সুস্বাস্থ্য

কভিডকালে ডেঙ্গু: অতিরিক্ত সতর্কতা আবশ্যক

ডা. উম্মে হুমায়েরা কানেতা: বর্তমানে সবচেয়ে আতঙ্কিত হওয়ার মতো রোগ কোনটি; কিংবা আপনার বা পরিবারের অন্য কোন সদস্যদের কোন শারীরিক উপসর্গে আপনি বেশ চিন্তিত ও ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে উঠবেন? উত্তর একটাইÑ‘জ্বর।’ হ্যাঁ, জ্বর এলে এখন আর আগের মতো স্থির থাকা মুশকিল। জ্বর বা শরীরের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাওয়া কেবল একটি উপসর্গ। কিন্তু এর কারণ বহুমাত্রিকÑকভিড-১৯, নাকি ডেঙ্গু, নাকি চিকুনগুনিয়া, নাকি টাইফয়েড; কিংবা অন্যকিছু?

কভিড-১৯ নিয়ে দেড় বছর ধরে সারাবিশ্বে তোলপাড় অবস্থা। আমাদের দেশেও এর ধাক্কা খুব কম যায়নি। সংক্রমণ ও মুত্যুর হার দিন দিন বেড়েই চলেছে। সবাই যখন এই কভিডের সঙ্গে লড়াই করতে ব্যস্ত, তখন আমাদের দেশে, বিশেষ করে ঢাকায় যুক্ত হয়েছে নতুন ত্রাস ডেঙ্গু। ডেঙ্গু ফিভার, যার অন্য নাম ঢাকা ফিভার।

২০১৯ সালে ডেঙ্গুর কবলে পড়ে ঝরে পড়েছিল অসংখ্য তাজা প্রাণ। এ বছর কভিড মহামারির সঙ্গে ডেঙ্গু মিলে কী যে বিপর্যয় নিয়ে আসবে, তা ভাবতেও ভয় হয়। দুটো রোগের উপসর্গ এক হলেও চিকিৎসা পদ্ধতিতে রয়েছে বিস্তর পার্থক্য। কারও যদি দুটি রোগ একই সঙ্গে হয়, সেক্ষেত্রে স্বাস্থ্য জটিলতাও যেমন বেশি, পাশাপাশি চিকিৎসা পদ্ধতির জটিলতাও অনেক। অনেকেই প্রশ্ন করতে পারেন, ‘কেন?’ কভিডে রক্ত জমাট বাঁধার প্রবণতা বেড়ে যায়, এজন্য রক্ত পাতলা করার ওষুধ ব্যবহার করা হয়।

অন্যদিকে ডেঙ্গুতে রক্তপাত হওয়ার শঙ্কা বা ব্লিডিং টেনডেনসি থাকে। তাই রক্ত পাতলা করার ওষুধ দিলে আরও মারাত্মক পরিস্থিতি হওয়ার শঙ্কা থাকে। এরই মধ্যে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে সারাদেশে বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি প্রায় হাজার খানেক রোগী, যার অনেকেই আবার ভুগছেন কভিডেও। দুটি রোগের লক্ষণ যেহেতু কাছাকাছি, তাই জ্বর এলে এখন আর কোনো অবহেলা করাই যাবে না। জ্বর এলে অবশ্যই পরীক্ষা করাতে হবে।

কভিডে সাধারণত জ্বরের সঙ্গে গলাব্যথা, নাকে ঘ্রাণ না পাওয়া, মুখে স্বাদ না পাওয়া, শ্বাসকষ্টÑএই উপসর্গগুলো থাকে। অপরদিকে ডেঙ্গুতে জ্বর, আর তার সঙ্গে তীব্র শরীরব্যথা, মাথাব্যথা ও শরীরে র‌্যাশ আসতে পারে। দুটো রোগের প্রাথমিক চিকিৎসা ঘরে বসে টেলিমেডিসিনের মাধ্যমে নেয়া যায়। জ্বরের জন্য প্যারাসিটামল ছাড়া অন্য কোনো ব্যথার ওষুধ (এসপিরিন, আইবুপ্রফেন) খাওয়া যাবে না। প্রচুর তরল খাদ্য গ্রহণ করতে হবে। কভিড ও ডেঙ্গু শনাক্ত করার জন্য টেস্ট করাতে হবে।

যারা গর্ভবতী, শিশু, বৃদ্ধ ও স্থূল স্বাস্থ্যের অধিকারী, কিংবা দীর্ঘদিন ধরে ডায়াবেটিস, হাইপারটেনশন, কিডনি, হার্ট, লিভার বা অন্য কোনো দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক সমস্যায় ভুগছেন, তারা খুব সতর্ক থাকবেন এবং নিজ চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ সেবন করবেন। কখন হাসপাতালে আসা অত্যাবশ্যক, সে সম্পর্কেও ধারণা থাকতে হবে, যাকে আমরা বলি ওয়ার্নিং সাইন। পেটব্যথা, বমি, অতিরিক্ত দুর্বলতা, শ্বাসকষ্ট বা কনসাস লেভেল অলটার্ড হলে দেরি না করে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে। যারা উভয় সমস্যায় ভুগছেন, তারা কভিড ডেডিকেটেড হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে যাবেন। আর যাদের শুধু ডেঙ্গু হয়েছে, তারা অন্য হাসপাতালগুলোয় যাবেন। মনে রাখবেন, কখন কী করতে হবে বা কোথায় যেতে হবে, এই সঠিক ধারণার অভাবে অনেক রোগী বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতে থাকে, চিকিৎসা নিতে দেরি হয়ে যায়, ফলে রোগীর অবস্থা সংকটাপন্ন হয়ে ওঠে। তাই করণীয়গুলো জানতে হবে সবার।

করানোয় আক্রান্ত হলে টেস্ট করানোর ক্ষেত্রে কোনো অনীহাই রোগীর জন্য সুফল বয়ে আনবে না। দুটো রোগের কারণ ছোট ছোট দুটা ভাইরাস, কিন্তু এদের কাছেই আজ আমরা অসহায়। তাই সবাই মিলে প্রতিরোধ গড়ি তুলি। কভিড থেকে নিজে ও পরিবারের সদস্যদের জীবন রক্ষার জন্য স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে, বাইরে গেলে মাস্ক পরার বিকল্প নেই। টিকা গ্রহণ করতে হবে। সামাজিক দূরত্ব যতটুকু সম্ভব মেনে চলতে হবে। প্রয়োজন ছাড়া বাসার বাইরে না যাওয়াই শ্রেয়। আর ডেঙ্গুর জন্য প্রতিহত করতে হবে এর বাহক এডিস মশাকে। ডেঙ্গুর কোনো ভ্যাকসিন নেই। ডেঙ্গু ভাইরাস চার টাইপের, তাই এই চারটি ভাইরাস প্রতিরোধ করার জন্য কাজ করে, এমন ভ্যাকসিন এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত হয়নি।

ডেঙ্গু জ্বর প্রতিরোধের মূল উপায় হলোÑএর বাহকের বিস্তার রোধ এবং এই মশা যেন কামড়াতে না পারে, তার ব্যবস্থা করা। মনে রাখতে হবে, এডিস একটি এলিট মশা, ময়লা দুর্গন্ধযুক্ত ড্রেনের পানিতে এরা বসবাস করে না, বরং অভিজাত এলাকায় বড় বড় সুন্দর দালানকোঠায় এদের বাস। স্বচ্ছ পরিষ্কার পানিতে এই মশা ডিম পাড়ে। তাই ডেঙ্গু প্রতিরোধে এডিস মশার ডিম পাড়ার উপযোগী স্থানগুলোকে পরিষ্কার রাখতে হবে এবং একই সঙ্গে মশক নিধনের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। এই রোগ থেকে বাঁচার একমাত্র উপায় হলো ব্যক্তিগত সতর্কতা এবং এডিস মশা প্রতিরোধ।

এডিস মশা মূলত দিনের বেলা এবং সকাল ও সন্ধ্যায় কামড়ায়, তবে রাতে উজ্জ্বল আলোতেও কামড়াতে পারে। তাই দিনের বেলা যথাসম্ভব শরীর ভালোভাবে কাপড়ে ঢেকে রাখতে হবে, পায়ে মোজা ব্যবহার করা যেতে পারে। বাচ্চাদের হাফপ্যান্টের বদলে ফুলপ্যান্ট বা পায়জামা পরাতে হবে। মশার কামড় থেকে বাঁচার জন্য দিনে ও রাতে মশারি ব্যবহার করতে হবে। দরজা-জানালায় নেট লাগাতে হবে। প্রয়োজনে মসকুইটো রিপেলেন্ট, স্প্রে লোশন বা ক্রিম, কয়েল ও ম্যাট ব্যবহার করা যেতে পারে।

যেহেতু এডিস মশা মূলত জমে থাকা স্বচ্ছ পানিতে ডিম পাড়ে, তাই বাড়িঘরে ও আশপাশে যেকোনো পাত্র বা জায়গায় জমে থাকা পানি তিন থেকে পাঁচ দিন পরপর ফেলে দিলে এডিস মশার লার্ভা মারা যাবে। ঘরের কোথাও জমানো পানি পাঁচ দিনের বেশি যেন না থাকে। অ্যাকোয়ারিয়াম, ফ্রিজ বা এয়ারকন্ডিশনারের নিচে এবং মুখ খোলা পানির ট্যাংকে যেন পানি জমে না থাকে, সে ব্যবস্থা করতে হবে। বাড়ির ছাদে অনেককে বাগান করতে দেখা যায়। সেখানে টবে বা পাত্রে যেন জমা পানি পাঁচ দিনের বেশি না থাকে, সেদিকেও যতœবান হতে হবে। বাড়ির আশপাশের ঝোপঝাড়, জঙ্গল, জলাশয় ইত্যাদি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। বসতবাড়ির বাইরে মশার বংশ বিস্তার রোধ করার দায়িত্ব প্রশাসনে নিয়োজিত ব্যক্তিদের হলেও কমিউনিটিকে সচেতনতামূলক কার্যক্রমে যুক্ত করতে হবে।

ঘরের বাইরে মাঝে মাঝে বৃষ্টির পানি জমতে পারে, যেমন ফুলের টব, প্লাস্টিকের পাত্র, পরিত্যক্ত টায়ার, প্লাস্টিকের ড্রাম, মাটির পাত্র, টিনের কৌটা, ডাবের খোসা, কন্টেইনার, মটকা, ব্যাটারির শেল, পলিথিন, বিস্কুট ও চিপসের প্যাকেটে জমে থাকা পানি পরিষ্কার করতে হবে। মশা নিধনের জন্য স্প্রে বা ফগিং করতে হবে। বিভিন্ন রাস্তার আইল্যান্ডে সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য ফুলের টব, গাছপালা ও জলাধারে বৃষ্টির পানি জমে থাকতে পারে। সেগুলোয় যেন পানি জমে না থাকে, সে ব্যাপারে যতœবান হতে হবে। একমাত্র কমিউনিটিকে যুক্ত করে জনসচেতনতা ও প্রতিরোধের মাধ্যমেই এই কভিড ও ডেঙ্গুর হাত থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। কেউ কারও থেকে কম নয়, দুটো রোগই সমানে সমান।

মেডিকেল অফিসার

মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ঢাকা

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..