Print Date & Time : 27 September 2021 Monday 9:18 am

কভিডকালে কোরবানি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা

প্রকাশ: July 20, 2021 সময়- 12:27 am

ইমদাদ ইসলাম: আগামী কাল কভিড মহামারির মধ্যে পালিত হতে যাচ্ছে মুসলমানদের অন্যতম ধর্মীয় উৎসব পবিত্র ঈদুল আজহা। প্রতিদিনই করোনা সংক্রমণ ও মৃত্যু বাড়ছে লাফিয়ে লাফিয়ে। দেশ এক ভয়াবহ অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। কভিডে মৃত্যুর দিক দিয়ে বাংলাদেশ এখন বিশ্বের শীর্ষ ১০টি দেশের একটি। নতুন রোগী শনাক্তের দিক বিবেচনায় সারাবিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান ১২তম। খুলনা, ঢাকা ও চট্টগ্রামে করোনার প্রভাব বেশি। সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে সরকার কালবিলম্ব না করে ১ জুলাই থেকে কঠোর বিধিনিষেধ জারি করেছে। ঈদকেন্দ্রিক যাতায়াতে ও কোরবানির পশুর হাটে লোকসমাগম বাড়লে এবং স্বাস্থ্যবিধি না মানলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।

ঈদুল আজহার অন্যতম অনুষঙ্গ হলো ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের নিজ নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী পশু কোরবানি করা। প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের হিসেব অনুযায়ী এ বছর দেশে কোরবানির জন্য পশুর চাহিদা কম-বেশি ৯৫ লাখ থেকে এক কোটি ১০ লাখ। দেশে কোরবানির যোগ্য পশু রয়েছে এক কোটি ১৯ লাখেরও বেশি। এসব কোরবানির একটা বড় অংশ ঢাকা সিটি করপোরেশন এলাকায় সম্পন্ন হবে। কভিডকালে দেশের নাগরিকদের পশুর হাটে গিয়ে পশু কেনাকে নিরুৎসাহিত করার লক্ষ্যে সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় প্রায় ৮০০টির মতো পশু ক্রয়ের অনলাইন প্ল্যাটফর্ম চালু হয়েছে। এর মধ্যে সরকারি উদ্যোগে ৫৩০টি এবং বাকিগুলো বেসরকারি উদ্যোগে পরিচালিত হচ্ছে। গত ২ জুলাই থেকে এসব অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে কোরবানির পশু বিক্রি শুরু হয়েছে। প্রতিদিন চার হাজারেরও বেশি পশু বিক্রি হচ্ছে। এটি দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। মানুষের কাছে এটি জনপ্রিয় হচ্ছে। বেঙ্গল মিট, কিউকম ডটকম, ডিজিটাল হাট, প্রিয় শপ, দেশি গরু, ই-বাজার, আজকের ডিল ও বিক্রয় ডটকম এরই মধ্যে জনগণের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় অনলাইনে কোরবানির পশু ক্রয়ের একমাত্র ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ডিজিটাল হাট ডট নেট। বেঙ্গল মিট ছাড়াও আরও বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান থেকে কোরবানির পশু ক্রয় করে তাদের কোরবানি করার দায়িত্ব দেয়ার সুযোগ রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান ধর্মীয় সব বিধিবিধান পালনপূর্বক কোরবানি সম্পন্ন করে মাংস তাদের নিজ দায়িত্বে ২৪ ঘণ্টারও কম সময়ে পৌঁছে দিয়ে থাকে। ঢাকা শহরে এসব মাংস কোরবানির দিন সন্ধ্যার আগেই পৌঁছে দিয়ে থাকে। এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কোরবানি দেয়া হলে সময়, ও অর্থের সাশ্রয় হবে এবং কভিডকালে স্বাস্থ্য ঝুঁকি থাকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব হবে। এছাড়া এসব প্রতিষ্ঠান নিজ দায়িত্বে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা করে থাকে বলে পরিবেশের জন্য তা সহায়ক হয়। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের দুই মেয়র এরই মধ্যে কভিডকালে সরাসরি হাটে না গিয়ে ডিজিটাল হাট থেকে পশু কেনার জন্য সিটি করপোরেশনের নাগরিকদের অনুরোধ করেছেন।

আমাদের দেশে সবাই মিলে উৎসবমুখর পরিবেশে কোরবানির পশু হাট থেকে কিনে বাসায় নিয়ে আসার কালচার রয়েছে। কিন্তু আমাদের সবাইকে এই কভিড মহামারির সময় সচেতন ও দায়িত্বশীল হতে হবে। দলবেঁধে পশুর হাটে যাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। লোকসমাগম যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলতে হবে।

যত্রতত্র কোরবানি না দিয়ে কর্তৃপক্ষের নির্বাচিত নির্দিষ্ট জায়গায় কোরবানি দেয়া হলে অনেক সুবিধা পাওয়া যায়। এসব জায়গায় কর্তৃপক্ষ আগে থেকেই সকল প্রকার সহায়তার ব্যবস্থা করে থাকে, ফলে কোনো প্রকার ঝামেলা ছাড়াই কোরবানি সম্পন্ন করা সম্ভব হয়। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মোট ৭৫টি ওয়ার্ড রয়েছে। এগুলোকে ১০টি জোনে ভাগ করা আছে। দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মোট এলাকা প্রায় ১১০ কিলোমিটার। জনসংখ্যা প্রায় এক কোটি ২০ লাখ। এখানে অনুমোদিত ডাস্টবিন আছে চার হাজার ১৫৫টি। পরিচ্ছন্নতাকর্মী আছে পাঁচ হাজার ৪০০। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন কোরবানির পশুর বর্জ্য অপসারণের জন্য এরই মধ্যে পরিকল্পনা গ্রহণ করে সম্মানিত নাগরিকদের করণীয় সম্পর্কে বিভিন্ন মিডিয়ার মাধ্যমে প্রচার শুরু করেছে। কোরবানির পশুর বর্জ্য কোরবানির দিন দুপুর থেকে অপসারণের জন্য সব প্রকার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে এবং ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সব বর্জ্য অপসারণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে মোট ৫৪টি ওয়ার্ড রয়েছে। এগুলোকে ১০টি অঞ্চলে ভাগ করা হয়েছে। উত্তর সিটি করপোরেশনে মোট জনসংখ্যা প্রায় এক কোটি। মোট আয়তন ১৯৬ বর্গকিলোমিটারেরও বেশি। পরিচ্ছন্নতাকর্মী সবমিলিয়ে চার হাজার ৫০০ জন। কন্টেইনার কেরিয়ার ৪৪টি, আর্ম রোল আটটি, কম্পপ্যাকটর ৪৬টি, খোলা ট্রাক ৩২টি ও ড্রাম ট্রাক ৩৪টি। এসব সরঞ্জাম ও জনবলের মাধ্যমে কোরবানি পশুর বর্জ্য অপসারণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র এরই মধ্যে নগরবাসীর কাছে কোরবানির পশুর বর্জ্য অপসারণের বিষয়ে সহায়তা চেয়েছেন। এজন্য নগরবাসীকে সচেতন করতে প্রচার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ গণযোগাযোগ অধিদপ্তর, তথ্য অধিদপ্তর, চলচ্চিত্র প্রকাশনা অধিদপ্তর এবং বাংলাদেশ বেতার ও বিটিভি এ প্রচার কাজে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। উত্তর সিটি করপোরেশনে ‘সবার ঢাকা’ নামে একটি অ্যাপস চালু আছে। এটি ডিএনসিসির সিটিজেন এনগেজমেন্ট ম্যানেজমেন্ট প্ল্যাটফর্ম। এ অ্যাপসটি ব্যবহার করে উত্তর সিটি করপোরেশনের নাগরিকরা তাদের এলাকার সমস্যা বা মতামত মেয়রকে জানাতে পারেন। উত্তর সিটি করপোরেশন ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বর্জ্য অপসারণের লক্ষ্য নির্ধারণ করলেও কোরবানির দিন দুপুর থেকে বর্জ্য অপসারণের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে।

কোরবানির যে বিপুল পরিমাণ বর্জ্য তৈরি হবে, তা অপসারণের দায়িত্ব শুধু দুই সিটি করপোরেশনকে দিলে হবে না, এজন্য ব্যক্তিপর্যায়েও অনেক কিছু করণীয় আছে। পশুর মাংস কাটার সময় উচ্ছিষ্টগুলো সিটি করপোরেশন থেকে সরবরাহকৃত ব্যাগে ভরে সিটি করপোরেশনের নির্ধারিত স্থানে রাখতে হবে। এছাড়া কোরবানি দেয়ার স্থানগুলো সিটি করপোরেশনের দেয়া ব্লিচিং পাউডার দিয়ে নিজ দায়িত্বে পরিষ্কারের ব্যবস্থা করতে হবে।

কোরবানিদাতার অবহেলা ও অসচেতনতা কোরবানির পরিবেশ দূষণের জন্য দায়ী। মনে রাখা দরকার বর্জ্য অপসারণের প্রথম দায়িত্ব কোরবানিদাতার। যত্রতত্র কোরবানির বর্জ্য ফেলে পরিবেশ নষ্ট করে প্রতিবেশীকে কষ্ট দেয়া ইসলাম ধর্মের দৃষ্টিতে অগ্রহণযোগ্য। ইসলাম পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতার ধর্ম। কভিড মহামারি, চিকনগুনিয়া ও ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি হওয়ায় সিটি করপোরেশন থেকে নগরবাসীকে সচেতন করতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা, মাস্ক পরা, বারবার সাবান দিয়ে হাত ধোয়া এবং পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। কোরবানির পশুর বর্জ্য অপসারণ করতে পশুর জন্য কেনা খড়কুটো নির্দিষ্ট জায়গায় ফেলতে হবে। পশু রাখার জায়গা ব্লিচিং পাউডার দিয়ে পরিষ্কার করতে হবে। পশু জবাইয়ের পর রক্ত ও ময়লা ব্লিচিং পাউডার ও পানি দিয়ে পরিষ্কার করতে হবে। অযথা পানির অপচয় করা যাবে না। যে পোশাক পরে পশু জবাই করা হয়েছে বা মাংস কাটা হয়েছে, সেগুলো ভালো করে পরিষ্কার করতে হবে। কোরবানি ও পশুর মাংস কাটার সময় অযথা ভিড় করা যাবে না। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে হবে। পশুর চামড়া দ্রুত বিক্রি অথবা দান করে দিতে হবে।

পশু কোরবানির মাধ্যমে ইসলাম যে ত্যাগের শিক্ষা দেয়, তা যেন আমরা শুধু কোরবানির মধ্যে সীমাবদ্ধ না রাখি। আমরা জীবনের সব ক্ষেত্রে বিশেষ করে এই মহামারি কভিডকালে সবাই সবার জন্য স্বতঃস্ফূর্তভাবে ত্যাগ স্বীকার করে সহযোগিতার হাত বাড়াই। কোনো দরিদ্র অসহায় পরিবার যেন আমাদের কাছ থেকে বঞ্চিত না হয়, সেটি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।

পিআইডি নিবন্ধন