বাণিজ্য সংবাদ

কনটেইনার পরিবহন সক্ষমতায় ছয় ধাপ এগোল চট্টগ্রাম বন্দর

লয়েড’স লিস্টের সর্বশেষ জরিপ

সাইফুল আলম, চট্টগ্রাম” চলতি বছর বিশ্বের সেরা ১০০ কনটেইনার হ্যান্ডলিংকারী বন্দরের মধ্যে চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর ৬৪তম স্থানে উঠে এসেছে। ২০১৮ সালে এ তালিকায় দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরের অবস্থান ছিল ৭০তম। অর্থাৎ গত বছরের চেয়ে এ বছর ছয় ধাপ উন্নীত হয়েছে চট্টগ্রাম বন্দরের। আর ২০০৮ সালে এ তালিকায় চট্টগ্রাম বন্দর ছিল ৯৫তম। গত ২৯ জুলাই মেরিটাইম সেক্টরের জনপ্রিয় সংবাদ সাময়িকী ‘লয়েড’স লিস্ট’ তাদের ওয়েবসাইটে ‘ওয়ান হানড্রেড পোর্টস ২০১৯’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এ তথ্য প্রকাশ করে।
লয়েড’স লিস্টের হিসাব অনুযায়ী, চট্টগ্রাম বন্দর ২০১৮ সালে ২৯ লাখ তিন হাজার ৯৯৬ টিইইউ’স (২০ ফুট দীর্ঘ) কনটেইনার হ্যান্ডলিং করেছে। ২০১৭ সালে এ সংখ্যা ছিল ২৬ লাখ ৬৭ হাজার ২২৩ টিইইউ’স। অর্থাৎ গত বছর বন্দরের কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৮ দশমিক ৯ শতাংশ।
এদিকে বিশ্বসেরা চীনের সাংহাই ২০১৮ সালে হ্যান্ডলিং করেছিল চার কোটি ২০ লাখ ১০ হাজার ২০০ টিইইউ’স কনটেইনার। ২০১৭ সালে এ সংখ্যা ছিল চার কোটি দুই লাখ ৩৩ হাজার টিইইউ’স। অর্থাৎ সাংহাই বন্দরের কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ে গত বছর প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪ দশমিক ৪ শতাংশ।
তথ্যমতে, সেরা ১০০ সমুদ্রবন্দরের তালিকায় ২০১৮ সালেও শীর্ষে ছিল চীনের সাংহাই বন্দর। এছাড়া গত বছরের মতো এবারও তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থান ধরে রেখেছে সিঙ্গাপুর বন্দর। এ বন্দরে ২০১৮ সালে কনটেইনার হ্যান্ডলিং করা হয় তিন কোটি ৬৫ লাখ ৯৯ হাজার ৩০০ টিইইউ’স। ২০১৭ সালে এ সংখ্যা ছিল তিন কোটি ৩৬ লাখ ৬৬ হাজার ৬০০ টিইইউ’স। সিঙ্গাপুর বন্দরের গত বছর কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ে প্রবৃদ্ধি ছিল ৮ দশমিক ৭ শতাংশ।
‘ওয়ান হানড্রেড পোর্টস ২০১৯’ অনুযায়ী, বিশ্বের র্শীষ ১০ সমুদ্রবন্দরের তালিকার তৃতীয়, চতুর্থ, পঞ্চম, সপ্তম, অষ্টম ও নবম অবস্থান চীনের বিভিন্ন বন্দরের দখলে রয়েছে। এর বাইরে ষষ্ঠ অবস্থানে এসেছে দক্ষিণ কোরিয়ার বুসান বন্দর। আর দশম অবস্থানে মধ্যপ্রাচ্যের দুবাই পোর্ট। এছাড়া শীর্ষ ২০টি বন্দরের মধ্যেও চীনের আরও দুটি বন্দর রয়েছে।
এর বাইরে নেদারল্যান্ডসের রটারডেম পোর্ট রয়েছে ১১তম অবস্থানে। মালয়েশিয়ার পোর্ট কেলাং ১২তম হয়েছে। এছাড়া নিকটতম বন্দর কলম্বো বন্দর ২৪তম। পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশ ভারতের জওহরলাল নেহেরু বন্দর ২৮তম ও মুন্দারা ৩৬তম অবস্থানে রয়েছে। আর পাকিস্তানের করাচি বন্দর রয়েছে ৮৩তম অবস্থানে। একই তালিকায় শততম অবস্থানে রয়েছে তাইওয়ানের তাইপে বন্দর। সেরা ১০০ বন্দরের মধ্যে চীনের মোট ২২ বন্দর স্থান করে নিয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দর সূত্রে জানা যায়, দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম দিয়ে বাড়ছে আমদানি-রফতানি। প্রতি বছর এ বন্দরের জাহাজ, কনটেইনার ও কার্গো হ্যান্ডলিং বাড়ছে। ২০১৮ সালে এ বন্দরের জাহাজ হ্যান্ডলিং ছিল তিন হাজার ৭৪৭টি, যা আগের বছরে ছিল তিন হাজার ৩৭০টি। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে জাহাজ খালাস বেড়েছে ৩৭৭টি। একই বছর বন্দরের কনটেইনার হ্যান্ডলিং ছিল ২৯ লাখ তিন হাজার টিইইউএস, যা আগের বছর ছিল ২৬ লাখ ৬৭ হাজার টিইইউএস।
২০১৮ সালে সাধারণ কার্গো হ্যান্ডলিং ছিল ৯ কোটি ৬৩ লাখ মেট্রিক টন। অর্থাৎ আগের বছরের তুলনায় জাহাজ হ্যান্ডলিংয়ে প্রবৃদ্ধি ১১ শতাংশ, কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ে ৯ শতাংশ এবং কার্গোতে প্রায় ১৩ শতাংশ। কয়েক বছর ধরে প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধির ধারা অব্যাহত আছে। ফলে চট্টগ্রাম বন্দরের চলতি বছরের ১১ মাসে নিট মুনাফা বেড়েছে ৩১২ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। অর্থাৎ ২০১৭-১৮ অর্থবছরে (সাময়িক হিসাবে) বন্দরের নিট মুনাফা ছিল ৭৯২ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। আর চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে মে (অনিরীক্ষিত হিসাব) পর্যন্ত হয়েছে এক হাজার ১০৪ কোটি ৯১ লাখ টাকা। শতাংশের হিসাবে এ প্রবৃদ্ধি শতকরা ৩৯ ভাগেরও বেশি।
বন্দর ব্যবহারকারীরা বলেন, প্রতি বছরই চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে বেড়ে চলেছে কনটেইনার ও পণ্য পরিবহন। বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য ওঠানামার প্রবৃদ্ধি প্রায় ১৫ শতাংশ। খাদ্যপণ্য থেকে শুরু করে মূলধনি যন্ত্রপাতি, শিল্পকারখানার কাঁচামাল ও গৃহস্থালি পণ্য সবকিছুই এখন আমদানি হচ্ছে কনটেইনারে। রফতানি পণ্যের প্রায় পুরোটাই যাচ্ছে কনটেইনারে। এ কারণে কনটেইনারে আমদানি-রফতানি পণ্য পরিবহনের প্রবৃদ্ধিও বাড়ছে। এক্ষেত্রে তৈরি পোশাকসহ শিল্পের প্রসার ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য আমদানি-রফতানি বাণিজ্য সম্প্রসারিত হচ্ছে। আবার প্রতিবেশী দেশগুলোর ট্রানজিট ও ট্রান্সশিপমেন্টের বিষয়টিও সামনে আসছে। সবকিছু মিলিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা বাড়ে, এমন বড় প্রকল্পে বিনিয়োগে নজর দিতে হবে কর্তৃপক্ষকে।
সম্প্রতি আলাপে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল জুলফিকার আজিজ শেয়ার বিজকে বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরকে বিজনেস ফ্রেন্ডলি পোর্ট হিসেবে গড়তে এরই মধ্যে অনেক প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এর মধ্যে সাউথ কনটেইনার ইয়ার্ড নির্মাণ, ওভারফ্লো ইয়ার্ড চালু, কর্ণফুলী ড্রেজিংয়ের কাজ, পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনালের কাজ ও এক হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ৬০টির বেশি বিভিন্ন ধরনের যন্ত্রপাতি সংগ্রহ করা হয়। এতে বন্দরের বহির্নোঙরের জাহাজের অপেক্ষমাণ সময় কমেছে। ফলে বেশি জাহাজ ভিড়তে পারছে। সব মিলিয়ে কনটেইনার পরিবহনে গতিশীলতা বেড়েছে। আর এতে দেশের আমদানি ও রফতানি কার্যক্রম আরও গতিশীল হয়েছে।

 

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..