশ: বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেঁষে সাগরকন্যাখ্যাত কক্সবাজার জেলা। চট্টগ্রাম শহর থেকে ১৫৯ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে পাহাড়, সাগর, দ্বীপ, নদী ও সমতল ভূমি মিলিয়ে প্রকৃতির এক অনন্য মিলনস্থল কক্সবাজার। এ জেলায় রয়েছে ১২০ কিলোমিটার দীর্ঘ বালুকাময় সমুদ্রসৈকত। বিশ্বের দীর্ঘতম ওই সৈকত স্বাস্থ্যকর স্থান। কক্সবাজার জেলার উত্তরে চট্টগ্রাম, পূর্বে বান্দরবান, বাংলাদেশ-মায়ানমার সীমানা বিভক্তকারী নাফ নদী-মায়ানমার আর দক্ষিণ-পশ্চিমে বঙ্গোপসাগর। জেলার আয়তন প্রায় দুই হাজার ৪৯২ বর্গকিলোমিটার।

img_0711কক্সবাজার একসময় ‘প্যানেওয়া’ নামে পরিচিতি ছিল, যার সাহিত্যিক নাম ‘হলুদ ফুল’। এছাড়া ‘পালংকি’ নামটিও জড়িয়ে ছিল এ জেলার সঙ্গে। আধুনিক কক্সবাজারের নামকরণ করা হয়েছে প্রখ্যাত ব্রিটিশ নৌ-অফিসার ক্যাপ্টেন হিরাম কক্সের নামানুসারে, যিনি ব্রিটিশ ইন্ডিয়ার আর্মি অফিসার ছিলেন। কক্সবাজারের ইতিহাস জানতে ফিরে যেতে হবে আরো অতীতে; মোগল শাসকদের আমলে। সে সময় কক্সবাজার হয়ে আরাকান প্রদেশে যাওয়ার পথে মোগল শাসক শাহ সুজা ওই অঞ্চলের পাহাড় ও সমুদ্রের মেলবন্ধনে সৃষ্ট অপার সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ হয়ে ঘাঁটি গাড়েন। প্রায় এক হাজার পালকিসহ সেখানে অবস্থান নেয় শাসকের সেনাবহর। তখন পালকি ‘ঢুলি’ নামেও পরিচিত ছিল। মোগল সম্রাটের পালকি রাখার ঘটনাকে ঘিরে একটি এলাকার নামকরণ করা হয়েছে ‘ডুলাহাজারা’, এটি বর্তমানে চকরিয়া উপজেলার একটি ইউনিয়ন।

মোগল সাম্রাজ্যের পতনের পর ওই অঞ্চল টিপরা ও আরাকানদের দখলে চলে যায়। পর্তুগিজরাও কিছু সময় ওই অঞ্চল শাসন করে। ইংরেজ শাসনামলে পুরো অঞ্চলের দেখভালের দায়িত্ব দেওয়া হয় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ক্যাপ্টেন হিরাম ককস-কে। তিনি প্রথম সেখানে একটি বাজার স্থাপন করেন। ওই বাজারটি শুরুতে ‘ককস সাহেবের বাজার’ নামে পরিচিত ছিল। এটিই পরবর্তী সময়ে ককসবাজার বা কক্সবাজার হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। প্রসঙ্গত হিরাম ককস ১৭৯৮ সালে মৃত্যুবরণ করেন।

ককস সাহেবের ওই বাজার মহকুমায় পরিণত হয় ১৮৫৪ সালে। ইংরেজ ঔপনিবেশিক ব্যবস্থার অবসানের পর কক্সবাজার তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সীমানাভুক্ত হয়। স্বাধীনতার ১৩ বছর পর ১৯৮৪ সালে ‘কক্সবাজার মহকুমা’র তকমা মুছে জেলায় রূপান্তরিত হয়। কক্সবাজার পৌরসভার প্রথম চেয়ারম্যান হন ক্যাপ্টেন অ্যাডভোকেট ফজলুর করিম। তিনি সাগরসৈকতের পাশ দিয়ে বনায়নের সূচনা করেন, যা পর্যটনের বিকাশ ও সাগরের জোয়ারের হাত থেকে জেলাটিকে রক্ষায় ভূমিকা রাখে। কক্সবাজারে পাবলিক লাইব্রেরি ও টাউন হলও তিনি স্থাপন করেন।

coxs_bazar-001-jpegসাগরের বেলাভূমি, ভৌগোলিক অবস্থান ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের কল্যাণে কক্সবাজার বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন স্পট হিসেবে পরিণত হয়েছে। বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্ক, প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিনস, সোনাদিয়া দ্বীপ, পাহাড়ি দ্বীপ মহেশখালী, কুতুবদিয়া দ্বীপ, রম্যভূমি রামু, কলাতলী ও ইনানী সমুদ্রসৈকত, হিমছড়ি ঝরনা, বৌদ্ধ মন্দির, ইতিহাসখ্যাত কানারাজার গুহা, রাখাইন পল্লির টানে ফি বছর দেশ ও বিদেশের পর্যটকরা কক্সবাজারে আসেন।