কভিডকালে পরিবেশবান্ধব ঋণ বৃদ্ধি ৬৫ শতাংশ

আগ্রহ বাড়ছে ব্যাংকের

শেখ আবু তালেব: সবুজে অর্থায়ন খাতে আগ্রহী হয়ে উঠছে ব্যাংকগুলো। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোও এগিয়ে আসছে এ খাতে ঋণ দিতে। খেলাপির হার কম হওয়ায় বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলোও আগ্রহী হয়ে উঠছে সবুজ অর্থায়নে। এর ফলে কভিডকালেও গত বছরের শেষ প্রান্তিকে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৬৫ শতাংশ বেশি ঋণ বিতরণ করেছে ব্যাংকগুলো। এক বছরে বৃদ্ধি পায় সাড়ে ৯ হাজার কোটি টাকা। ঋণ বিতরণে শীর্ষে উঠে এসেছে বিতরণে শীর্ষে অগ্রণী, ইসলামী ব্যাংক, এক্সিম, আল-আরাফাহ্, ব্যাংক এশিয়া। বাংলাদেশ ব্যাংকের এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে জানা গেছে এমন তথ্য।

গত ডিসেম্বরে সবুজ অর্থায়নে ঋণের স্থিতি দাঁড়ায় ৩৫ হাজার ৬৫২ কোটি ৫৪  লাখ টাকা, যা ২০১৯ সালের চেয়ে সাড়ে ৯ হাজার কোটি টাকা বেশি।  করোনাকালেও গত (অক্টোবর-ডিসেম্বর’২০) প্রাান্তিকে সবুজ অর্থায়নে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন ঋণ বিতরণ করেছে তিন হাজার ৯০১ কোটি ৫৬ লাখ টাকা।

এর মধ্যে ব্যাংকগুলো বিতরণ করেছে তিন হাজার ৮৪৭ কোটি টাকা, যা ব্যাংকগুলোর মোট বিতরণকৃত ঋণের সাত শতাংশ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন বলছে, শুধু গত অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকেই আগের প্রান্তিকের তুলনায় ব্যাংকগুলোর এ খাতে ঋণ বৃদ্ধি ছিল ৬৫ শতাংশ বেশি। অন্যদিকে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো এই সময়ে বিনিয়োগ করছে ৫৪ কোটি ৫২ লাখ টাকা। এ-সংক্রান্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে পাওয়া গেছে এমন তথ্য।

সবুজে অর্থায়ন বলতে মূলত বোঝায় পরিবেশবান্ধব উপায়ে কারখানা নির্মাণ অথবা স্থাপিত কারখানায় দেয়া ঋণকে। দূষণ কমিয়ে কারখানার পরিবেশকে কর্মীবান্ধব করতে বর্জ্য পরিশোধন ব্যবস্থা আধুনিকীকরণ, সৌরবিদ্যুৎ প্যানেল স্থাপন, সূর্যের আলোর ব্যবহার বৃদ্ধি, কারখানায় বৃষ্টির পানির ব্যবহার ও বায়ু চলাচলের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা রাখা। এছাড়া কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে পণ্য উৎপাদন ও পুনর্ব্যবহারযোগ্য পণ্য তৈরিতেও এ তহবিল ব্যবহার করা যায়।

সবুজ অর্থায়নে ব্যাংকগুলোর আগ্রহ বৃদ্ধির বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. সিরাজুল ইসলাম শেয়ার বিজকে বলেন, ‘আমাদের উন্নতির জন্যই প্রকৃতিকে সংরক্ষণ করতে হবে। বহির্বিশ্বও পণ্য আমদানির বেলায় প্রকৃতির প্রতি দায়বদ্ধতা দেখছে। এজন্য বাংলাদেশ ব্যাংক সরকারের নীতিমালার আলোকে ব্যাংকগুলোকে সবুজ অর্থায়নে উৎসাহিত করছে। পেপার লেস বা কাগজের ব্যবহার কমিয়ে আনাও সবুজ অর্থায়ন। করোনাকালে ব্যাংকগুলো প্রযুক্তিনির্ভরতা বাড়িয়েছে বিকল্প হিসেবে। এক সময়ে আমাদের এদিকেই যেতে হবে। এটিই সময়ের দাবি।’

তিনি আরও বলেন, ব্যাংকগুলোকে আগ্রহী করতে বাংলাদেশ ব্যাংক চালু করে ‘গো গ্রিন’ বা সবুজে অর্থায়ন শীর্ষক বিশেষ নীতিমালা। গঠন করেছে ঘূর্ণায়মান পুনঃঅর্থায়ন তহবিল। এজন্য ব্যাংকগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই তহবিল ব্যবহারে আগ্রহী হয়ে উঠছে। এতে নতুন উদ্যোক্তাদেরও বিকল্প অর্থের সংস্থান হচ্ছে; যা জাতীয় অর্থনীতিতে এক সময়ে প্রভাব রাখবে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ব্যাংকগুলোর মধ্যে বিনিয়োগে শীর্ষে রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ব্যাংক। এ পর্যন্ত ব্যাংকটির বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬০৪ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। এ বিষয়ে রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ শামস্-উল ইসলাম শেয়ার বিজকে বলেন, ‘রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে অগ্রণী ব্যাংকই গ্রিন ফাইন্যান্স বা সবুজ অর্থায়নে এগিয়ে রয়েছে। আমার সরকারের নীতিমালার আলোকেই সবুজ অর্থায়নকে উৎসাহিত করছি। ইতোমধ্যে পরিবেশবান্ধব ইটভাটা ও বিদ্যুৎকেন্দ্রেও বিনিয়োগ রয়েছে। এখান থেকে অর্থ আদায়ও ভালো হচ্ছে। ভবিষ্যতেও এ খাতে ঋণ বৃদ্ধি পাবে বলে মনে করছি।’

ঋণ পরিশোধে ব্যবসায়ীদের উদাসীনতার চিত্রই দেখা যায় ব্যাংক খাতে। এজন্য বছর শেষে খেলাপির পরিমাণ বাড়ছে। কিন্তু সবুজ অর্থায়নের ঋণ গ্রহীতারা পরিশোধের নজির রাখতে শুরু করেছেন। নিয়মিত ঋণ ফেরত দেয়ার নজির স্থাপন করছে এ খাতের বিনিয়োগকারীরা। ফলে ব্যাংকগুলোও এ খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে আরও মনোযোগী হচ্ছে।

জানা গেছে, গত সেপ্টেম্বর শেষে সবুজ অর্থায়নে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর এ খাতে বিনিয়োগ স্থিতি ছিল ৩১ হাজার ৭৫০ কোটি ৯৭ লাখ টাকা। গত ডিসেম্বরে যা দাঁড়ায় ৩৫ হাজার ৬৫২ কোটি ৫৪ লাখ টাকায়। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে যা ছিল ২৫ হাজার ৯৫৭ কোটি ৮৩ লাখ টাকা। এ হিসাবে গত এক বছরের ব্যবধানে এ খাতে বিনিয়োগ বেড়েছে ৯ হাজার ৬৯৪ কোটি ৭১ লাখ টাকা।

ব্যাংকাররা জানিয়েছেন, সবুজ অর্থায়নে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগ প্রবণতার কারণ হচ্ছে, এ খাতের উদ্যোক্তারা অনেকেই তরুণ। পরিবেশবান্ধব প্রকল্প বা কারখানার প্রতি বিদেশি ক্রেতাদের আগ্রহ বেশি। তাই উদ্যোক্তারাও পরিবেশবান্ধব প্রতিষ্ঠান গড়ছে। এ খাতে খেলাপির হারও কম। বর্তমানে ব্যাংক খাতে সামগ্রিক ঋণখেলাপির হার যেখানে সাড়ে সাত শতাংশের ওপরে। সেখানে সবুজ অর্থায়নে খেলাপির হার দুই শতাংশের ঘরে।

জানা গেছে, কাগজের ব্যবহার কমিয়ে আনতে ব্যাংকগুলোও অনলাইনে আগ্রহী হয়ে উঠছে। এতে সময় ও অর্থেরও সাশ্রয় হচ্ছে। ব্যাংকগুলোর মধ্যে বিনিয়োগে শীর্ষে রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ব্যাংক। এ পর্যন্ত ব্যাংকটির বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬০৪ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। এছাড়া দ্য এইচএসবিসি ব্যাংকের বিনিয়োগ স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৭৬৪ কোটি ২৩ লাখ টাকা, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের ৫৯৫ কোটি ৮৩ লাখ, এক্সিম ব্যাংকের ৫০২ কোটি ২৭ লাখ, ব্র্যাক ব্যাংকের ৪২১ কোটি ৭৯ লাখ টাকা, আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকের ১৪২ কোটি ৮০ লাখ টাকা, ব্যাংক এশিয়ার ১২২ কোটি ৪৯ লাখ টাকা।

বর্তমানে এ খাতের ঋণ গ্রহীতাদের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬৭৫। এর মধ্যে বড় আকারের উদ্যোক্তা ও প্রতিষ্ঠান হচ্ছে ১১৩, কুটির ৩৪, এসএমই ৫০৩ ও অন্যান্য ১১ পরিবেশবান্ধব পণ্য উৎপাদন ও শিল্প প্রতিষ্ঠায় ২০১১ সাল থেকে সবুজ তহবিল গঠন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ব্যাংকগুলো মূলত ইস্পাত, সিমেন্ট, কাগজ, রাসায়নিক পণ্য উৎপাদন, সার, বিদ্যুৎ ও বস্ত্র খাতে সর্বোচ্চ ঋণ বিতরণ করে থাকে। এসব শিল্প সবচেয়ে বেশি পরিবেশের জন্য ক্ষতিকারক কার্বন নিঃসরণ করে থাকে। পরিবেশ উন্নয়নে সবুজ অর্থায়নে ব্যাংকগুলোকে উৎসাহিত করছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন   ❑ পড়েছেন  ৯০  জন  

সর্বশেষ..