কভিডকালে কাজ হারানো জনগোষ্ঠীকে সহায়তা দিন

বৈশ্বিক মহামারি কভিডের অভিঘাত বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে দেশের অর্থনীতিতে। কর্মসংস্থান হারিয়েছেন বিপুলসংখ্যক মানুষ। আয় কমেছে সবার। বেড়েছে নতুন দারিদ্র্যের সংখ্যাও। যারা কখনও কল্পনাও করেননি, টিসিবির ট্রাকের সামনে লাইনে দাঁড়িয়ে সাশ্রয়ী দামে নিত্যপণ্য কেনার কথা, তারাও সংকোচ ভুলে দাঁড়াতে বাধ্য হয়েছেন। টিসিবির সাশ্রয়ী পণ্যের প্রধান ক্রেতা এখন মধ্যবিত্তরা।

এই যখন অবস্থা, তখন কর্মজীবী শ্রমিকদের অবস্থা কী, তা সহজেই অনুমেয়। কর্মজীবীদের অনেকে কভিডের আগের চেয়ে কষ্টকর অবস্থায় আছেন। আয় কমে যাওয়ায় ব্যয় কাটছাঁট করতে বাধ্য হচ্ছেন অনেকে। বেঁচে থাকার মতো খাদ্য এবং জরুরি শিশুখাদ্য কিনতে হিমশিম খাচ্ছেন তারা। নিন্ম আয়ের অনেক কর্মজীবী খাদ্য গ্রহণ কমিয়ে দিয়েছেন বলেও জানা যাচ্ছে। চাকরি হারিয়ে দিনমজুর হয়েছেন ২০ শতাংশ পোশাকশ্রমিক। আর অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের কষ্টের শেষ নেই। কভিডকালে ঢাকা ও অন্যান্য শহরের ৫৭ শতাংশের বেশি নারী গৃহকর্মী বেকার হয়েছেন। কাজ হারানো এসব নারীর মধ্যে মাত্র পাঁচ শতাংশ বিকল্প পেশায় নিযুক্ত হতে পেরেছেন। কাজ হারানো গৃহশ্রমিকদের মধ্যে এখন বেকার ৩৫ শতাংশ। যেখানে গৃহকর্তাই আছেন বিপাকে, সেখানে বাড়তি লোক রাখার সামর্থ্য নেই। কভিডকালে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে সমীক্ষায় উঠে এসেছে।

সম্প্রতি ঢাকা শহরের পরিবহন, দোকানপাট ও হোটেল-রেস্তোরাঁ খাতের শ্রমিকদের ওপর সাম্প্রতিক লকডাউনের প্রভাব নিরূপণ করেছে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ (বিলস)। বৃহস্পতিবার এ-সংক্রান্ত গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে সংস্থাটি। এতে বলা হয়েছে, কভিড মহামারিতে পরিবহন, দোকানপাট ও হোটেল-রেস্তোরাঁয় চাকরি হারিয়েছেন ৮৭ শতাংশ শ্রমিক। তাদের সাত শতাংশ এখনও বেকার। গড়ে এসব মানুষের আয় কমেছে আট শতাংশ।

চাকরি হারানো শ্রমিকদের মধ্যে যারা নিজেদের কারখানায় কাজ ফিরে পাননি, সেসব শ্রমিকের খরচ কিন্তু কমেনি। বাসাভাড়ায় ছাড় নেই, নিত্যপণ্যের দামও চড়া। কৃচ্ছ্রসাধনের জন্য কাজ হারানো শ্রমিকরা খাওয়া কমিয়ে দেন। তাদের নিজের ও পরিবারের সদস্যদের অন্নের সংস্থান করতে কষ্ট হয়। পুষ্টিহীনতায়ও ভুগতে পারেন কেউ কেউ। কাজ হারানো পোশাকশ্রমিকদের দুর্ভোগ যাতে দীর্ঘায়িত না হয়, সেজন্য তাদের আর্থিক সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় আনা গেলে অন্তত কেউ বাদ পড়বে না। কিন্তু সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি শেষ ও স্থায়ী সমাধান নয়। ‘বসে খেলে রাজভাণ্ডারও ফুরিয়ে যায়।’ চাকরি হারানো লোকদের আয়বর্ধক কাজে প্রণোদনা দিতে হবে। কভিডকালে কাজ হারানো জনগোষ্ঠীর জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা সহজ নয়। তাদের কম সুদে কিংবা বিনা সুদে ক্ষুদ্রঋণ দেয়া গেলে সুফল মিলতে পারে। যেমন পরীক্ষামূলক কার্যক্রমে এমএফএস সার্ভিস বিকাশের ১৮ হাজার গ্রাহককে ঋণ দিয়েছে সিটি ব্যাংক। এতে খেলাপি ঋণ এক শতাংশের কম। এখন পূর্ণাঙ্গভাবে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম শুরু করবে ব্যাংকটি। অন্য ব্যাংকগুলোও এ কার্যক্রম শুরু করতে পারে।

এতে একজন রিকশাচালক বা ফুটপাতের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী কম ঝক্কিতে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ নিতে পারবেন। যারা এ ঋণ নেবেন, এক বছরের মধ্যে তাদের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় না আনলেও চলবে। সবার কর্মসংস্থান যেহেতু সম্ভব নয়, তাই আত্মকর্মসংস্থানে রাষ্ট্র ক্ষুদ্রঋণ দেয়ার বিষয় বিবেচনায় রাখতে পারে বলে আমরা মনে করি।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন   ❑ পড়েছেন  ৯৮৮  জন  

সর্বশেষ..