প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

কক্সবাজারে হারিয়ে যাওয়ার পথে জলজ পাখি পানকৌড়ি

বনভূমিতে রোহিঙ্গাদের আশ্রয়

কাইমুল ইসলাম ছোটন, কক্সবাজার: ‘চুপ চুপ ওই ডুব দেয় পানকৌড়ি। দেয় ডুব চুপ চুপ ঘোমটার বউটি’ বিংশ শতাব্দীর ছন্দের জাদুকর কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের ‘দূরের পাল্লা’ কবিতার ন্যায় বর্তমানে নদীর তীরে পানকৌড়িকে ডুব দিতে তেমন দেখা মিলে না। বছর দশেক আগেও ঝাঁকে ঝাঁকে তাদের দেখা যেত। ঝোপঝাড় জঙ্গল, জলাশয়, পুকুর, খাল-বিল, ধানক্ষেত ও নদীতে কুচকুচে কালো পাখিটি শিকারের অপেক্ষায় থাকতেন। গ্রামেই যাদের শৈশব তাদের অনেকে পানকৌড়িকে ডুবুরি পাখিও বলেন। জল আর মাছ যেখানে, সেখানেই ওদের অবাধ বিচরণ। সম্প্রতি শিকারীদের ফাঁদে (মাছ সংরক্ষণের নামে জালের ব্যবহার) আটকা পড়াসহ খাদ্যের সংকট ও পরিবেশের বিপর্যয়ের কারণে গত দশ বছরে অস্বাভাবিক হারে হ্রাস পেয়েছে পানকৌড়ির সংখ্যা। পাখিদের আবাসস্থল দখল, পাহাড় কাটা, সংরক্ষিত বনাঞ্চল নিধনসহ ফসলি জমিতে বিষ প্রয়োগের ফলে ডুবুরি পাখিটি দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে বলে ধারণা করেন পরিবেশবাদীরা।

স্থানীয় পরিবেশ কর্মীরা জানান, কক্সবাজারে ১ হাজার ৭৮৩ হেক্টর বনভূমির উপর রোহিঙ্গারা আশ্রয় নিয়েছেন। যারা প্রতিনিয়ত বন নিধন করছেন। চকরিয়ায় চিংড়ি চাষ ও লবণের দাপটে প্রায় ৪৫ হাজার এককের সুন্দরবন ধ্বংসের মুখে। তাছাড়া বিভিন্ন প্রকল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণ, পাহাড়ের গহীনে রাস্তা নির্মাণ, হোটেল-মোটেল তৈরিতে জলাশয় দখল, নদী ভরাট, পাখির বাসস্থান সংকুচিত হওয়ার কারণে পানকৌড়ি বিলুপ্তির পথে।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) কক্সবাজার জেলার সাধারণ সম্পাদক কলিম উল্লাহ কলিম শেয়ার বিজকে বলেন, জাতিসংঘের ঘোষণা অনুযায়ী বিলুপ্ত প্রাণীগুলো সংরক্ষণের দায়িত্ব রাষ্ট্রের। বর্তমানে পানকৌড়ি তেমন দেখা মিলে না। হয়ত একদিন বিলুপ্ত হয়ে যাবে। তাই এখন থেকে বন বিভাগ চাইলে পাখিদের জন্য বিশেষ আবাসস্থলের ব্যবস্থা নিতে পারেন।

কক্সবাজারের উত্তর-পশ্চিমে বঙ্গোপসাগরের কূল ঘেঁষে গড়ে উঠা দেশের একমাত্র পাহাড়ী দ্বীপ মহেশখালী। মহেশখালী উচ্চারণ করলেই পাহাড়, নদীসহ সবুজে ভরপুর পাখি সম্মিলিত জনপদের চিত্র ফুটে উঠে। উপজেলার পশ্চিমে ধলঘাটা ও মাতারবাড়ি দুটি দ্বীপ রয়েছে। কৃষি নির্ভরশীল এলাকায় ১ হাজার ৪১৪ একর জমিতে কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র (শিল্পাঞ্চল) গড়ে উঠেছে। এ অঞ্চলে জ্যামিতিক হারে জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে বাসস্থানের চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাতে কৃষি জমি, খাল-বিল, জলাশয়, নদী ও পুকুরের সংখ্যা হ্রাস পেয়েছে। যে কৃষি জমি অবশিষ্ট আছে, সেখানে বিষ প্রয়োগের ফলে পোকামাকড়, মাছ, ব্যাঙ, মেটোসাপ কমে গিয়েছে। তার উপর পাহাড় কাটা, গাছ কাটা, নদী ভরাটসহ পরিবেশ দূষণের পরিমাণ বাড়ছে দিন দিন। খাদ্যের সংকট ও পরিবেশের বিপর্যয়ের কারণে গত দশ বছরে ক্রমহ্রাসমান হারে কমতে শুরু করেছে দ্বীপে বিচরণ করা পানকৌড়ির সংখ্যা। যেখানে পানকৌড়ির মাছ শিকারের নিয়মিত দৃশ্য দেখা যেতো।

স্থানীয়রা জানান, মহেশখালীর অপরূপ সৌন্দর্য্যের  লীলাভূমি সোনাদিয়া দ্বীপে পানকৌড়ির বিচরণ এখনো রয়েছে। দ্বীপে যাওয়ার জন্য ছোট ছোট নৌকায় প্যারাবনের মাঝখান ধরে খাল বেয়ে আঁকাবাঁকা পথ ধরে সামনে এগিয়ে যেতে হয়। খালের মাঝখানে কিংবা দুই পাশে বেশ কয়েকটি পানকৌড়ির দলের দেখা মিলবে। তবে অন্যান্য এলাকার মতো সোনাদিয়া দ্বীপের পানকৌড়িগুলোও অচিরেই হারিয়ে যাবে। তার অন্যতম কারণ এখানে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) ইতিমধ্যে ৯,৪৬৭.৩১ একর জমিতে সোনাদিয়া ইকো-ট্যুরিজম পার্ক গড়ে তোলার মাস্টার প্লান শুরু করেছে। সেই সাথে ক্রমবর্ধমান হারে বাড়ছে প্যারাবন নিধন, খালের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে খাল ভরাট এবং পানি দূষণের মত কাজও। বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী আইনে এই পাখিটি সংরক্ষণের বিধান থাকলেও আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা একেবারেই নীরব বলে স্থানীয়রা মনে করেন। তবে বনবিভাগের দাবি, তারা নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছেন।

পরিবেশবাদী সংগঠন সিইএইচআরডিএফ এর সহকারি প্রধান আবদুল মান্না বলেন, ‘পানকৌড়ি মূলত উষ্ণ ও নাতিশীতোষ্ণ এলাকায় বিচরণ করেন। কিন্তু গত ১০ বছরে জলবায়ু পরিবর্তন ও বহু উন্নয়ন কর্মযজ্ঞের কারণে এ এলাকার প্রাকৃতিক আবহাওয়া অতিমাত্রায় বেড়েছে। মূলত এই পাখি খাদ্য আহরণের জন্য জলের খুব গভীরে গিয়ে ছোট মাছ, শামুক ও বিভিন্ন শৈবাল শিকার করে থাকেন। তবে, বর্তমানে এলাকার চারভাগের তিন ভাগ উন্নয়ন কর্মযজ্ঞের বদৌলতে পানি শূন্য। বর্তমানে উন্নয়ন প্রকল্পের যন্ত্রপাতির শব্দে বহু প্রজাতির পাখি প্রায় বিলুপ্ত তার মধ্যে পানকৌড়ি একটি। এ এলাকার পূর্বে কুহেলিয়া, দক্ষিণ-পশ্চিমে বঙ্গোপসাগর এবং উত্তরে উজানটিয়া খাল। একদিকে বঙ্গোপসাগর থেকে বালু উত্তোলনের কারণে তীব্রস্রোত তৈরি, আর অন্য দিকে কয়লাবিদ্যুৎ প্রকল্পের পলি গিয়ে কুহেলিয়া নদীর নাব্যতা হারাচ্ছে। কুহেলিয়া নদীর দুইধারে যে প্যারাবন ছিল তাও উজাড় করে ফেলা হয়েছে। ফলে পানকৌড়ির আবাসস্থল বিনষ্ট হয়ে গেছে।’

এদিকে মহেশখালী বনবিভাগের রেঞ্জ কর্মকর্তা আনিছুর রহমান জানান, পানকৌড়ি পাখিটি বিগত সময়ে হ্রাস পেয়েছে কিনা সে বিষয়ে কোন তথ্য নেয়। তবে পাখি শিকারীদের বিরুদ্ধে তারা অভিযান পরিচালনা করেন। পাশাপাশি বিলুপ্তির পথে কোন কোন পাখি রয়েছে সেই বিষয়ে গবেষণার সুযোগ নেই তাদের কাছে।

এ ব্যাপারে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মনজুরুল কিবরিয়া শেয়ার বিজকে বলেন, বাসস্থান নষ্ট হয়ে যাওয়া, খাদ্য ঘাটতি দেখা দেওয়া পাখিটি কমে আসার প্রধান কারণ। জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে জলাশয় ভরাট হচ্ছে। ফলে পানকৌড়ি নিরাপদ বাসস্থানের জন্য অন্যত্র চলে যাচ্ছে। এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, সংখ্যা কমলেও পানকৌড়ি এখনো লাল তালিকাভুক্ত হয়নি, বর্তমানে কিছু কিছু স্থানে দেখা যায়। তালিকাভুক্ত হলে এটি সংরক্ষণের জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।

তিনি আরও বলেন, পানকৌড়ি আমাদের অনেক উপকার করেন। ফসলের ক্ষতিকর পোকামাকড় খেয়ে ফেলেন। তাদের বিষ্টা থেকে সার হয়, মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি পায়। তাছাড়া পানিতে পড়তে তা মাছের খাদ্য হিসেবে পরিণত হয়। কেউ পাখি শিকার করলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।