দিনের খবর মত-বিশ্লেষণ

কন্যাসন্তান অপয়া নয়, আশীর্বাদ

মানুষের কাছে তার সবচেয়ে প্রিয় বা আরাধনার ধন হলো তার সন্তান, কেননা পৃথিবীতে অনেক কিছুই চাইলে পাওয়া যায়, কিন্তু সন্তান পাওয়ার ক্ষেত্রে কারও কোনো ক্ষমতা নেই। আর সন্তানমাত্রই সৃষ্টিকর্তার শ্রেষ্ঠ উপহার, তা কন্যাসন্তান হোক বা পুত্রসন্তান। বাবা-মা দুনিয়ায় যা কিছু গড়ে তোলে সবই তার সন্তানকে ভালো রাখার জন্য।

আগেকার সময়ে মানুষের মধ্যে সন্তানের জন্মহার অনেক বেশি ছিল, কিন্তু এখন পরিবার পরিকল্পনার কল্যাণে তা অনেক কম হয়ে গেছে। এখন অধিকাংশ পরিবারে দুই থেকে তিনটির বেশি সন্তান দেখা যায় না। কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে তার ব্যতিক্রম দেখা যায়। সবাই চাই তার দুটা সন্তানের মধ্যে একটা কন্যাসন্তান ও একটা পুত্রসন্তান হোক, কিন্তু সর্বদা মনের আশা পূরণ হয় না। এমন কিছু পরিবার আছে যেখানে চারটি মেয়েসন্তান ও একটি ছেলেসন্তান, অথবা যাদের একাধিক কন্যাসন্তান আছে তারা একটা পুত্রসন্তান প্রত্যাশী। কিন্তু যে পরিবারে একাধিক পুত্রসন্তান আছে তারা কন্যাসন্তান প্রত্যাশী নয়। অনেকের মনোভাব এমন যে, কন্যাসন্তান পুত্রসন্তানের সমতুল্য নয়। কোনো কোনো সমাজে কন্যাসন্তানকে অপয়া বলে গণ্য করা হয় এবং নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখা হয়। তাই সন্তান জন্ম দেওয়ার আগেই ভ্রুণ হত্যা করা হয়, বা জন্মের পর কন্যাসন্তানকে মাটিতে পুঁতে ফেলা হয়, অথবা জীবিত থাকলেও সেই সন্তান সমাদর পায় না। অন্যথায় কন্যাসন্তান জন্মের পরই শুরু হয় মা ও শিশুর প্রতি চরম অবহেলা, আবার ভেঙে যায় অনেক সংসারও, যা অত্যন্ত অমানবিক নির্যাতন ও অজ্ঞতাপ্রসূত। আবার অনেক মা নিজেকে পুত্রসন্তানের মা বলে দাবি করে গর্ববোধ করলেও কন্যাসন্তানের মা বলতে অসন্তোষ প্রকাশ করে। কন্যাসন্তানের প্রতি বৈষম্য শুধু পরিবারের নয়, কিছুটা সমাজ ও রাষ্ট্রের। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত পুত্রকন্যার লালনপালন থেকে শুরু করে লেখাপড়া, সুযোগ-সুবিধা, কাজকর্ম, সম্পত্তিÑসব ক্ষেত্রে বৈষম্য দেখা যায়। পুত্রকন্যা নিয়ে এ বৈষম্য অনেক আগে থেকেই হয়ে আসছে এবং হয়তো তা পৃথিবী ধ্বংসের আগ পর্যন্ত বদলাবে না। কিন্তু বর্তমান যুগে আমাদের এই ধারণা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। কন্যা ও পুত্রকে লিঙ্গনিরপেক্ষভাবে সন্তান চোখে দেখতে হবে। উভয়ের ক্ষেত্রে সমান অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। পুত্রসন্তানের মতো কন্যাসন্তানকেও উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করার সুযোগ-সুবিধা দিতে হবে এবং সুন্দর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে হবে। কন্যাসন্তানকে অপয়া হিসেবে নয়, আশীর্বাদস্বরূপ গ্রহণ করতে হবে। কন্যা বা নারীকে পণ্য নয়, বরং সর্বোচ্চ সম্মান ও মর্যাদা দিতে হবে। কন্যাকে ভবিষ্যৎ দিনের প্রেরণাদানকারী কোনো স্ত্রী বা সুসন্তান গঠনকারী কোনো মমতাময়ী মা হিসেবে দেখতে হবে। মা-বাবার স্বপ্ন পূরণ শুধু পুত্রসন্তান নয়, কন্যাসন্তানও করতে পারে, সেটি বাস্তবায়নের সুযোগ করে দিতে হবে। মেয়েরা অনেক অধিকার থেকে বঞ্চিত হলেও তাদের চেষ্টা ও আত্মবিশ্বাসের ফলে পৌঁছে গেছে সফলতার শীর্ষে, আর তা আমাদের নিজ দেশের চিত্রটি দেখলে অনেকটা পরিষ্কার হয়ে যায়। আমাদের দেশের পরিস্থিতি বিবেচনায় মেয়েরা ছেলেদের তুলনায় সফলতার চূড়ায় অবস্থান করছে। আমাদের দেশের প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে স্পিকার, শিক্ষামন্ত্রী ও নেতৃস্থানীয় অধিকাংশ পদেই নারীর অবস্থান। এটি সম্ভব হয়েছে শুধু প্রচেষ্টা আর আত্মবিশ্বাসের জোরে। এছাড়া বর্তমানে বাবা-মায়ের বার্ধক্যে সেবাদানকারী হিসেবে পুত্রের তুলনায় কন্যা অনেকখানি এগিয়ে থাকে। অনেক পুত্রই বৃদ্ধ বাবা-মায়ের দায়িত্ব নিতে অস্বীকার করে, কিন্তু কন্যাসন্তান তা করে না। তাই কন্যাসন্তানকে আশীর্বাদস্বরূপ গ্রহণ করাই শ্রেয়। কন্যাসন্তানের গুরুত্ব প্রদানের নিমিত্তে প্রতিবছর ৩০ সেপ্টেম্বর জাতীয় কন্যাশিশু দিবস পালিত হয়। এই দিনে জাতীয় ও সামাজিক জীবনে একটা কন্যাশিশুর গুরুত্ব কতটা তা বোঝানোর প্রয়াস চলে। আর যেহেতু এখন দেশের জনসংখ্যার অর্ধেক অংশই হচ্ছে নারী, তাই দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে কন্যাশিশুকে অবহেলা করা কোনো সুযোগ নেই। আমাদের এখন উচিত কন্যাশিশুকে সুশিক্ষিত করে গড়ে তোলা এবং উন্নত দেশের স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে অর্থনীতির মূল ধারায় নারীর সম্পৃক্ততা বাড়ানো। এই সামান্য পদক্ষেপেই গড়ে উঠতে পারে ভবিষ্যতের আদর্শ ও কর্মতৎপর নারী, যার আলোয় আলোকিত হতে পারে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র।

তামান্না ই জান্নাত

শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..